ইবরাহীম আ.সংকলন : আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের

জান্নাতে হযরত ইবরাহীম আ. এর প্রাসাদ
হাফিজ আবু বকর আল বাযযার রহ. আবু হুরায়রা রা. সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূল সা. বলেছেন- জান্নাতের মধ্যে মনি-মুক্তা দ্বারা নির্মিত একটি অতি সুন্দর ও মনোরম প্রাসাদ রয়েছে। কোন ভংচুরা বা ফাটল তাতে নেই। আল্লাহ তার খলীলের জন্য এটি তৈরি করেছেন। আল্লাহর মেহমান হিসাবে তিনি থাকবেন।
ইবরাহীম আ. এর আকৃতি অবয়ব
ইমাম আহমদ রহ. জাবির রা. সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূল সা. বলেছেন, আমার সম্মুখে পয়গম্বরগণকে পেশ করা হয়। তন্মধ্যে মূসা আ. শানুয়া গোত্রের লোকদের অনুরুপ দেখতে পাই! ঈসা ইবনে মারয়াম আ. কে অনেকটা উরওয়া ইবনে মাসউদের মত এবং হযরত ইবরাহীম আ. কে অনেকটা দাহইয়ায়ে কালবীর মত দেখতে পাই। [মুসনাদে আহমদ]

হযরত ইবরাহীম আ. এর ইন্তেকাল ও তার বয়স প্রসঙ্গ
ইবনে জারীর রহ. তার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত ইবরাহীম আ. নমরুদ (ইবনে কিনআন) এর যুগে জন্ম গ্রহণ করেন। কথিত আছে যে, এই নমরুদই ছিল প্রসিদ্ধ বাদশা যাহ্হাক। সে দীর্ঘ একহাজার বৎসর বাদশাহী করেছিল বলে মনে করা হয়ে থাকে। তার শাসন আমল ছিল জুলুম অত্যাচারে পরিপূর্ণ। কোন কোন ইতিহাস বিদের মতে, এই নমরুদ ছিল রাসিব গোত্রের লোক।
ইবনে আসাকির বিভিন্ন প্রাচীন পন্ডিতদের বরাতে ইবরাহীম আ. এর কাছে মালাকুল মওতের আগমন সম্পর্কে আহলে কিতাবদের উপখ্যানসমূহ বর্ণনা করেছেন। সঠিক অবস্থা আল্লাহই ভাল জানেন। কেউ কেউ বলেছে হযরত দাউদআ. ও হযরত সুলায়মান আ. এর মত হযরত ইবরাহীম আ. ও আকষ্মিকভাবে ইন্তেকাল করেছেন। কিন্তু আহলে কিতাব ও অন্যদের বর্ণনা এর বিপরিত। তারা বলেছেন ইবরাহীম আ. পীড়িত হয়ে একশত পচাত্তর বছর মতান্তরে একশত নব্বই বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। এবং আফরান হায়ছীর সেই জমিতে তার সহধর্মিনী সারাহর কবরের পাশেই তাকে দাফন করা হয়। ইসমাঈল আ. ও ইসহাক আ. উভয়ে দাফনকার্য সম্পাদন করেন। ইবনুল কালবী বলেছে, ইবরাহীম আ. দু’শত বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। আবু হাতিম ইবনে হিব্বান তার সহীহ গ্রন্থ মুফাযযল এ আবু হুরায়রা রা. সূত্রে বর্ণনা করেন- হযরত ইবরাহীম আ. বাটালীর সাহায্যে খাতনা করান। তখন তার বয়স ছিল একশত বিশ বছর। এরপর তিনি আশি বছর কাল জীবিত থাকেন। হাফিজ ইবনে আসাকির রহ. আবু হুরায়রা রা. সূত্রে হাদীস টি মওকূফ ভাবে বর্ণনা করেছেন।

হযরত ইবরাহীম আ. এর সন্তান সন্ততি প্রসঙ্গ
হযরত ইবরাহীম আ. এর প্রথম সন্তান ইসমাঈল আ.। যিনি মিশরের কিবতী বংশীয় হাজেরার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। এরপর ইবরাহীম আ. এর স্ত্রী তার চাচাত বোন সারাহর গর্ভে দ্বিতীয় পুত্র ইসহাক আ. জন্মগ্রহণ করেন। তারপর হযরত ইবরাহীম আ. কিনআনের কানতরা বিনতে ইয়াকতান কে বিবাহ করেন। তার গর্ভে ছয়টি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তারা হলেন (১) কায়সান (২) যামরান (৩) সারাজ (৪) য়াকশান (৫) নাশুক (৬) এ নামটি অজ্ঞাত। এরপর হযরত ইবরাহীম আ. হাজুন বিনতে আমীন কে বিবাহ করেন। এই পক্ষে পাচঁটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। (১) কায়সান (২) সুরাজ (৩) উমায়স (৪) লূতান (৫) লাফিস। আবুল কাসেম সুহায়লী তার আত-তারীফ ওয়াল আলাম গ্রন্থে এরুপ উল্লেখ করেছেন।
হযরত ইবরাহীম আ. এর জীবদ্দশায় যে সব বড় বড় ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তার মধ্যে লূত আ. এর সম্প্রদায়ের ঘটনা ও তাদের উপর আল্লাহর আযাবের ঘটনা অন্যতম। ঘটনাটি নিম্নরুপ: হযরত লূত আ. ছিলেন হারান ইবনে তারাহ এর পুত্র। এই তারাহ কে আযরও বলা হত। হযরত লূত আ. ছিলেন ইবরাহীম খলীল আ. এর ভাতিজা। ইবরাহীম, হারান, নাজূর এরা ছিলেন তিন ভাই। হারানের বংশধর কে বনু হারান বলা হয়। হযরত লূত আ. চাচা ইবরাহীম খলীল আ. এর নির্দেশক্রমে গওর যাগার অঞ্চলে সাদ্দুম শহরে চলে যান। এটা ছিল ঐ অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র। অনেক গ্রাম, মহল্লা, ও ক্ষেত খামার এবং ব্যবসাকেন্দ্র এ শহরের উপকন্ঠে অবস্থিত ছিল। এখানকার অধিবাসীরা ছিল দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট, পাপাসক্ত, দুশ্চরিত্র, সংকীর্ণমনা ও জঘন্য কাফির। তারা দস্যুবৃত্তি করতো। প্রকাশ্য মজলিশে অশ্লীল ও বেহায়াপনা করতো। কোন পাপের কাজ থেকেই তারা বিরত থাকতো না। অতিশয় জঘন্য ছিল তাদের কাজ কারবার। তারা এমন একটি অশ্লীল কাজের জন্ম দেয় যা ইতিপূর্বে কোন আদম সন্তান করেনি। তাহল, নারীদের কে ত্যাগ করে তারা সমকামিতায় লিপ্ত হত। হযরত লূত আ. তাদের কে এক ও লা শরীক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানান এবং এ সব ঘৃণিত অভ্যাস, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা বর্জন করতে বলেন। কিন্তু তারা তাদের ভ্রান্তি, বিদ্রোহ, পাপ ও কুফরের প্রতি অবিচল থাকে। ফলে আল্লাহ তাদের উপর এমন কঠিন আযাব নাযিল করলেন যা ফেরাবার সাধ্য কারোরই নেই। এ ছিল তাদের ধারনাতীত ও কল্পনাতীত শাস্তি। আল্লাহ তাদের কে সমূলে বিনাস করে দিলেন। বিশ্বের বিবেকবানদের জন্য তা একটি শিক্ষাপ্রদ ঘটনা হয়ে থাকল। এ কারণেই আল্লাহ তার মহা গ্রন্থ আল কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সূরা আরাফে আল্লাহ বলেন- আমি লূত কে পাঠিয়ে ছিলাম, সে তার সম্প্রদায় কে বলেছিল, তোমরা এমন কুকর্ম করছ, যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করেনি। তোমরা তো কাম-তৃপ্তির জন্যে নারী ছেড়ে পুরুষের কাছে গমন কর, তোমরা তো সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়। উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বলল, এদের কে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক যারা অতি পবিত্র হতে চায়। তার পর তাকে ও তার স্ত্রী ব্যতীত তার পরিজনবর্গকে উদ্ধার করেছিলাম। তার স্ত্রী ছিল পেছনে রয়ে থাকা লোকদের অন্তর্ভুক্ত। তাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। সুতরাং অপরাধীদের পরিনাম কি হয়েছিল তা লক্ষ কর! [সূরা আরাফ:৮০-৮৪)
সূরা হিজরে আল্লাহ বলেন- এবং ওদেরকে বল, ইবরাহীমের অতিথিদের কথা, যখন ওরা তার কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, সালাম, তখন সে বলেছিল, আমরা তোমাদের আগমনে আতংকিত। ওরা বলল, ভয় করো না, আমরা তোমাকে এক জ্ঞানি পুত্রের শুভ সংবাদ দিচ্ছি। তোমরা কি আমাকে শুভ সংবাদ দিচ্ছ আমি বার্ধক্যগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও? তোমরা কি বিষয়ে শুভ সংবাদ দিচ্ছ? ওরা বলল, আমরা সত্য সংবাদ দিচ্ছি, সুতরাং আপনি হতাশ হবেন না। সে বললো, যারা পথভ্রষ্ট তারা ব্যতীত আর কে তার প্রতিপালকের অনুগ্রহ হতে হতাশ হয়? সে বললো, হে প্রেরিতগণ! তোমাদের আর বিশেষ কি কাজ আছে? ওরা বললো, আমাদেরকে এক অপরাধী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রেরণ করা হয়েছে, তবে লূতের পরিবারবর্গের বিরুদ্ধে নয়, আমরা অবশ্যই ওদের সকলকে রক্ষা করব। কিন্তু তার স্ত্রীকে নয়। আমরা স্থির করেছি যে, সে অবশ্যই পেছনে রয়ে যাওয়া লোকদের অন্তর্ভুক্ত। ফেরেশতাগণ যখন লূত পরিবারের কাছে আসল, তখন লূত বলল, তোমরা তো অপরিচিত লোক। তারা বললো, না ওরা সে বিষয়ে সন্দিগ্ধ ছিল, আমরা তোমার নিকট তাই নিয়ে এসেছি; আমরা তোমার নিকট সত্য সংবাদ নিয়ে এসেছি, এবং অবশ্যই আমরা সত্যবাদী। সুতরাং তুমি রাতের কোন এক সময়ে তোমার পরিবারবর্গসহ বের হয়ে পড় এবং তুমি তাদের পশ্চাদানুসরণ কর এবং তোমাদের মধ্যে কেউ যেন পেছন দিকে না তাকায়। তোমাদের যেখানে যেতে বলা হচ্ছে তোমরা সেখানে চলে যাও। আমি তাকে এ বিষয়ে প্রত্যাদেশ দিলাম যে, প্রত্যুষে ওদের কে সমূলে বিনাশ করা হবে। নগরবাসিগণ উল্লসিত হয়ে উপস্থিত হল। সে বলল, ওরা আমার অতিথি; সুতরাং তোমরা আমাকে বে-ইজ্জত করো না। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর ও আমাকে হেয় করো না। তারা বলল, আমরা কি দুনিয়াশুদ্ধ লোককে আশ্রয় দিতে তোমাকে নিষেধ করিনি? লূত বলল, একান্তই যদি তোমরা কিছু করতে চাও তবে আমার এই কন্যাগণ রয়েছে। তোমার জীবনের শপথ, ওরা তো মত্ততায় বিমূঢ় হয়েছে। তারপর সূর্যোদয়ের সময়ে মহানাদ তাদেরকে আঘাত করল; এবং আমি জনপদকে উল্টিয়ে উপর নিচ করে দিলাম এবং ওদের উপর প্রস্তর কংকর বর্ষণ করলাম। অবশ্যই এতে নিদর্শন রয়েছে পর্যবেক্ষণ শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যে। তা লোক চলাচলের পথের পাশে এখনও বিদ্যমান। অবশ্যই এতে মুমিনদের জন্য রয়েছে নিদর্শন। [সূরা হিজর:৫১-১৭]


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight