ইতিহাসের টুকরো কাহিনী : মাও. মোহাম্মদ সফিউল্লাহ

আমাদের অজানা নয় যে, এ বিশ্বের গোটা রক্ষা ব্যবস্থা মানুষের পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি একজন অন্য জনকে সাহায্য না করে, তবে একাকী মানুষ হিসেবে সে যতই বুদ্ধিমান, শক্তিশালী ও বিত্তশালী হোক, জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র কিছুতেই সংগ্রহ করতে পারবে না। একাকী মানুষ স্বীয় খাদ্যের জন্য শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আহার্য করা পর্যন্ত সব স্তর অতিক্রম করতে পারে না। এমনিভাবে পোশাক-পরিচ্ছদের জন্য তুলা চাষ থেকে শুরু করে দেহের মানানসই পোশাক তৈরি করা পর্যন্ত অসংখ্য সমস্যার সমাধান করতে একাকী কোন মানুষ কিছুতেই সক্ষম নয়। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় অসীম জ্ঞান ও পরিপূর্ণ ক্ষমতায় বিশ্ব চরাচরের জন্যে এমন অটুট ব্যবস্থাপনা রচনা করেছেন, যাতে প্রত্যেকটি মানুষই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্য হাজারো লাখো মানুষের মুখাপেক্ষী। দরিদ্র ব্যক্তি পয়সার জন্যে যেমন ধনীর মুখাপেক্ষী, তেমনি শ্রেষ্ঠতম ধনী ব্যক্তিও পরিশ্রম ও মেহনতের জন্যে দিনমজুরের মুখাপেক্ষী। তদ্রুপ ব্যবসায়ী গ্রাহকের মুখাপেক্ষী আর গ্রাহক ব্যবসায়ীর মুখাপেক্ষী। গৃহনির্মাতা রাজমিস্ত্রী ও কর্মকারের মুখাপেক্ষী, আর এরা গৃহনির্মাতার মুখাপেক্ষী। চিন্তা করলে দেখা যায়, এ সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা শুধু পার্থিব জীবনের জন্যে নয় বরং মৃত্যু থেকে নিয়ে কবরে সমাহিত হওয়া পর্যন্ত সকল স্তরে এ সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী। বরং এরপরও মানুষ জীবিতদের ইছালে ছওয়াব ও দুআয়ে-মাগফিরাতের মুখাপেক্ষী থাকে। যদি এহেন সর্বব্যাপী মুখাপেক্ষিতা না থাকতো, তবে কে কার সাহায্যে এগিয়ে আসতো। মোটকথা, সমগ্র বিশ্বের ব্যবস্থাপনা পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ চিত্রের একটা ভিন্ন পিঠও আছে। তা এই যে, যদি চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদির জন্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা হতে থাকে ও চোর ডাকাতদের বড় বড় দল গঠিত হয়ে যায়, তবে এ সাহায্য ও সহযোগিতাই বিশ্বব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত ও তছনছ করে দেয়। এতে বুঝা গেল যে, পারস্পরিক সহযোগিতা একটি দুধারী তরবারী। যা প্রয়োগ ব্যতীত বিশ্বের ব্যবস্থাপনা চলে না। ক্ষুর এর ভুল ব্যবহার গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে বানচাল করে দেয়। সেজন্য কুরআন সুন্নাহ পরস্পর সহযোগিতার একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা অবলম্বনে বিশ্বব্যবস্থা অটুট থাকবে আর মানুষের জীবনে নেমে আসবে সুখ-শান্তি, আরাম ও আনন্দের স্রোতধারা। এ মর্মে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো, গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না। [সূরা মায়েদা : ২] চিন্তা করলে দেখা যায় যে, কুরআনে কারীম এ আয়াত কেবল মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিচ্ছে। তাও শুধু সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ক্ষেত্রে। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে একথা প্রতীয়মান হয় যে, গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে কাউকে সহযোগিতা করা যাবে না, যদিও সে মুসলমান হয়। বরং তাকে গুনাহ ও জুলুম থেকে বিরত রাখাই হবে প্রকৃত সহায়তা। বুখারি শরীফে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, তোমার (মুসলিম) ভাইকে সাহায্য কর, চাই সে জালেম হোক কিংবা মাজলুম হোক। সাহাবায়ে কেরাম রা. বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাজলুমকে সাহায্য করার অর্থ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করার দ্বারা কি উদ্দেশ্য? তখন রাসূল সা. ইরশাদ করেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখ, এটিই তার সাহায্য। [বুখারি : ৩/১৩৮-হাদীস নং ২৪৪৪] কুরআন পাকের এ শিক্ষা, সৎকর্ম ও তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে মাপকাঠি বানিয়েছে। এর ভিত্তিতেই পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। আর এর বিপরীতে পাপ ও অত্যাচারকে কঠোর অপরাধ গণ্য করেছে এবং এতে সাহায্য-সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি হেদায়েত ও সৎকর্মের প্রতি আহ্বান জানায়, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারী লোকদের ছাওয়াবের সমপরিমাণ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের ছাওয়াব হ্রাস করা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পাপের প্রতি আহবান করে, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের গুনাহ হ্রাস করা হবে না। [মুসলিম শরীফ : ৪/২০৬০- হাদীস নং ২৬৭৪] অন্য রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারীর সাথে তার সাহায্যার্থে বের হয়, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। [মুজামুল কাবীর তাবরানী : ১/২২৭] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন ঝগড়া-বিবাদে অন্যায় পথে সহযোগিতা করে, সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে থাকে, যতক্ষণ না তা হতে ফিরে আসে। [মুসতাদরাকে হাকেম : ৪/৯৯- হাদসি নং ৭০৫১, বাইহাকী : ৬/১২৩- হা. ৭৬৭৬] এছাড়াও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে এ প্রসঙ্গে আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে, যেগুলি অধ্যয়ন করলে একথাই পরিস্ফুটিত হয় যে, সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে সহায়তা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য আর গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়তা হারাম। গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা করার কয়েকটি চিত্র আল্লামা আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ আনওয়ারুল বয়ানে উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, যে চাকরী বা পদের কারণে গুনাহে লিপ্ত হতে হয়, তা গ্রহণ করা হারাম, এভাবে গুনাহের আইন প্রণয়ন করাও হারাম। কেননা, এর দ্বারা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হয়। এমনিভাবে মদের কারখানায় চাকুরী করা কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে সহযোগিতা করা অথবা এমন চাকুরী করা যাতে শরীয়ত পরিপন্থী কাজে অন্যকে সহায়তা করা হয় বা সুদ-ঘুষের লেন-দেন করা হয় অথবা সুদ-ঘুষ আদান-প্রদানের মাধ্যম হতে হয়, এধরণের চাকুরী করা হারাম এবং তা থেকে অর্জিত বেতন হারাম। এভাবে চোর, ডাকাত, লুটতরাজকারী ও অত্যাচারীর সহায়তা করাও হারাম। [তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান : খ-৩, পৃ. ১২] রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এ শিক্ষার সুফল রাসূলুল্লাহ সা. কে যখন দুনিয়ায় প্রেরণ করা হলো তখন ত পুরো ‘আরব উপদ্বীপ’ নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতার নরকে পরিণত ছিল। হত্যা ও নাশকতার বাজার গরম ছিল। লুণ্ঠনকে বীরত্ব ও বাহাদূরী মনে করা হতো। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত দাফন করে বড়াই করা হতো। নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থীরতার সেই পরিবেশে রাসূলুল্লাহ সা. সংবাদ দিয়েছিলেন, একটা সময় আসবে একজন নারী একাকী হীরা থেকে ভ্রমণ করে মক্কায় এসে তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সে ভয় করবে না। [বুখারি শরীফ : ৪/৫৩৮ হাদীস নং ৩৫৯৫] জগদ্বাসী প্রত্যক্ষ করেছে, রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পূর্বেই সেই সময় এসেছিল। যে ‘আরব উপদ্বীপ’ হিংসা বিদ্বেষ, শত্র“তা ও অস্থিরতার জলন্ত আঙ্গার ছিল, সেখানে ভালোবাসা, হৃদ্রতা, একতা, শান্তি ও নিরাপত্তার ফুল প্রস্ফুটিত হয়েছিল ও গড়ে উঠেছিল বেহেশতি নহরের পানিতে বিধৈাত একটি সুশীল আদর্শ সমাজ। আরবের এ চিত্র পুলিশ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে হয়নি। বরং কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষার ফলে হয়েছিল। কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষাই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির বীজ রোপণ করে দিয়েছিল। এবং প্রতিটি ব্যক্তিকে অপরাধ উৎপীড়ণ দমনের জন্যে সিপাহী রূপে গড়ে তুলেছিল। আর বানিয়েছিল তাদেরকে তাকওয়া ও সৎকাজের অনন্য সহযোগী। এর ফলে সৎকাজের সহযোগিতায় তারা ছিলেন প্রতিযোগী। আর অসৎকাজ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায়। তদ্রুপ নিজেকে পাপ ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে তারা ছিলেন সর্বদা সচেতন। এরই অনিবার্য পরিণতি ছিল যে, তারা অপরাধের প্রতি পা বাড়াতেনই না। ঘটনাক্রমে যদি কখনও অপরাধ সংঘটিত হয়ে যেত, আল্লাহর ভয় তাদেরকে অস্থির করে তুলত, তখন নিজেই রাসূল সা. এর দরবারে গিয়ে স্বীকার করতো। যতক্ষণ পর্যন্ত এর পূর্ণ প্রতিকার না হতো পরকালের চিন্তায় ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পেতো না। কুরআনের এ শিক্ষা পরিহারের পরিণাম কিন্তু আমাদের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা ও সৎকাজে বাধা প্রদান করতে ব্যতিব্যস্ত। সচরাচর পরিলক্ষিত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি ইসলামী বেশভূষা গ্রহণ করতে চায়, সুন্নতি পোশাক পরিধান করতে চায়, সুন্নত মোতাবেক জীবন যাপন করতে চায়, তখন তার বন্ধুবান্ধব, পরিবারবর্গ ও অফিসের লোকজন চেষ্টা করে, সে যেন এই ছাওয়াবের কাজ থেকে বিরত থাকে এবং আমাদের ন্যায় (পাপী) হয়ে যায়। আজকাল সৎকাজে সহায়তা করতে কেউ প্রস্তুত নয়। কিন্তু কেউ যদি গুনাহ করার ইচ্ছা করে তখন সবাই তার সহযোগী হয়। হারাম উপার্জন করলে, সুদ গ্রহণ করলে ও দাড়ি মুন্ডালে স্ত্রীও খুশী, মা-বাবাও খুশি, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের লোকজন খুবই খুশী। যদি সৎপথে চলতে চায়, সুন্নাতের উপর চলতে চায়, তখন সবাই অসন্তুষ্ট। বন্ধু নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সিনেমা হলে নিয়ে যায়। গান বাদ্য ও মদের আসরে নিয়ে যায়। তারপর ধোঁকা দিয়ে নাপিতের দোকানে নিয়ে যায়, নিজের পকেটের টাকা দিয়ে দাড়ি কামিয়ে দেয়। আবার অনেকে অন্যের দুনিয়া সাজাতে নিজের আখেরাত ধ্বংস করে। যেমন, নির্বাচনের সময় ভোটার এবং সমর্থকরা একথা ভালোকরেই জানে যে, আমরা যে পার্থীকে পদে বসাতে চাচ্ছি সে একজন ফাসেক ও জালেম। পদ অর্জনের পর তার জুলম আরো বৃদ্ধি পাবে। তবুও তার সহযোগিতায় লিপ্ত থাকে। তাকে সফল করার লক্ষে তার প্রতিপক্ষের দুর্ণাম রটিয়ে বেড়ায়। কখনো কখনো বিপক্ষের লোকদেরকে হত্যাও করা হয়। এটি কতবড় অহমিকা ও নির্বুদ্ধিতা যে, নিজের আখেরাত ধ্বংস হবে আর অন্যের দুনিয়া অর্জন হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম ব্যক্তিদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিও হবে যে, অন্যের দুনিয়ার জন্যে নিজের আখেরাত ধ্বংস করেছে। [ইবনে মাজা : ৪/৩৩৯ হা. ৩৯৬৬] আজ আমাদের গুনাহ ও অপরাধের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার কারণে, সারাবিশ্বে অপরাধ, চুরি, ডাকাতি, অশ্লীলতা, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তা দমন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এহেন দুর্গতি, দুরাবস্থা ও অস্থিরতা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে হলে, কুরআনের এই মূলনীতি অনুসরণ হবে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও অপরাধ দমনের লক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তিই সচেষ্ট হতে হবে। শিক্ষার্থী : উচ্চতর তাফসীর গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

নববী আদর্শের বাস্তব প্রতিচ্ছবিহিন্দুস্থানে মাওলানা মুজাফফর হুসাইন নামক এক বুযুর্গ ছিলেন। ইবাদত বন্দেগীতে তিনি কঠোর নীতি অনুসরণ করতেন। কোনদিন তার তাহাজ্জুদের নামায পর্যন্ত কাযা হয়নি, এমনকি সফরেও না। সেই মহান বুযুর্গ একবার কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে এক বৃদ্বকে দেখতে পেলেন, ভারী এক বোঝা মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছেন। চেহারায় তার ক্লান্তির রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বৃদ্বের এই করুণ  অবস্থা দেখে তিনি বোঝাটা নিজের মাথয় তুলে নিলেন। অথচ  ঐ সময় তিনিও বার্ধক্যের কোঠায় পা দিয়েছিলেন। যাই হোক তারা দুজনে গল্প করতে করতে গ্রামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। আলোচনার ফাঁকে বৃদ্বটি একবার বললেন মৌলভী মুজাফ্ফর হুসাইন সাহেবের সাথে সাক্ষাত করার আমার একান্ত ইচ্ছা। ইদানিং তিনি নাকি এদিকে আসা যাওয়া করেন। মুজাফ্ফর হুসাইন সাহেব বললেন, আপনি চিন্তা করবেন না, আমি আপনাকে তার সাথে সাক্ষাত করিয়ে দিব। গন্তব্যে পৌঁছে সে আবার অনুনয়ের সুুরে বলল, আপনি কিন্তু অবশ্যই আমাকে মুজাফ্ফর হুসাইনের সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবেন। তখন তিনি বললেন, আমিই সেই মুজাফ্ফর হুসাইন। তার কথা শুনে লোকটি লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে গেলো এবং ঝাঁপ দিয়ে তার পায়ে পড়ার উপক্রম হলো। তিনি তাকে বাঁধা দিয়ে বললেন, ভাই এক মুসলমানের একটু কাজ করে দিয়েছি এতে কিইবা আর হয়েছে?
সেই বুযর্গের আরেকটি ঘটনা একবার তিনি কোন এক বিশেষ কারণে বিড়–লী নামক অঞ্চলে গেলেন। সেখানে পৌঁছে রাত যাপনের উদ্দেশ্যে এক সারাইখানায় উঠলেন। সারাইখনায় ছেলেসহ আরেকজন বড় ব্যবসায়ীও উঠেছিল। ছেলেটির হাতে ছিল একটি স্বর্ণের ব্যাগ আলাপচারিতার মাধ্যমে তারা একে অপরের পরিচয় ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জেনে নিলেন। শেষ রাতে তিনি তাহাজ্জুদের নামায পড়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলেন। এদিকে বণিক ঘুম থেকে জেগে দেখল ছেলের হাতের সেই স্বর্ণের ব্যাগ নেই। মুজাফফর রহ. খুবই সাধারণ জীবন যাপন করেতন, দারিদ্রের চিহ্ন লেগে থাকত তার দেহ পোশাকে। তাই ছেলের হাত শুন্য দেখার সাথে সাথে তার সন্দেহ হলো রাতের সেই দরিদ্র লোকটিই হয়ত এ কাণ্ড ঘটিয়েছে। এই ভেবে সে দ্রুত তার পিছু নিলো। কিছুদূর যেতেই সে তাকে দেখতে পেল এবং কর্কশ আওয়াজে ডাক দিলো; কিন্তু তিনি তাকে বিনম্রভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, কি হয়েছে ভাই? প্রতিউত্তরে লোকটি বড়সড়ো এক ঘুষি বসিয়ে দিয়ে বলল, স্বর্ণের ব্যাগ নিয়ে ভেগেছ আর এখন বলজচ কী হয়েছে? জলদি থানায় চলো। তিনি তার কোনরুপ প্রতিবাদ না করে বললেন চলো ভাই থানায়ই চলো। থানার ওসি ছিল হযরতের রীতিমত ভক্ত। দূর থেকে তাকে দেখেই সে দাঁড়িয়ে গেলো। ওসি সাহেবের এই কাণ্ড দেখে বণিক লোকটি একেবারে ভড়কে গেলো এবং বুঝে ফেলল যাকে সে ধরে এনেছে তিনি সাধারণ কোন লোক নন। বুযুর্গ তাকে অভয় দিয়ে বললেন, ভয় পেওনা আমি তোমার কোন ক্ষতি হতে দিবনা। ঘটনার বিবরণ শুনে ওসি সাহেব তো রেগে আগুন। কিন্তু তিনি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, তাকে এখন কিছু বললে আমি খুব কষ্ট পাব; বরং আপনি তাকে ছেড়ে দিন। [পছন্দীদা ওয়াকেয়াত, পৃ ৮৯-৯১ ]
একনিষ্ঠতার অনুপম দৃষ্টান্ত
শায়খ আবুল হাসান নূরী রহ. এর সময়কার ঘটনা। একবার জাহাজের বহরে তৎকালীন বাদশার জন্য বিশ মশক মদ আসছিল। ঘটনাক্রমে আবুল হাসান নূরী রহ. ও সেই সমুদ্রের পাড় ধরে হাটছিলেন। জাহাজটি যখন তীরে নোঙ্গর করল তখন তিনি নাবিককে জিজ্ঞাসা করলেন এতে কী আছে? সে বললো এতে বাদশার উদ্দেশ্যে প্রেরিত বিশ মশক মদ আছে। নাবিকের কথা শুনে তিনি ভেতরে গিয়ে মদের মটকাগুলো ভাঙ্গতে শুরু করলেন। উনিশটি মশক ভাঙ্গা শেষ হলে হঠাৎ তিনি থেমে গেলেন এবং বিশতম মশকটি রেখেই চলে গেলেন।
বাদশার নির্দেশে তাকে রাজদরবারে উপস্থিত করা হলো। বাদশা তাকে এরকম রুঃসাহসিকতা প্রদর্শেনের হেতু জিজ্ঞাসা করলেন? উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহ তা’লা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। এমর্মে তিনি এরশাদ করেছেন। হে নবী আপনি মানুষদেরকে সৎ কাজের আদেশ করুন এবং অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদান করুন। এবং এ কাজে আপতিত বিপদে ধৈর্য ধারণ করুন।আল্লাহ তাআলার সেই আদেশ পালনার্থেই আমি এমনটি করেছি। তখন বাদশা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে একটা আবার রেখে দিয়েছ কেন? তিনি বললেন, উনিশতম মশকটা ভাঙ্গার পর আমার মনে এই ধারণার উদ্রেক হলো যে, তুমি অনেক বড় পূন্যের কাজ করে ফেলেছো। অন্যায় কাজে বাধা দিতে বাদশাকে পর্যন্ত পরওয়া করোনি। গর্বে আমার বুকটা তখন ফুলে উঠেছিল। তাই বিশতম মশকটা রেখেই আমি চলে আসি। কারণ ঐ মুহুর্তে আল্লাহর সন্তুষ্টির বিষয়টি আমার অন্তরে অনুপস্থিত ছিল। বাদশা তার এই একনিষ্ঠতায় এতটাই মুগ্ধ হলেন যে, শাস্তি দেয়ার পরিবর্তে তার একনিষ্ঠ ভক্তে পরিণত হয়ে গেলেন। এবং তাকে পুলিশ অফিসার পদে নিয়োগ করে দিলেন। [পছন্দীদা ওয়াকেয়াত, পৃ ৫৩-৫৪]
নববী আদর্শের বাস্তব প্রতিচ্ছবি
হিন্দুস্থানে মাও. মুজাফফর হুসাইন নামক এক বুযুর্গ ছিলেন। ইবাদত বন্দেগীতে তিনি কঠোর নীতি অনুসরণ করতেন। কোনদিন তার তাহাজজুদের নামাজ পর্যন্ত কাযা হয়নি এমনকি সফরেও না। সেই মহান বুযুর্গ একবার কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে এক বৃদ্বকে দেখতে পেলেন, ভরী এক বোঝা মাথয় করে নিয়ে যাচ্ছেন। চেহারায় তার ক্লান্তির রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বৃদ্বের এই করুন  অবস্থা দেখে তিনি বোঝাটা নিজের মাথয় তুলে নিলেন। অথচ  ঐ সময় তিনিও বার্ধক্যের কোঠায় পা দিয়েছিলেন। যাই হোক তারা দুজনে গল্প করতে করতে গ্রামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। আলোচনার ফাঁকে বৃদ্ধটি একবার বললেন মৌলভী মুজাফফর হুসাইন সাহেবের সাতে সাক্ষাত করার আমার একান্ত ইচ্ছা। ইদানিং তিনি নাকি এদিকে আসা যাওয়া করেন। মুজাফফর হুসাইন সাহেব বললেন আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আপনাকে তার সাথে সাক্ষাত করিয়ে দিব। গন্তব্যে পৌছে সে আবার অনুনয়ের সুুরে বলল, আপনি কিন্তু অবশ্যই আমাকে মুজাফফর হুসাইনের সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবেন। তখন তিনি বললেন, বললেন আমিই সেই মুজাফফর হুসাইন। তার কথা শুনে লোকটি  লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে গেলো এবং ঝাপ দিয়ে তার পায়ে পড়ার উপক্রম হলো। তিনি তাকে বাধা দিয়ে বললেন, ভাই এক মুসলমানের একটু কাজ করে দিয়েছি এতে কিইবা আর হয়েছে?
সেই বুযর্গের আরেকটি ঘটনা : একবার তিনি কোন এক বিশেষ কারণে বিড়–লী নামক অঞ্চলে গেলেন। সেখানে পৌছে রাত যাপনের উদ্দেশ্যে এক সারাইখানায় উঠলেন। সারাইখনায় ছেলেসহ আরেকজন বড় ব্যবসায়ীও উঠেছিল। ছেলেটির হাতে ছিল একটি স্বর্ণের ব্যাগ  আলাপচারিতার মাধ্যমে তারা একে অপরের পরিচয় ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জেনে নিলেন। শেষ রাতে তিনি তাহাজজুদের নামাজ পড়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়না হয়ে গেলেন। এদিকে বণিক ঘুম থেকে জেগে দেখল ছেলের হাতের সেই স্বর্ণের ব্যাগ নেই। মুজাফফর রহ. খুবই সাধারন জীবন যাপন করেতন দারিদ্রের চিহ্ন লেগে থাকত তার দেহ পোশাকে। তাই ছেলের হাত শুন্য দেখার সাথে সাথে তার সন্দেহ হলো রাতের সেই দরিদ্র লোকটিই হয়ত এ কাণ্ড ঘটিয়েছে। এই ভেবে সে দ্রুত তার পিছু নিলো। কিছুদূর যেতেই সে তাকে দেখতে পেল এবং কর্কশ আওয়াজে ডাক দিলো কিন্তু তিনি তাকে বিনম্রভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, কি হয়েছে ভাই ? প্রতিউক্করে লোকটি বড়সড়ো এক ঘুষি বসিয়ে দিয়ে বলল স্বর্ণের ব্যাগ নিয়ে ভেগেছ আে এখন বলজচ কী হয়েছে  ? জলদি থানায় চলো। তিনি তার কোনরুপ প্রতিবাদ না করে বললেন চলো ভঅই থানায়ই চলো। থানার ওসি ছিল হযরতের রীতিমত ভক্ত। দূর থেকে তাকে দেখেই সে দাড়িয়ে গেলো। ওসি সাহেবের এই কাণ্ড দেখে বণিক লোকটি একেবারে ভড়কে গেলো, এবং বুঝে ফেলো যাকে সে ধরে এনেঝে তিনি সাধারণ কোন লোক নন। বুযুর্গ তাকে অভয় দিয়ে বললেন, ভয় পেওনা আমি তোমার কোন ক্ষতি হতে দিবনা। ঘটনার বিবরন শুনে ওসি সাহেব তো রেগে আগুন। কিন্তু তিনি তেিক থামিয়ে দিয়ে বললেন, তাকে এখন কিছু বললে আমি খুব কষ্ট পাব। আপনি তাকে ওকে ছেড়ে দিন। ( পছন্দীদা ওয়াকেয়াত, পৃ ৮৯-৯১ )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight