আশুরার তাৎপর্য : করণীয় ও বর্জনীয় : মুফতী আবু উসামা

vista-wallz-14

মহান আল্লাহ কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন, “নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত।” [সুরা তাওবা- ৩৬]
সম্মানিত চারটি মাস হলো- রজব, জিলকদ, জিলহজ ও মুহাররম। এ চার মাসে ঝগড়া বিবাদ, যুদ্ধ বিগ্রহ ইত্যাদি করা নিষিদ্ধ। মুহাররম উপরিউক্ত চার মাসেরই অন্যতম।
আল্লামা জাস্সাছ তাঁর লিখিত গ্রন্থ আহকামুল কুরআনে বলেন, “এই চার মাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- যারা এ মাসগুলোতে ইবাদত বন্দেগি করবে, রাব্বে কারীম তাদেরকে বাকি আট মাস ইবাদত করার হিম্মত ও তাওফীক দান করবেন। এমনিভাবে যারা এ চার মাসে চেষ্টা সাধনা করে গুনাহ থেকে বিরত থাকতে পারবে, তার জন্য অবশিষ্ট আট মাস গুনাহ থেকে বিরত থাকা সহজ হয়ে যাবে।” [আহকামুল কুরআন : ১/৪৪৭]
মুহাররম মাসের দশ তারিখ দিনটি হলো আশুরার দিন। দশ বুঝাতে আরবি ভাষায় ‘আশারা’ ব্যবহার করা হয়। আশারা থেকে আশুরা বা দশম দিবস। ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঘটনা প্রবাহ বিবেচনায় এ দিনটি আমাদের কাছে স্মরণীয় ও বরণীয়। এ দিনটি একদিকে যেমন নাজাত বা শুকরিয়ার দিবস; তেমনি অন্যদিকে কারবালার মরুপ্রান্তরে হযরত ইমাম হুসাইন রা. ও তাঁর সাথীদের শাহাদাতের ঘটনাও এ দিনে সংঘঠিত হওয়ায় তা আমাদের কাছে শোকাহত  ঘটনার স্মারক। তাই এ দিনটি শোক দিবস হিসেবেও পরিচিত। কৃতজ্ঞতা ও শোক দিবসের মৌলিক তফাৎটি অনেকের কাছে সুস্পষ্ট না থাকায় তারা আশুরার মূল শিক্ষার বিকৃতি ঘটাচ্ছে। অনেকে মনে করে আশুরা মানে কারবালা দিবস। বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। তবে এ কথা সত্য যে, কারবালার ঘটনার দুঃখ বেদনা ও শিক্ষণীয় বিষয়গুলো ভুলে যাওয়ার মতো নয়। কিন্তু আমাদের সামগ্রিক ও সামষ্টিক চিন্তা চেতনার ক্ষেত্রে একটি মারাত্মক ভুল হবে যদি আমরা কারবালার আলোচনায় আত্মনিয়োগ করে এ দিনের অন্যান্য স্মরণীয় ও পালনীয় বিষয়গুলো থেকে দূরে সরে যাই। অতীতে আশুরা দিবসে যেসব স্মরণীয় ঘটনা ঘটেছে সেগুলো থেকে কিছুতেই আমাদের চোখ বন্ধ করে রাখা সমীচীন হবে না। অনুরূপভাবে এ দিনে যেসব ফযীলত ও পালনীয় বিষয় রয়েছে সেগুলো থেকে কোনোভাবেই বিরত থাকা ঠিক হবে না। কেননা আদিকাল থেকে আশুরার দিবসে যেসব ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের পর্যন্ত  বিভিন্ন সূত্রে পৌঁছেছে সেগুলোর উপর নির্ভরতা ও বিশ্বস্ততা নিয়ে এখানে প্রশ্ন তোলার যৌক্তিকতা না থাকলেও এসব ঘটনা ইসলাম অস্বীকার করে না। যেমন-
১.    আল্লাহ পাক আশুরার দিনে আকাশ, বাতাস, পাহাড়- পর্বত, নদী-নালা, জান্নাত-জাহান্নাম, লওহে মাহফুজ ও যাবতীয় জিনিস সৃষ্টি করেন।
২.    এ দিনে হযরত আদম আ. এর তওবা কবুল করেন।
৩.    এ দিনে হযরত নূহ আ. এর নৌকা অবতরণ করেন।
৪.    এ দিনে হযরত ইবরাহীম আ. জন্মগ্রহণ করেন এবং অগ্নিকুন্ড থেকে এ দিনে মুক্তি পান।
৫.    এ দিনে হযরত ইউসুফ আ. কূপ থেকে উদ্ধার হন।
৬.    এ দিনে হযরত আইয়ুব আ. আরোগ্য লাভ করেন।
৭.    এ দিনে হযরত ইউনুস আ. মাছের পেট থেকে মুক্তি লাভ করেন।
৮.    এ দিনে হযরত মুসা আ. ফেরাউনের অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পান।
৯.    এ দিনে হযরত ঈসা আ. কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন চতুর্থ আসমানে উঠিয়ে নেন।
১০.    এ দিনে হাশর ও কেয়ামত সংঘঠিত হবে বলে হাদীসে বর্ণিত আছে।
এছাড়াও আরো অনেক কিছুই এ দিনে সংঘঠিত হয়েছে বলে জানা যায়। তবে এ দিনের সর্বপেক্ষা মর্মান্তিক, হৃদয় বিদারক ও পীড়াদায়ক ঘটনা হলো কারবালার ঘটনা। তাই এ সবের কারণে আশুরার দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আশুরার দিনে করণীয় সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, রমজানের পর আল্লাহর মাস মুহাররমের রোযা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ। আর ফরজ নামাযের পর রাতের নামাযই হলো সর্বোত্তম। [সহীহ মুসলিম- ২/৩৬৮]
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সা. কে রমজান ও আশুরায় যেরূপ গুরুত্বের সাথে রোযা রাখতে দেখেছি, অন্য সময় তা দেখিনি। [সহীহ বুখারি- ১/২১৮]
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বর্ণিত অন্য এক হাদীসে এসেছে- নবী কারীম সা. মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার পর ইয়াহুদীদেরকে আশুরার দিনে রোযা রাখতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা এ দিনে কিসের রোযা রাখ? জবাবে তারা বললো, এ দিন আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আ. এবং তাঁর কওম বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি দেন, আর এ দিনেই ফেরাউন স্ব-দলবলে লোহিত সাগরে ডুবে মারা যায়। অতএব, আমরা এর শোকর আদায়ের লক্ষ্যে এবং উক্ত গৌরবময় দিনটির সম্মান জ্ঞাপনার্থে এ দিনটিতে রোযা রেখে থাকি। তাদের কথা শুনে হুজুর সা. বললেন, আল্লাহর নবী হযরত মুসা আ. এর অনুসরণের দাবিদার তোমাদের চেয়ে আমরা বহুগুনে বেশি। অতঃপর (হুজুর সা. নিজে আশুরার রোযা রাখেন এবং) তাঁর উম্মতগণকেও এ দিনে রোযা রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। [সহীহ বুখারি- ১/২৬৮]
রাসূল সা. এর এক সাহাবী থেকে আরেকটি বর্ণনায় এসেছে- রাসূল সা. ইরশাদ করেন, যদি কেউ মুহাররম মাসে রোযা রাখে, তাহলে প্রতিটি রোযার পরিবর্তে ত্রিশটি রোযার সওয়াব লাভ করবে। [তবরানি- ১১/৭২]
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সা. জনৈক সাহাবীর প্রশ্নের উত্তরে বললেন, রমজানের পর যদি তুমি রোযা রাখতে চাও তবে মুহাররম মাসে রাখ। কারণ এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ তাআলা একটি জাতির তওবা কবুল করবেন। [জামে তিরমিযি- ১/১৫৭]
উল্লেখ যে, এ হাদীসে রোযার পাশাপাশি তওবা ও ইস্তেগফারেরও ইঙ্গিত এসেছে।
হযরত আবু কাতাদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেন, আমি আশাবাদি যে, আশুরার রোযার অসিলায় আল্লাহ পাক অতীতের এক বছরের (ছগিরা) গুনাহ মাফ করে দিবেন। [সহীহ মুসলিম- হাদীস নং-১১৬২]
এই হাদীসগুলোর আলোকে আশুরার দিনের রোযাটির গুরুত্ব ও ফযীলত সম্পর্কে জানা জায়। তবে যেহেতু আশুরার দিন রোযা রাখলে দৃশ্যত ইয়াহুদিদের আমলের সাথে সাদৃশ্যতা বুঝা যায় তাই আশুরার দিনের আগের দিন অথবা পরের দিন আরো একটি রোযা মিলিয়ে রাখা উচিৎ। এ ব্যাপারে হাদীসে পাকেও নির্দেশনা এসেছে। হাদীসটি সাহাবি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সা. বললেন, তোমরা আশুরার রোযা রাখ এবং ইয়াহুদিদের সাদৃশ্য বর্জন কর; তাই আশুরার আগে বা পরে আরো একটি রোযা রাখ। [মুসনাদে আহমদ ১/২৪১]
উল্লেখ্য যে, এ হাদীসে আমাদের জন্য আরো একটি শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। সেটা হলো অমুসলিমদের সাথে কিঞ্চিত সাদৃশ্যও হুজুর সা. পছন্দ করতেন না। অথচ ঐ সাদৃশ্যতা মন্দ বা নাজায়েয কাজের মধ্যে নয়; বরং একটি ইবাদতে সাদৃশ্যতা ছিলো। সেদিন তারা যে ইবাদত করতো সেদিন আমরাও সে ইবাদত করতাম। কিন্তু রাসূল সা. এতোটুকুও সহ্য করলেন না। কেন? কারণ আল্লাহ তাআলা যে ধর্ম মুসলামানদেরকে দিয়েছেন তা অন্যান্য ধর্মের তুলনা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দাবিদার এবং সর্বাধিক মর্যাদাবান। সুতরাং একজন মুসলমানের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সর্বদিক অমুসলিম থেকে ভিন্ন ধারার হওয়া উচিত। তার কর্মপদ্ধতি, তার চাল-চলন, উঠা বসা, তার আপাদমস্তক, তার আমল আখলাক, তার ইবাদত সবকিছু অমুসলিম থেকে ভিন্ন প্রকৃতির হওয়া উচিত।
মোটকথা উপরিউক্ত হাদীসগুলোর আলোকে আশুরার দিনে করণীয় হিসেবে আমরা দুটি জিনিস পেলাম- এক. রোযা রাখা এবং দুই. তওবা ইস্তেগফার করা। আশুরার দিনে এ দুই আমল ছাড়া অতিরিক্ত অন্য কোনো আমল কুরআন হাদীসে পাওয়া যায় না।

আশুরার দিনে বর্জনীয় জিনিসসমূহ
আশুরার দিনে রোযা ও তওবা ইস্তেগফার ছাড়া যেহেতু অন্য কোনো আমল পাওয়া যায় না তাই আমাদের দেশে আশুরার দিনে যে সমস্ত রেওয়াজ রুসম রয়েছে যেমন- মিলাদ মাহফিল করা, খিচুড়ি পাকানো, বিশেষত শিয়াদের আবিষ্কৃত কু-প্রথা ও বিদআতগুলো যেমন তাজিয়া (মাজারের সাদৃশ্য করে হযরত হুসাইন রা. এর নকল কবর তৈরী করা), ঢাক ঢোল ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো, হায় হাসান হায় হুসাইন বলে মাতম করা, ছুরি মেরে নিজের বুক পিঠ থেকে রক্ত বের করে বুক চাপড়ানো, শোকের পোশাক পরা ইত্যাদি অবশ্যই বর্জনীয়। এ সব করা যেমন হারাম তেমনি এ সব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করাও হারাম। আল্লাহ তাআলা নিজ দয়ায় আমাদেরকে আশুরার পবিত্রতা ও তাৎপর্য থেকে উপকৃত হওয়ার এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনে দিনটি অতিবাহিত করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

2 মন্তব্য রয়েছেঃ আশুরার তাৎপর্য : করণীয় ও বর্জনীয় : মুফতী আবু উসামা

  1. Abu_Sawda says:

    Maa shaa Allah this is really helpful for the muslim ummah. I would request all the hard working people who are involved in this praiseworthy magazine, please make an English version for the monthly al jannat so our children in the UK can be benefited as well. Jazaakumullah

  2. খুব তাতপর্যপূর্ণূ একটি লেখা। আশুরার লেখা পড়ে অনেক উপকৃত হলাম। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight