আল মসজিদুল আকসা : অতীত ও বর্তমান ড. মোহাম্মদ আরিফুর রহমান

আল মসজিদুল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাস ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ। এটি ইসলামরে প্রথম কেবলা এবং মক্কা ও মদিনার পর তৃতীয় পবিত্র স্থান।  এটির সাথে একই প্রাঙ্গণে কুব্বাত আস সাখরা, কুব্বাত আস সিলসিলা ও কুব্বাত আন নবী নামক স্থাপনাগুলো অবস্থিত। আল্লাহর নবী হযরত ইব্রাহীম আ. জেরুসালেম এ মসজিদটি  প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।  কাবা নির্মাণের চল্লিশ বছর পর (খ্রিষ্টপূর্ব ২১৭০) তিনি এটিকে আরও সম্প্রসারণ করেন, যা পরবর্তীতে “বাইতুল মুকাদ্দাস” নামে পরচিতি হয়। মসজিদে হারামের তুলনায়  দূরতম  উপাসনার স্থান  হওয়ায়, ইব্রাহীম আ. এটিকে “মাসজদিুল আকসা” বলে উল্লেখ করতেন। পরবর্তীতে হযরত দাঊদ আ. ও তাঁর পুত্র হযরত সুলায়মান আ. এই মসজিদটির স্থাপত্য নতুনরূপে তৈরি ও  সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন (খ্রিষ্টপূর্ব ১০০৪)। বর্ণিত আছে,  হযরত সুলায়মান আ. এই কাজে তিনি  জ্বীনদরেকে  নিয়োগ করেছিলেন এবং আল্লাহ তাআলা “গলিত তামার ঝর্ণা” প্রবাহিত করেছিলেন। বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদ এবং তার আশপাশের এলাকা বহু নবীর স্মৃতিবিজড়িত। এ পবিত্র নাম শুধু একটি স্থানের সঙ্গে জড়িত নয় বরং এ নাম সব মুসলমানদের ঈমান ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এখানে রয়েছে অসংখ্য নবী-রাসূলরে মাজার।
আল আকসা মসজিদের গুরুত্বের আরও একটি বড় কারণ হলো প্রথম থেকে হিজরত পরবর্তী ১৭ মাস পর্যন্ত মুসলমানরা আল আকসা মসজিদের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতেন। পরবর্তীতে মহান আল্লাহর নির্দেশে মুসলমানদের কেবলা মক্কার দিকে পরিবর্তিত হয়। এ পবিত্র মসজিদ থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঊর্ধাকাশে তথা মিরাজ গমন করেছিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিরাজ গমনের সময় আল আকসায় অতীতের সব নবী-রাসূলের জামাতে ইমাম হয়ে নামাজ আদায় করেছিলেন। মিরাজের রাতে মসজিদুল হারাম থেকে আল-আকসা মসজিদে এসেছিলেন এবং এখান থেকে তিনি ঊর্ধাকাশের দিকে যাত্রা করেন। আল-আকসা মসজিদে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিরাজের রাতে, বিদ্যুৎ ও আলোর  চেয়ে দ্রুতগামী বাহন বোরাকে চড়ে এসেছিলেন। মিরাজ শেষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম বাইতুল মুকাদ্দাসে অবতরণ করেন। সেখান থেকে বোরাকে করে প্রভাতের পূর্বেই মক্কায় পৌঁছেন। সাহাবী হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন যে, যখন কুরাইশরা আমাকে অস্বীকার করল, তখন আমি কাবার হিজর অংশে দাঁড়ালাম। আল্লাহ তাআলা তখন আমার সামনে বায়তুল মুকাদ্দাসকে তুলে ধরলেন, যার  কারণে আমি দেখে দেখে বাইতুল মুকাদ্দাসের নিদর্শনগুলো তাদের কাছে ব্যক্ত করছিলাম। [সহীহ বুখারী]
রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার মসজিদুল হারাম, মদিনার মসজিদে নববী ও বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদের উদ্দেশে সফরকে বিশেষভাবে সওয়াবের কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যা অন্য কোন মসজিদ সম্পর্কে করেননি। মুসলমানদের প্রথম কেবলা হিসেবে পরিচিত এ মসজদিটি বর্তমানে ফিলিস্তিনের পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত। এটি মধ্যপ্রাচ্যের দক্ষিণাংশের একটি ভূখ-, যা ভূমধ্যসাগর ও জর্ডান নদীর মাঝে অবস্থিত। এটি ইহুদি ধর্ম ও  খ্রিষ্টধর্মীদের পবিত্র স্থান। ভৌগলিক অবস্থান ও দুটি প্রধান ধর্মের সূতিকাগার হওয়ায় স্বভাবতই ফিলিস্তিন নামক ভূখ-টির রয়েছে ধর্ম, সংস্কৃতি, বাণিজ্য ও রাজনীতির এক র্দীঘ ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ইতিহাস। ৭ম শতকে (৬৩৭ সালে) খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনামলে মুসলিমরা  জেরুজালেম জয় করে।  খলিফা উমর একে মুসলিম সা¤্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। উমর ইবনে আল-খাত্তাব রা. একাই একটি গাধা এবং এক চাকরকে নিয়ে মদীনা ছেড়ে জেরুজালেমের উদ্দেশে যাত্রা করেন। জেরুজালেমে স¤্রাট সোফ্রোনিয়াস তাঁকে স্বাগত জানান। মুসলিমদের খলিফা তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে মতাধর ব্যক্তি উমর রা. খুব সাধারণ বুননের পোশাকে।  তাঁকে ও ভৃত্যের মধ্যে কে উমর তা আলাদা করা যাচ্ছিল না। এ অবস্থা দেখে সোফ্রোনিয়াস খুবই বিস্মিত হন। তিনি শহরের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চুক্তিবদ্ধ হন। জেরুজালেম অবরোধের পর সোফ্রোনিয়াস খলিফা উমরকে স্বাগত জানান। কারণ জেরুজালেমের চার্চের কাছে পরচিতি বাইবেলের একটি ভবিষ্যতবাণীতে একজন দরিদ্র কিন্তু  ন্যাপরায়ন ও শক্তিশালী ব্যক্তি জেরুজালেমের খ্রিষ্টানদের রক ও মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হবেন এমন উল্লেখ ছিল। সোফ্রোনিয়াস বিশ্বাস করতেন যে সাদাসিধে জীবনযাপনকারী বীর যোদ্ধা উমর এই ভবিষ্যতবাণীকে পূর্ণ করেছেন। আলেক্সান্দ্রিয়ার  পেট্রিয়ার্ক ইউটিকিয়ার্সের  লেখা, উমর চার্চ অব দ্য হলি সেপালচার পরিদর্শন করেন ও উঠোনে বসেন। নামাজের সময় হলে তিনি চার্চের বাইরে গিয়ে নামাজ আদায় করেন যাতে পরবর্তীতে  কেউ তার নামাজের কারণকে ব্যবহার করে কেউ পরবর্তীকালে এই চার্চকে মসজিদে রূপান্তরিত না করে।  তিনি এও উল্লেখ করেন যে উমর একটি আদেশনামা লিখে তা পেট্রিয়ার্ককে হস্তান্তর করে। এতে উক্ত স্থানে মুসলিমদের প্রার্থনা করতে নিষেধ করা হয় বলে ইউটিকিয়ার্স উল্লেখ করেন। ১০৯৯ সালে প্রথম ক্রুসেডের সময় ইউরোপীয় খ্রিষ্টান সেনাবাহিনী জেরুজালেম দখল করে এবং ১১৮৭ সালে ২ অক্টোবর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ূবী কর্তৃক তা বিজিত হওয়ার  আগ পর্যন্ত এতে তাদের কর্তৃত্ব বহাল ছিল। রোমান সা¤্রাজ্য, ক্রুসেডের কত ঝড়ই না বয়ে গিয়েছে এ শহরের ওপর। তিনটি ধর্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই শহর।  তিনটি ধর্মের পবিত্র স্থান রয়েছে এ শহরে। রয়েছে এই শহর নিয়ে তাদের দাবিও। এই প্রবাহটির আন্দাজ পেতে  গেলে খুব পিছনে ফিরে তাকাতে হয় না। ধর্ম আর রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে  তৈরি হয়েছে র্দীঘ ঘটনা প্রবাহ। যে প্রবাহ অনেক রক্ত ঝরিয়েছে, অনেক আক্রমণ, প্রতি আক্রমণ  দেখেছে। এই পুরো প্রবাহের পথে কোনও একটি শহর যদি কেন্দ্রে থাকে, তা হলে তা জেরুজালেম। ফিলিস্তিনের অপরাপর নামগুলো হলো: কানান, জায়ন, ইসরায়েলের ভূমি, দণি সিরিয়া, জুন্দ ফিলিস্তিন এবং পবিত্র ভূমি। যা হোক, ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের মাধ্যমে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হলেও উপেতি থেকে যায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ।  যদিও জাতিসংঘে পাস হওয়া প্রস্তাবটি ছিল অযৌক্তিক৷ বিশ্ব রাজনীতির কূঠকৌশলে জিতে গিয়ে ইহুদিরা হয়ে ওঠে আরো হিং¯্র। তারা হত্যা সন্ত্রাসের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করার উদ্দেশে রাতে তাদের ফোন লাইন, বিদ্রুৎ লাইন কাটা, বাড়ি-ঘরে হ্যান্ড গ্রেনেড নিপে, জোর করে জমি দখল এবং বিভিন্নভাবে নারী নির্যাতন করে মৃত্যুর বিভীষিকা সৃষ্টি করতে লাগলো৷ ফলে লাখ লাখ আরব বাধ্য হলো দেশ ত্যাগ করতে। ুব্ধ আরব দেশগুলো পুরো ফিলিস্তিনকে নিয়ে একটি একক, গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ডাক দেয়। ১৫ নভেম্বর আলজিয়ার্স সালে ১৯৯৮  শহরে নির্বাসনে ঘোষিত একটি রাষ্ট্র, যেখানে প্যালস্টোইন লিবারেশন অরগানাইজেশন (পিএল অ) ও প্যালস্টোইন জাতীয় পরিষদ (পিএনসি) একপাকি ভাবে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। ১৯৮৮ ঘোষণার সময়ে কোন অঞ্চলেই পিএলঅ’র নিয়ন্ত্রণ ছিল না, যদিও তারা যে অঞ্চলগুলি দাবি করেছিল আন্তর্জাতিকভাবে  সেগুলি ইসরায়েলের দখলে ছিল।  আরবদের দাবি, ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ দ্বারা প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন বিভাগ যেভাবে প্রস্তাবিত হয়েছিল, যেখানে ফিলিস্তিন ভূখ- গাজা ভূখ- ও ওয়েস্টব্যাংক ছাড়াও ইসরায়েল শাসনাধনি অঞ্চলও ছিল এবং জেরুজালেম ঘোষিত রাষ্ট্রের রাজধানী আখ্যা  দেওয়া  হয়েছিল। ১৯৭৪ আরব লীগ শীর্ষ বৈঠকে স্থির হয়েছিল, পিএলঅ ফিলিস্তিনের জনগণের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি এবং  তাদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠিত আহবান জানিয়ে ছিল। ২২ নভম্বের ১৯৭৪, থেকে একটি হিসেবে জাতি পিএলঅ কে “রাষ্ট্রহীন-সত্তা” রূপে পর্যবেক অবস্থা রাখা হয়েছিল। যারা কেবলমাত্র জাতিসংঘে তাদের বক্তব্য রাখতে পারেন, কিন্তু ভোট দেবার কোন মতা নেই। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের যে প্রস্তাব অনুসারে আজকের ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা, সেই একই প্রস্তাব অনুযায়ী একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রেরও প্রতিষ্ঠার কথা। কিন্তু দীর্ঘ সাত দশক পরও অধরাই রয়ে গেছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রবক্তার দাবিদার পশ্চিমা বিশ্ব ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার তথা স্বাধীনতার বিষয়ে নানা চালচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে ফিলিস্তিনি জনগণের মৌলিক অধিকার চরমভাবে ুণœ করে যাচ্ছে এবং স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের বিষয়ে অহেতুক কালপেণ করছে। এর মাধ্যমেই পশ্চিমা বিশ্বের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের স্বরূপটি উন্মোচিত হয়েছে। ১৯৯৩ সালে ওসলো শান্তি চুক্তিতে ফিলিস্তিনীয় প্রশাসনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। পশ্চিম তীর ও গাজা শাসনের অধিকার পায় তারা। কিন্তু জেরুজালেম নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। কারণ, ১৯৯৩ এর মতো শান্ত পরিস্থিতিতেও এই আগুনে হাত ছোঁয়ানোর সাহস দেখায়নি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিন। তারপর থেকে পরিস্থিতি ক্রমইে খারাপ হয়ছে। এ পর্যন্ত হাজার হাজার নিরপরাধ ফিলিস্তিনি যাদের বেশিরভাগ নারী এবং শিশু। অসহায় ও দুর্গত গাজাবাসী একটু ত্রাণের জন্য শুধুই পথ চেয়ে আছে। আক্রান্তরা বিদ্যুৎ, পানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যেরে অভাবে দুর্বিষহ দিনাতিপাত করছে। সম্প্রতি ফিলিস্তিনের আল আকসাকে মুসলমানদের পবিত্র স্থান বলে ঘোষণা করেছে ইউনেস্কো। ১৩ অক্টোবর পাসকৃত এক প্রস্তাবনায় বলা হয়, জেরুজালেমের আল আকসা মসজিদের ওপর ইসরাইলের কোনো অধকিার নেই, আল আকসা মুসলমানদের পবিত্র স্থান। এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য ও বিশ্বসমাজে সর্বজনবিদিত বিষয়ও। যদিও এটিকে সিনাগগ বা ইহুদি মন্দির দাবি করে ইসরাইল অন্যায় আগ্রাসন ও মানবতাবিরোধী আচরণ করে যাচ্ছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আরও ইন্ধন জোগালেন। জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেেব সীকৃতি দিয়ে তিনি আগুনে ঘি ঢেলে দিলেন। আরও চওড়া হয়ে গেল বিরোধের খাদটি। আবার রাস্তায় নেমেছে ফিলিস্তিনিরা। শুরু করেছে আন্দোলন। ইসরায়েলও তা প্রতিরোধের নামে আবারো নতুনভাবে হত্যা যজ্ঞে মেতে উঠেছে। সামনে আরো রক্তের বন্যা বয়ে যাবে। এ অবস্থায় আল আকসা মসজিদের পবিত্রতা রার জন্য মুসলিম উম্মাহর ইস্পাত কঠিন ঐক্যের প্রয়োজন। মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা দখলদার ইহুদীদের হাত থেকে পবিত্র ভূমি ও মসজিদুল আকসাকে রা করতে পারে। বিশ্বের সকল গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পরে শক্তি মসজিদুল আকসা ও ফিলিস্তিনিদের স্বাধিকার প্রশ্নে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করুক এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight