আল কুরআন সংরক্ষণে স্রষ্টার আলৌকিক ব্যবস্থা : মুফতী পিয়ার মাহমুদ

আমাদের অজানা নয় যে, এ বিশ্বের গোটা রক্ষা ব্যবস্থা মানুষের পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি একজন অন্য জনকে সাহায্য না করে, তবে একাকী মানুষ হিসেবে সে যতই বুদ্ধিমান, শক্তিশালী ও বিত্তশালী হোক, জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র কিছুতেই সংগ্রহ করতে পারবে না। একাকী মানুষ স্বীয় খাদ্যের জন্য শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আহার্য করা পর্যন্ত সব স্তর অতিক্রম করতে পারে না। এমনিভাবে পোশাক-পরিচ্ছদের জন্য তুলা চাষ থেকে শুরু করে দেহের মানানসই পোশাক তৈরি করা পর্যন্ত অসংখ্য সমস্যার সমাধান করতে একাকী কোন মানুষ কিছুতেই সক্ষম নয়। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় অসীম জ্ঞান ও পরিপূর্ণ ক্ষমতায় বিশ্ব চরাচরের জন্যে এমন অটুট ব্যবস্থাপনা রচনা করেছেন, যাতে প্রত্যেকটি মানুষই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্য হাজারো লাখো মানুষের মুখাপেক্ষী। দরিদ্র ব্যক্তি পয়সার জন্যে যেমন ধনীর মুখাপেক্ষী, তেমনি শ্রেষ্ঠতম ধনী ব্যক্তিও পরিশ্রম ও মেহনতের জন্যে দিনমজুরের মুখাপেক্ষী। তদ্রুপ ব্যবসায়ী গ্রাহকের মুখাপেক্ষী আর গ্রাহক ব্যবসায়ীর মুখাপেক্ষী। গৃহনির্মাতা রাজমিস্ত্রী ও কর্মকারের মুখাপেক্ষী, আর এরা গৃহনির্মাতার মুখাপেক্ষী। চিন্তা করলে দেখা যায়, এ সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা শুধু পার্থিব জীবনের জন্যে নয় বরং মৃত্যু থেকে নিয়ে কবরে সমাহিত হওয়া পর্যন্ত সকল স্তরে এ সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী। বরং এরপরও মানুষ জীবিতদের ইছালে ছওয়াব ও দুআয়ে-মাগফিরাতের মুখাপেক্ষী থাকে। যদি এহেন সর্বব্যাপী মুখাপেক্ষিতা না থাকতো, তবে কে কার সাহায্যে এগিয়ে আসতো। মোটকথা, সমগ্র বিশ্বের ব্যবস্থাপনা পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ চিত্রের একটা ভিন্ন পিঠও আছে। তা এই যে, যদি চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদির জন্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা হতে থাকে ও চোর ডাকাতদের বড় বড় দল গঠিত হয়ে যায়, তবে এ সাহায্য ও সহযোগিতাই বিশ্বব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত ও তছনছ করে দেয়। এতে বুঝা গেল যে, পারস্পরিক সহযোগিতা একটি দুধারী তরবারী। যা প্রয়োগ ব্যতীত বিশ্বের ব্যবস্থাপনা চলে না। ক্ষুর এর ভুল ব্যবহার গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে বানচাল করে দেয়। সেজন্য কুরআন সুন্নাহ পরস্পর সহযোগিতার একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা অবলম্বনে বিশ্বব্যবস্থা অটুট থাকবে আর মানুষের জীবনে নেমে আসবে সুখ-শান্তি, আরাম ও আনন্দের স্রোতধারা। এ মর্মে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো, গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না। [সূরা মায়েদা : ২] চিন্তা করলে দেখা যায় যে, কুরআনে কারীম এ আয়াত কেবল মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিচ্ছে। তাও শুধু সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ক্ষেত্রে। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে একথা প্রতীয়মান হয় যে, গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে কাউকে সহযোগিতা করা যাবে না, যদিও সে মুসলমান হয়। বরং তাকে গুনাহ ও জুলুম থেকে বিরত রাখাই হবে প্রকৃত সহায়তা। বুখারি শরীফে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, তোমার (মুসলিম) ভাইকে সাহায্য কর, চাই সে জালেম হোক কিংবা মাজলুম হোক। সাহাবায়ে কেরাম রা. বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাজলুমকে সাহায্য করার অর্থ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করার দ্বারা কি উদ্দেশ্য? তখন রাসূল সা. ইরশাদ করেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখ, এটিই তার সাহায্য। [বুখারি : ৩/১৩৮-হাদীস নং ২৪৪৪] কুরআন পাকের এ শিক্ষা, সৎকর্ম ও তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে মাপকাঠি বানিয়েছে। এর ভিত্তিতেই পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। আর এর বিপরীতে পাপ ও অত্যাচারকে কঠোর অপরাধ গণ্য করেছে এবং এতে সাহায্য-সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি হেদায়েত ও সৎকর্মের প্রতি আহ্বান জানায়, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারী লোকদের ছাওয়াবের সমপরিমাণ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের ছাওয়াব হ্রাস করা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পাপের প্রতি আহবান করে, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের গুনাহ হ্রাস করা হবে না। [মুসলিম শরীফ : ৪/২০৬০- হাদীস নং ২৬৭৪] অন্য রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারীর সাথে তার সাহায্যার্থে বের হয়, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। [মুজামুল কাবীর তাবরানী : ১/২২৭] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন ঝগড়া-বিবাদে অন্যায় পথে সহযোগিতা করে, সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে থাকে, যতক্ষণ না তা হতে ফিরে আসে। [মুসতাদরাকে হাকেম : ৪/৯৯- হাদসি নং ৭০৫১, বাইহাকী : ৬/১২৩- হা. ৭৬৭৬] এছাড়াও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে এ প্রসঙ্গে আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে, যেগুলি অধ্যয়ন করলে একথাই পরিস্ফুটিত হয় যে, সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে সহায়তা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য আর গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়তা হারাম। গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা করার কয়েকটি চিত্র আল্লামা আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ আনওয়ারুল বয়ানে উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, যে চাকরী বা পদের কারণে গুনাহে লিপ্ত হতে হয়, তা গ্রহণ করা হারাম, এভাবে গুনাহের আইন প্রণয়ন করাও হারাম। কেননা, এর দ্বারা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হয়। এমনিভাবে মদের কারখানায় চাকুরী করা কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে সহযোগিতা করা অথবা এমন চাকুরী করা যাতে শরীয়ত পরিপন্থী কাজে অন্যকে সহায়তা করা হয় বা সুদ-ঘুষের লেন-দেন করা হয় অথবা সুদ-ঘুষ আদান-প্রদানের মাধ্যম হতে হয়, এধরণের চাকুরী করা হারাম এবং তা থেকে অর্জিত বেতন হারাম। এভাবে চোর, ডাকাত, লুটতরাজকারী ও অত্যাচারীর সহায়তা করাও হারাম। [তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান : খ-৩, পৃ. ১২] রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এ শিক্ষার সুফল রাসূলুল্লাহ সা. কে যখন দুনিয়ায় প্রেরণ করা হলো তখন ত পুরো ‘আরব উপদ্বীপ’ নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতার নরকে পরিণত ছিল। হত্যা ও নাশকতার বাজার গরম ছিল। লুণ্ঠনকে বীরত্ব ও বাহাদূরী মনে করা হতো। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত দাফন করে বড়াই করা হতো। নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থীরতার সেই পরিবেশে রাসূলুল্লাহ সা. সংবাদ দিয়েছিলেন, একটা সময় আসবে একজন নারী একাকী হীরা থেকে ভ্রমণ করে মক্কায় এসে তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সে ভয় করবে না। [বুখারি শরীফ : ৪/৫৩৮ হাদীস নং ৩৫৯৫] জগদ্বাসী প্রত্যক্ষ করেছে, রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পূর্বেই সেই সময় এসেছিল। যে ‘আরব উপদ্বীপ’ হিংসা বিদ্বেষ, শত্র“তা ও অস্থিরতার জলন্ত আঙ্গার ছিল, সেখানে ভালোবাসা, হৃদ্রতা, একতা, শান্তি ও নিরাপত্তার ফুল প্রস্ফুটিত হয়েছিল ও গড়ে উঠেছিল বেহেশতি নহরের পানিতে বিধৈাত একটি সুশীল আদর্শ সমাজ। আরবের এ চিত্র পুলিশ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে হয়নি। বরং কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষার ফলে হয়েছিল। কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষাই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির বীজ রোপণ করে দিয়েছিল। এবং প্রতিটি ব্যক্তিকে অপরাধ উৎপীড়ণ দমনের জন্যে সিপাহী রূপে গড়ে তুলেছিল। আর বানিয়েছিল তাদেরকে তাকওয়া ও সৎকাজের অনন্য সহযোগী। এর ফলে সৎকাজের সহযোগিতায় তারা ছিলেন প্রতিযোগী। আর অসৎকাজ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায়। তদ্রুপ নিজেকে পাপ ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে তারা ছিলেন সর্বদা সচেতন। এরই অনিবার্য পরিণতি ছিল যে, তারা অপরাধের প্রতি পা বাড়াতেনই না। ঘটনাক্রমে যদি কখনও অপরাধ সংঘটিত হয়ে যেত, আল্লাহর ভয় তাদেরকে অস্থির করে তুলত, তখন নিজেই রাসূল সা. এর দরবারে গিয়ে স্বীকার করতো। যতক্ষণ পর্যন্ত এর পূর্ণ প্রতিকার না হতো পরকালের চিন্তায় ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পেতো না। কুরআনের এ শিক্ষা পরিহারের পরিণাম কিন্তু আমাদের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা ও সৎকাজে বাধা প্রদান করতে ব্যতিব্যস্ত। সচরাচর পরিলক্ষিত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি ইসলামী বেশভূষা গ্রহণ করতে চায়, সুন্নতি পোশাক পরিধান করতে চায়, সুন্নত মোতাবেক জীবন যাপন করতে চায়, তখন তার বন্ধুবান্ধব, পরিবারবর্গ ও অফিসের লোকজন চেষ্টা করে, সে যেন এই ছাওয়াবের কাজ থেকে বিরত থাকে এবং আমাদের ন্যায় (পাপী) হয়ে যায়। আজকাল সৎকাজে সহায়তা করতে কেউ প্রস্তুত নয়। কিন্তু কেউ যদি গুনাহ করার ইচ্ছা করে তখন সবাই তার সহযোগী হয়। হারাম উপার্জন করলে, সুদ গ্রহণ করলে ও দাড়ি মুন্ডালে স্ত্রীও খুশী, মা-বাবাও খুশি, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের লোকজন খুবই খুশী। যদি সৎপথে চলতে চায়, সুন্নাতের উপর চলতে চায়, তখন সবাই অসন্তুষ্ট। বন্ধু নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সিনেমা হলে নিয়ে যায়। গান বাদ্য ও মদের আসরে নিয়ে যায়। তারপর ধোঁকা দিয়ে নাপিতের দোকানে নিয়ে যায়, নিজের পকেটের টাকা দিয়ে দাড়ি কামিয়ে দেয়। আবার অনেকে অন্যের দুনিয়া সাজাতে নিজের আখেরাত ধ্বংস করে। যেমন, নির্বাচনের সময় ভোটার এবং সমর্থকরা একথা ভালোকরেই জানে যে, আমরা যে পার্থীকে পদে বসাতে চাচ্ছি সে একজন ফাসেক ও জালেম। পদ অর্জনের পর তার জুলম আরো বৃদ্ধি পাবে। তবুও তার সহযোগিতায় লিপ্ত থাকে। তাকে সফল করার লক্ষে তার প্রতিপক্ষের দুর্ণাম রটিয়ে বেড়ায়। কখনো কখনো বিপক্ষের লোকদেরকে হত্যাও করা হয়। এটি কতবড় অহমিকা ও নির্বুদ্ধিতা যে, নিজের আখেরাত ধ্বংস হবে আর অন্যের দুনিয়া অর্জন হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম ব্যক্তিদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিও হবে যে, অন্যের দুনিয়ার জন্যে নিজের আখেরাত ধ্বংস করেছে। [ইবনে মাজা : ৪/৩৩৯ হা. ৩৯৬৬] আজ আমাদের গুনাহ ও অপরাধের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার কারণে, সারাবিশ্বে অপরাধ, চুরি, ডাকাতি, অশ্লীলতা, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তা দমন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এহেন দুর্গতি, দুরাবস্থা ও অস্থিরতা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে হলে, কুরআনের এই মূলনীতি অনুসরণ হবে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও অপরাধ দমনের লক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তিই সচেষ্ট হতে হবে। শিক্ষার্থী : উচ্চতর তাফসীর গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

এই ধুলির  ধরায় মহান স্রষ্টা যতগুলো কিতাব নাযিল করেছেন মহাগ্রন্থ  আল কুরআন ছাড়া সবগুলোতেই বিকৃতি সাধিত হয়েছে। আল কুরআনের সকল কিছুই আজো সুসংরক্ষিত। আপনরুপে অবিকৃত থাকবে কিয়ামত অবধি ইনশাআল্লাহ। কেননা আল কুরআনের হেফাজত ও সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন সকল কিছুর কর্তা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে- ‘নিশ্চয় আমিই এই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমিই তা সংরক্ষণ করব। ’ [হিজর:৯]
এই ওয়াদা আসমানী। সকল কিছুর মালিক আল্লাহর ওয়াদা। আর এ ব্যাপারে কুরআনের অমোঘ ঘোষণা হলো ‘আল্লাহ কখনও ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। ’ [আল ইমরান:৯; রোম:৬] আল্লাহ তাআলা তার সেই ওয়াদা পূর্ণ করেছেন এবং স্বীয় কিতাব আল কুরআন হেফাজত ও সংরক্ষণের এক বিষ্ময়কর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। সেই বিষ্ময়কর ব্যবস্থার সার-সংক্ষেপ নিম্নে বিধৃত হলো।

১.কুরআনের শব্দাবলি সংরক্ষণ
কুরআনের সেই শব্দগুলো হুবহু সংরক্ষণ করেছেন যে গুলো ওহীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সা. এর উপর নাযিল করেছেন। মহানবী সা.-এর উপর যখন কোনো আয়াত কিংবা সূরা নাযিল হত তখন তিনি সঙ্গে সঙ্গে ওহী লেখক কোনো সাহাবীর মাধ্যমে তা লিখিয়ে নিতেন। এরপর সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহর সা. পবিত্র যবানে তা শ্রবণ করতেন এবং মুখস্ত করে ফেলতেন। এভাবে কুরআন নাযিলের সময়ই সম্পূর্ণ কুরআন লিখে ফেলা হয় এবং অসংখ্য সাহাবায়ে কেরাম রা. তা মুখস্তও করে ফেলেন। নিম্নে কতিপয় হাফেজে কুরআন সাহাবীর নাম উল্লেখ করছি: চার খলীফা, হযরত তালহা রা., হযরত সাআদ রা., আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা., হযরত হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান রা., হযরত আবু হুরায়রা রা., হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা., হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা., হযরত আমর ইবনুল আস রা., আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা., হযরত মুআবিয়া রা. প্রমুখ। [মাআরিফুল কুরআন:১/২১] তদুপরি মহা মহিমাময় স্রষ্টা পরম কৃপায় মহানবীর সা. মাঝে এমন প্রখর ও তীক্ষè মেধা ও স্মৃতিশক্তি সৃষ্টি করে দেন যে, একবার ওহী নাযিল হওয়ার পর তা আর কখনও ভুলতেন না। ফলে ওহী নাযিল হওয়ার সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ সা. এর অন্তরে দৃঢ়বদ্ধ হয়ে যেত। এভাবেই মহানবীর সা.এর পবিত্র সীনা আল কুরআনের এমন সুরক্ষিত ভান্ডারে পরিণত হয় যে, তাতে সামান্যতম সংযোগ-বিয়োগ কিংবা ভূল-ত্রুটি হওয়ার কোনো আশংকাই ছিলনা। এরপর অধিকতর সতর্কতার জন্য প্রতি বছর রমজানে কুরআনের নাযিলকৃত অংশ হযরত জিবরাঈলকে আ. তিলাওয়াত করে শুনাতেন আর নিজেও জিবরাঈল আ. থেকে শুনে নিতেন। মৃত্যুর বছর এ কাজটি রাসূল সা. দুবার করেন। [আরিফুল:১/২০, বুখারি:৭৪৭Ñ৭৪৮]
নবী যুগের পর আবু বকর রা. এর খিলাফতকালে হযরত উমর ও অনান্য সাহাবাগণের পরামর্শক্রমে কুরআনে কারীম একত্রে সংকলন করা হয়। এরপর হযরত উসমান রা. এর আমলে নতুনভাবে সংকলন করে এক মাসহাফে বাঁধাই করে একাধিক কপি তৈরি করে কুফা, বসরা, সিরিয়া, মক্কা ইত্যাদি মুসলমানদের কেন্দ্রীয় শহরগুলোতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। [মাআরিফুল কুরআন:১/২৩-২৯; বুখারি-২/৭৪৫-৭৪৬; ফাতহুলবারী : ৯/১৫-১৭]

২. অর্থ ও মর্ম সংরক্ষণ
মহা মহিম পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমের শব্দাবলি যেমন সংরক্ষণ করেছেন তেমনি এর মর্ম ও অর্থও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন বিষ্ময়কর পন্থায়। কেননা শুধুমাত্র শব্দবলি সংরক্ষিত থাকা কুরআন সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট ছিল না। অর্থ ও মর্ম সংরক্ষিত  না হলে এর বিকৃতি ও অপব্যাখ্যা অনেকটাই অনিবার্য। যেমনটা হয়েছে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব সমূহের ক্ষেত্রে। সেগুলোতে যেমন শব্দের বিকৃতি ও প্রক্ষেপ ঘটেছে তেমনি অর্থ ও মর্মগত বিকৃতি ও অপব্যাখ্যাও কম ঘটেনি। কারণ সেগুলোর জন্য শব্দের মতো অর্থ ও মর্ম সংরক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তাদের নবীদের কথা, কাজ ও জীবনী সংরক্ষণের কোনো পদক্ষেপও গ্রহণ করেনি, ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। আজ সেগুলোর আসল শব্দ ও মর্ম কোথাও খোঁজে পাওয়া যাবে না। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য আল্লামা রহমাতুল্লাহ কিরানভী রচিত  “ইজহারুল হক” আল্লামা তাকি উসমানি রচিত, “খৃষ্ট ধর্মের স্বরূপ” কিতাব দুটো অধ্যয়ন করা যেতে পারে। পক্ষান্তরে কুরআন এর শব্দেরমতো মর্মকেও সুসংরক্ষিত করা হয়েছে সুন্নতে নববীর দ্বারা। প্রতিটি আয়াতের তফসীর স্বয়ং রাসূলূল্লাহ সা. করে গিয়েছেন যাকে বলা  হয় “তফসীর বিল মাছুর”। আল্লামা ইবনে কাছীর, ইমাম সূয়ূতি রহ. সহ অসংখ্য উলামায়ে কেরাম প্রতিটি আয়াতের তাফসীর হাদীসে রাসূল দ্বারা করে দেখিয়েছেন। আর এটি মূলত আল্লাহর পক্ষ হতেই ছিল। কেননা কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে “কুরআনের ব্যাখ্যা ও তাফসীর আমারই জিম্মায় নিয়েছি। ’ [কিয়ামাহ:১৯] অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুহাম্মদ ! আমি আপনার উপর কুরআন এজন্য নাযিল করেছি যেন মানুষের নিকট এর ব্যাখ্যা আপনি করেন। ’ সূরা নজমে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি (মুহাম্মদ সা.) কোনো কথাই নিজ প্রবৃত্তি থেকে বলেন না ; বরং তিনি যা বলেন সকল কিছুই আল্লাহর পক্ষ হতে ওহী। ’ [নজম:৩,৪] উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা একথাই প্রমাণিত হয় যে, তাফসীর বিল মাছুর মূলত: অসীম কুদরতের অধিকারী আল্লাহর পক্ষ হতেই কৃত তাফসীর।

৩. কুরআনের ভাষার সংরক্ষণ কুরআনে শব্দ মর্মের পাশাপাশি তা যে ভাষায় নাযিল হয়েছে তথা আরবী ভাষা তাও সংরক্ষণের জন্য বিরল ব্যবস্থা করেছেন। আপনি যদি পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার ইতিহাস অধ্যয়ন করেন তাহলে দেখবেন পৃথিবীর কোনো  ভাষাই স্বরূপে তিন চারশ বছরের বেশি টিকে থাকেনি। এসময়ের মধ্যে হয়তো ভাষাটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে কিংবা অন্য কোনো ভাষার সঙ্গে মিশে গেছে। অথবা এতে এত পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়েছে যে, পূর্বের নিয়ম কানুনে এর পাঠোদ্ধার করা  সুকঠিন। কিন্তু আরবী ভাষা উম্মতে মুহাম্মদীর এমন যতœ ও সেবা লাভ করেছে যা বলে শেষ করার নয়। প্রথমত মহানবী সা. নিজে প্রিয় সাহাবাগনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে আরবী ভাষার বিশুদ্ধতার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। অনন্তর সাহাবাগণ রা. ও এর প্রতি যতœবান হয়েছেন। যেমন- আবুবকর ও উমর রা. এর জীবনী পাঠে জানা যায়। এমনকি হযরত আলী রা.তো আরবী ভাষার ব্যাকরণ তথা নাহু-ছরফ শা¯্ররে উদ্ভাবন করে একে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেন। এরপর উম্মতের এমন একটি শ্রেণীর আত্মপ্রকাশ ঘটে যারা তাদের গোটা জীবনকেই এ ভাষার সংরক্ষণ ও লালনের জন্য ওয়াক্ফ করে দিয়েছেন। যাদের মধ্যে আবুল আসওয়াদ দুওয়াইলী, সিবাওয়াই, খলীল, কিসায়ী, ফাররা, মুবাররাদ, আখফাশ, সালাব, ইবনে হাজার, ইবনে হিশাম, ইবনে আকীল ইবনে জিন্নী রহ. প্রমুখ স্ববিশেষ উল্লেখযোগ্য। আজো অব্যাহত রয়েছে এ ধারা। যার বদৌলতে আজও আরবী ভাষা সেই অবস্থায় টিকে আছে যে অবস্থায় ছিল কুরআন নাযিলের সময়। যতদিন কুরআন থাকবে উম্মতের একদল এ মহান কাজে মশগুল থাকবে ইনশাআল্লাহ।

৪. প্রায়োগিক রুপের সংরক্ষণ
শব্দ, মর্ম ও ভাষার সংরক্ষণের সাথে সাথে কুরআনের প্রায়োগিক রূপ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মহানবী সা. সাহাবাগণকে কুরআনের মর্ম তালিম দেয়ার পাশাপাশি এর বাস্তব প্রয়োগ দেখিয়েছেন। উদাহরণত কুরআনে কারীমে শুধু এতটুক বলা হয়েছে ‘তোমরা সালাত আদায় কর’ কিন্তু কুরআনের কোথাও বিস্তারিত ও ধারাবাহিক-ভাবে নামায আদায়ের পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও কিয়াম, কোথাও রুকু, কোথাও আবার সিজদার কথা উল্লেখ আছে। রাসূলূল্লাহ সা. এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা সাহাবীগণকে বলেছেন এবং বাস্তবে আদায়  করে দেখিয়েছেন আর বলেছেন-  ‘তোমরা নামায আদায় কর সে পদ্ধতিতে যে পদ্ধতিতে আমাকে আদায় করতে দেখেছ। ’ সাহাবাগনও আমৃত্যু নামায আদায় করেছেন তাঁর দেখানো পদ্ধতিতে। তারপর পর্যায়ক্রমে তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী ও প্রতিযুগের মনীষী ও মুসলিম উম্মাহ সেভাবেই নামায আদায় করে আসছে। কিয়ামত পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। এভাবে কুরআনের  বাস্তব প্রায়োগিক রুপটাও সংরক্ষিত হয়ে গেছে। এ জন্যই কেউ যখন কুরআনের তাফসীর ও ব্যাখ্যায় মনগড়া কিছু করার চেষ্টায় লিপ্ত হয় তখন উম্মাহর মাঝে তা গ্রহণযোগ্যতা পায় না। মোটকথা কুরআনের বাস্তব প্রায়োগিক রুপটাও আল্লাহ তাআলা হেফাজত করেছেন ধারাবাহিক আমলের মাধ্যমে।

৫.কুরআন নাযিলের অবস্থা ও প্রেক্ষাপট সংরক্ষণ
পরম সূক্ষèদর্শী আল্লাহ তাআলা তার কিতাবকে আপনরুপে হেফাযতের লক্ষ্যে কুরআন নাযিলের অবস্থা, পরিবেশ ও প্রেক্ষাপটকে হেফাযত করেছেন সুচারুরুপে। হাদীসের সুরক্ষিত বিশাল ভা-ার সেই সম্পূর্ণ অবস্থা, পরিবেশ ও প্রেক্ষাপটকে মূর্ত করে দিয়েছে আমাদের চোখের সামনে। হাদীসের কোনো ছাত্র যখন তা পাঠ করে তখন সেই দৃশ্য জীবন্ত হয়ে সামনে এসে যায়। হাদীসের পাঠকমাত্র জানে এক ধরনের হাদীস আছে যাকে পরিভাষায় “হাদীসে মুসালসাল” বলা হয়; যার অর্থ হলো বর্ণনাকারী সাহাবী মহানবী সা. থেকে যে অবস্থা কিংবা ভঙ্গিতে শুনেছেন বা দেখেছেন বর্ণনা করার সময় সেই অবস্থা ও ভঙ্গির অবতারণা করেছেন। এই ধারা আজো অব্যাহত রয়েছে। একটা দৃষ্টান্ত দেই, একবার মহানবী সা. সর্বনিম্ন জান্নাতির বিবরণ দিতে গিয়ে বললেন, আল্লাহ তাআলা যখন সর্বনিম্ন জান্নাতিকে বলবেন, দশ দুনিয়ার সম-পরিমান জান্নাত তোমাকে দেয়া হলো তখন সে অবাক হয়ে বলবে হে আল্লাহ! আপনি রাব্বুল আলামীন হয়েও আমার সাথে ঠাট্টা করেছেন, একথা বলার পর রাসূল সা. হেসে দিলেন এবং উপস্থিত সাহাবাগণকে বললেন, তোমরা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেনা আমি কেন হাসলাম? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, জী হুজুর! বলুন, আপনি কেন হাসলেন? মহানবী সা. বললেন, এই বান্দার কথা শুনে স্বয়ং আল্লাহও হেসেছেন। তাই আমি হেসে দিয়েছি। [মুসলিম:১/১০৫] এরপর সাহাবায়ে কেরামও এই হাদীসটি বর্ণনার সময় হেসে দিতেন। এই হাদীসটিকে “হাদীসে মুসালসাল বিত-দিহ্ক” বলে। হাদীসের ছাত্র মাত্রই জানে, আজও পর্যন্ত কোনো মুহাদ্দিস যখন এই হাদীসখানা দরস দেন তখন এই ভাবে হেসে দিয়েই দরস দেন। ঠিক একই অবস্থা আসবাবে নুযূল বা শানে নুযূল বলা ও শুনার সময়ও হয়ে থাকে। আসবাবে নুযূল বলা হয় হাদীসে উল্লেখিত সেইসব ঘটনাবলিকে যা কোনো আয়াত, সূরা ইত্যাদি নাযিল হওয়ার সময় সংঘটিত হয়েছিল। এর দ্বারা কুরআনের ভাবার্থ বোঝার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যায়। কেননা আয়াত নাযিল হওয়ার কারণ ও প্রেক্ষাপট জানা থাকলে আলোচিত আয়াতের আহকাম ও তৎপ্রাসঙ্গিক বিষয়াদী বুঝতে সহজ হবে। এর উপর উলামায়ে কেরাম স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন।

৬.সীরাতে নববীর সংরক্ষণ
কুরআনে কারীম অবতীর্ণ হয়েছে মুহাম্মদ সা.এর উপর। আর তিনি কুরআনের উপর বাস্তব আমল করে দেখিয়েছেন যেন পরবর্তীতে কেউ এই কথা বলতে না পারে যে, কুরআন মুতাবিক কিভাবে আমল করব তা আমরা জানিনা। তাই সেই মুতাবিক আমল করা আমাদের জন্য সম্ভব নয়। তাই তো রাসূলুল্লাহর সা. আমলের ব্যাপারে উম্মুল মুমিনীন আয়শা রা. কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা কি কুরআন পড়নি? সাহাবায়ে কিরাম বললেন হ্যাঁ, পড়েছি। আয়েশা রা. বললেন, রাসূল সা. ছিলেন কুরআনুল কারীমের জীবন্ত নমুনা। ’  তাই কুরআনুল কারীম রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজন ছিল রাসূলুল্লাহর সা. -এর সীরাতে তাইয়্যিবার যথাযথ সংরক্ষ। কুদরতের কারিশমায় তা সংরক্ষিত হয়েছে যথাযথভাবে। তাঁর সীরাতের উপর এত বিপুল পরিমানে কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে যে, দুনিয়ার কোনো ব্যক্তিত্বের উপর এত পরিমানে কাজ হয়নি।

৭.হায়াতে সাহাবা সংরক্ষিত
কুদরতের এটা একটা বিরাট কারিশমা যে, কুরআন অবতরণকালে তার প্রথম সম্বোধিত এবং প্রথম ধারক যারা ছিলেন তাদের জীবনচরিতও যথাযথভাবে সংরক্ষিত। কুরআনের প্রথম মুখাতাব ও ধারক ছিলেন সাহাবাদের রা. সুমহান জামাত। তাঁরা ছিলেন কুরআন ও সুন্নার বাস্তব আমলীরুপ। কুরআন ও সুন্নাহর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলোও বাস্তবায়নে নিজের জীবনকে অবলীলায় বিলিয়ে দিতে কেউ কোনো কার্পণ্য করেননি। তাই কুরআন ও সুন্নাহর বাস্তব আমলীরুপ হেফাযতের জন্য প্রয়োজন ছিল এ দুটোর বাহকদের জীবনচরিত হেফাযত করা। যেন উম্মাহ জানতে পারে কুরআন ও সুন্নাহর আমলীরুপ কি? আরও জানতে পারে এ দুটোর সম্মিলিত রুপায়ন কিভাবে হবে? করুণাময় তার অপার করুণায় সে ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ফলে উম্মত সে সময় থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত তাদের পদাংক অনুসরণ করে উপকৃত হচ্ছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত উপকৃত হতে থাকবে। তাদের জীবনী হেফাযত করা না হলে কুরআনের আলমীরুপ বিকৃত হওয়ার প্রবল সম্ভবনা ছিল। যেমনটি হয়েছে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবগুলোর ক্ষেত্রে। শুধু তাই নয়, আরও অবাক করা ব্যাপার হলো, তৎপরবর্তী কুরআন-হাদীসের লক্ষ লক্ষ বাহক তথা তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীন, আয়েম্মা, মুজতাহেদীনের জীবনচরিতও সুসংরক্ষিত। যেন কুরআন-সুন্নাহর বাস্তব আমলীরুপ সনদে মুতাওয়াতির তথা অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকে। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, তাদের জীবনীর সংরক্ষণটাও হয়েছে বিরলভাবে। তাদের জীবনী অনুমান নির্ভর কোনো তথ্য সম্বলিত নয়; বরং পূর্ণ প্রমাণ্যের সঙ্গে বিস্তারিতভাবে তিনি কে ছিলেন, তার বংশ পর¤পরা কি? তার ইলম ও প্রজ্ঞা কোনো পর্যায়ের ছিল, তার স্মৃতিশক্তি ও মেধা কেমন ছিল, তিনি কার কার নিকট থেকে ইলম হাসিল করেছেন এবং তার তাকওয়া-পরহেযগারী ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য কেমন ছিল ইত্যাকার সকল বিষয় তাতে স্থান পেয়েছে। একে পরিভাষায় “রিজাল শাস্ত্র” নামে অভিহিত করা হয়। আল কুরআন সংরক্ষণের লক্ষ্যে এইভাবে বিরল কায়দায় মহান স্রষ্টা লক্ষ লক্ষ মহা মানবের পূর্ণাঙ্গ বায়োডাটা হেফাযত করেছেন। এমনকি হাল যামানার কুরআন-হাদীসের বিজ্ঞজনদের জীবনবৃত্তান্ত যথাযথভাবে সংরক্ষিত রয়েছে এবং এই ধারা কুরআন যতদিন থাকবে ততদিন অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। মূলত রিজাল শাস্ত্র এমন শাস্ত্র যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোনো জাতির মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় না। সার কথা কুরআন রক্ষার আসমানী ওয়াদা আল্লাহ পুরো করেছেন। কুরআন হেফাযতের জন্য যত উপায় হতে পারে সকল উপায়ে তা সংরক্ষণ করেছেন। এভাবে এই পবিত্র কিতাব সর্বদিক দিয়ে পূর্ণাঙ্গরুপে সুসংরক্ষিত হয়ে গেছে। ফলে আজ দেড় হাজার বছর পরেও আল কুরআন স্বরুপে আপন বিভায় দেদীপ্যমান। বিন্দু পরিমান পরিবর্তনের পরিবর্ধনের আঁচড় লাগেনি লাখো চেষ্টা ও অপচেষ্টার পরও। কিয়ামত পর্যন্ত লাগবেও না ইনশাআল্লাহ।

লেখক: মুহাদ্দিস জামিয়া মিফতাহুল উলুম মাদরাসা

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ আল কুরআন সংরক্ষণে স্রষ্টার আলৌকিক ব্যবস্থা : মুফতী পিয়ার মাহমুদ

  1. Masud says:

    খুবই উপকারী লেখা। সবাই পড়ার আহ্বান করছি। এবং পত্রিকার বহুল প্রচার কামনা করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight