আল-কুরআনে সাহাবীদের যত জিজ্ঞাসা : হালাল বস্তুনিচয়-সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা / মাওলানা মুজিবুর রহমান

[জুন সংখ্যার পর]
পালক পুত্র বধু
নিজ পুত্রবধূ হারাম। এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নাই। তদ্রƒপ পালকপুত্রবধূ হালাল এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নাই। কারণ, আল্লাহ তাআলা পালকপুত্রকে নিজ পুত্রের মতো মর্যাদা প্রদান করেননি।
এরশাদ হচ্ছে, আল্লাহ তোমাদের মুখে-ডাকা পুত্রকে ঔরসজাত পুত্র বানিয়ে দেননি। [সূরা আহযাব : আয়াত ৪]
বিভিন্ন সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদ বিন হারেসাকে পালকপুত্র বানিয়েছিলেন। হযরত ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত বুখারী ও মুসলিমের হাদীস থেকে জানা যায় যে, তখন যায়েদকে যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ বলে ডাকা হত। উপরোক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর আর সেভাবে ডাকা হয়নি। বিভিন্ন হাদীস এবং তাফসীরগ্রন্থ হতে জানা যায় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশেই যায়েদ বিন হারেসার সঙ্গে যয়নাব রা.-এর বিবাহ সম্পন্ন হয়। শেষ পর্যন্ত তাদের মাঝে বনিবনা না হওয়ায় সংসার ভেঙ্গে যায়। যায়েদ যয়নাবকে তালাক প্রদান করেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলার নির্দেশে যয়নাবকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ করেন। আল্লাহ বলেন, অতঃপর যায়েদ যখন যয়নাবের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম। যাতে মুমিনদের পোষ্য পুত্ররা তাদের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। [সূরা আহযাব: আয়াত ৩৭] এতে প্রমাণিত হল পালকপুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ করা জায়েয।

স্ত্রীর পূর্ব বংশীয় কন্যা
স্ত্রীর পূর্ববংশীয় কন্যা হালাল বা হারাম হওয়ার মূল ইল্লত হল স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস। এটাই সমস্ত ফিকহবিদ আলেম-উলামার অভিমত। তাই সহবাস যেভাবেই ঘটুক হারাম হবেই। তাই ফকীহগণের সিদ্ধান্ত হল, কোনো নারীর সঙ্গে কোন পুরুষের সহবাস হয়ে থাকলে ঐ নারীর কন্যা ঐ পুরুষের জন্য চিরতরে হারাম। লালিত-পালিত কন্যার ব্যাপারেও অনুরূপ বিধানই প্রযোজ্য। যদি লালিত-পালিক কন্যার মায়ের সঙ্গে সহবাস হয়ে থাকে তাহলে লালিত-পালিত কন্যা সহবাসকারীর জন্য চিরতরে হারাম। পক্ষান্তরে যদি মায়ের সঙ্গে সহবাস না হয়ে থাকে তাহলে লালিত-পালিত কন্যা বিবাহ করতে কোন অসুবিধা নাই।
হযরত উমর রা., হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, বিবাহের দরুন সহবাসের কারণে যা তাহরীম (নিষিদ্ধ) হয় তাও চিরদিনের জন্য।

সৎ মা
আল্লাহর বাণী, যেসব নারীকে তোমাদের পিতা-পিতামহ বিবাহ করেছেন, তোমরা তাদেরকে বিবাহ করো না। [সূরা নিসা : আয়াত ২২]
এখানে পিতার বিবাহিত স্ত্রী বলতে সৎ মাকে বোঝানো হয়েছে। জাহেলী যুগে পিতার মৃত্যুর পর পুত্রদের সৎ মাকে বিবাহ করার রীতি প্রচলিত ছিল। আয়াতে এহেন ঘৃণ্য নিকৃষ্ট কাজটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন যাকে মা বলে সম্বোধন করা হয়েছে, অতঃপর তাকেই বিবাহ করে স্ত্রীত্বে বরণ করা যে কত বড় জঘন্য কাজ ও চারিত্রিক অধঃপতন তা বলাই বাহুল্য। আল্লাহ এহেন কাজকে ক্রোধ উদ্বেগকারী অত্যন্ত খারাপ পথ বলে অভিহিত করেছেন। আল্লাহ বলেছেন, এমন কাজে আল্লাহর ক্রোধ জাগে, মুসলিম জনগণ অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে। এহেন কাজ হারাম, অত্যন্ত জঘন্য এবং ঘৃণ্য। এটা তো কেবল যৌন লালসা চরিতার্থ করার অত্যন্ত খারাপ পথ। এর পরিণাম জাহান্নাম।
হযরত বারা ইবনে আযেব রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বুরদা ইবনে নাযার রা.-কে এক ব্যক্তির নিকট পাঠিয়েছিলেন, যে তার পিতার স্ত্রীকে বিবাহ করেছিল। অন্য বর্ণনায় এসেছে, আবু বুরদাকে সেই লোকটিকে হত্যা করে তার ধন-সম্পদ নিয়ে আসার জন্য পাঠিয়েছিলেন। জাহেলী যুগে পিতার স্ত্রীকে বিবাহ করা ব্যাপক পরিচিত অতি সাধারণ ব্যাপার ছিলমাত্র। ইসলাম এ ধরনের ঘৃণ্য জাহেলী রেওয়াজকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কাউকে বিন্দুমাত্র অবকাশ দেননি। আর আল্লাহ তাআলা ‘ইল্লা মা ক্বাদ সালাফ’ বলে জাহেলী যুগের সে প্রথাকে স্বতন্ত্র পর্যায়ের ঘোষণা করেছেন। তাই একে ভিত্তি করে এ ধরনের কাজ করার কোন অবকাশ আর নাই।

দু বোনকে এক সঙ্গে বিবাহ করা
এটিও জাহেলী যুগের একটি নিকৃষ্ট প্রথা। ইসলাম একেও কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করেছে। এরশাদ হচ্ছে, “দুই বোনকে স্ত্রীত্বে একত্র করা হারাম।” [সুরা নিসা : আয়াত ২৩] তবে আগে যা হয়েছে তা ভিন্ন কথা। আবু বকর জাসসাস রহ. বলেছেন, আয়াতের দাবী হল যে কোন দিক দিয়ে বোন হোক, দুই বোনকে একত্রে একজন পুরুষের স্ত্রীত্বে একত্রিত করা হারাম।
একত্রিত করার একাধিক পদ্ধতি হতে পারে।
* একসঙ্গে দুজনের উপরই আকদ করা হবে।
* প্রথমে একজনকে বিবাহ করবে, পরে অপরজনকে বিবাহ করবে। অবশ্য একজন মরে যাওয়ার পর অপর জনকে বিবাহ করতে কোন অসুবিধা নেই। কোন অবস্থাতেই দুজনকে একত্রে নয়।
* দাসত্বে মালিকানার ভিত্তিতে সহবাসে দু বোনকে একত্র করা। এ ব্যাপারে আগের কালের ফিকহবিদগণের মাঝে মতদ্বৈততা ছিল। পরে সে মতদ্বৈততা দূর হয়ে গেছে এবং দাসত্বে মালিকানার ভিত্তিতেও দু বোনকে একত্রীকরণ হারাম হওয়ার ব্যাপারে ইজমা সংঘটিত হয়েছে।

দুধ পান সম্পর্কের দিক দিয়ে হারাম
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, বংশগত সম্পর্কের দিক থেকে যারা (যাদের বিবাহ করা) হারাম, দুধপানেও তারা হারাম। আল্লাহ বংশগত কারণে যা হারাম করেছেন, দুধ পানের কারণেও তা হারাম করেছেন। ফিকহবিদগণের পরিভাষায় এ ধরনের হুরমতকে, ‘হুরমতে রেজায়াত’ বলা হয়। যতটুকু পরিমাণ দুধ পান করলে হারাম প্রমাণিত হবে তা নিয়ে আগের কালের এবং পরবর্তী কালের ফিকহবিদগণের মাঝে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়।
হযরত উমর, আলী, আব্বাস, ইবনে উমর রা. এবং আল হাসান, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, তাউস, ইবরাহীম জুহরী, শাবী প্রমুখ আলেম বলেন, পান করা দুধের পরিমাণ কম হোক বা বেশি হোক দুধ পানের দুই বছর মেয়াদকালে পান করা হলে তাতে তাহরীম (হারাম) প্রমাণিত হবে। ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ, জুফার, মালিক, সাওরী, আওযায়ী প্রমুখ ফিকহবিদও অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। সমস্ত মুসলমান এ ব্যাপারে একমত যে, দুধ অল্প হোক বা বেশি হোক পান করা হলে তাতে মা এবং বোন প্রমাণিত হবে এবং তারা হারাম হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এ দুধ পানটা ক্ষুধার দরুন হতে হবে। তবে অল্প পরিমাণ এবং বেশি পরিমাণের মধ্যে কোন পার্থক্য করা হয়নি। সুতরাং একবার পান করলেই তাহরীম প্রমাণিত হবে।
ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, বিচ্ছিন্নভাবে পাঁচবার দুধ পান না করলে কেউ হারাম হবে না। একবার কি দুই বার দুধ পান করলে কেউ হারাম হয় না। হারাম হওয়ার জন্য অন্তত পাঁচ বার দুধপান হওয়া দরকার। দলীর হিসেবে তারা হযরত আয়েশা ইবনুয যুবায়ের ও উম্মুল ফযল রা. থেকে বর্ণিত হাদীস পেশ করেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একবার চোষণ হারাম করে না, আর দুই বার চোষণও হারাম করে না। হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, কুরআনে প্রথমে দশবার জানাশোনাভাবে দুধ পানের কথা বলা হয়েছিল। পরে তা মানসুখ হয়ে যায়। তদস্থলে জানাশোনা পাঁচবারের কথা এসেছে। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করা পর্যন্ত তাই পড়া হচ্ছিল। আবুল হাসান আল কারখী বর্ণনা করেছেন, হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি দুধ পান সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়েছিলেন। তখন আমি বললাম, লোকেরা তো বলে একবার দুধ পান করলে তা কিছু হারাম করে না। দুই বার করলেও না। তিনি বললেন হ্যাঁ, আগে তাই ছিল। কিন্তু আজকের দিনে একবার দুধ পানই হারাম করে দেয়। দুধ পান সম্পর্কিত ব্যাপারে ফিকহবিদগণ দুধের পরিমাণ, মেয়াদ, পানকারীর বয়স প্রভৃতি নিয়েও মতভেদ করেছেন। ফিকহের কিতাবসমূহে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
মুহাররামাত নারীদের বর্ণনার পর আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, “উল্লিখিত নারীগণ ব্যতীত অন্য নারীকে অর্থব্যয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করতে চাওয়া তোমাদের জন্য বৈধ করা হলো, অবৈধ যৌন সম্পর্কের জন্য নয়।” [সূরা নিসা : আয়াত ২৪]
আবু বকর আল জাসসাস বলেছেন, নিষিদ্ধ নারীদের বাইরে যাদেরকে আল্লাহ হালাল করেছেন, তাদেরকে সম্পদ তথা মহরের বিনিময়ে পেতে হবে। আয়াতের বাহ্যিক দাবী অনুযায়ী মহর অবশ্যই সম্পদ হতে হবে। মহরের পরিমাণ নিয়ে ফিকবিদগণের মাঝে মতভেদ থাকলেও সর্বনি¤œ পরিমাণ সম্পর্কে হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত হাদিসকে দলিল মানা হয়। অর্থাৎ, দশ দিরহামের কম পরিমাণ মহর হয় না। এতেই অধিকাংশ ইমাম ঐকমত্য পোষণ করেছেন। ফিকহের কিতাবসমূহে এতদ সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ বলেন, “তোমাদের মধ্যে কারো স্বাধীন ঈমানদার নারী বিবাহের সামর্থ্য না থাকলে তোমরা তোমাদের অধিকারভুক্ত ঈমানদার দাসী বিবাহ করবে; আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে পরিজ্ঞাত।” [সূরা নিসা : আয়াত ২৫]
আবু বকর আল জাসসাস বলেছেন, আয়াতের তাৎপর্য হলো, স্বাধীনা বংশজ্ঞাত সংরক্ষিতা মুসলিম নারী বিবাহ করতে অসমর্থ হলে ঈমানদার ক্রীতদাসী বিবাহ করবে। এটাই আয়াতের বাহ্যিক দাবী। এতে বোঝা গেল যতটা সম্ভব স্বাধীন নারীকেই বিবাহ করা উচিত। ক্রীতদাসীকে বিবাহ না করাই উত্তম। অগত্যা যদি ক্রীতদাসী বিবাহ করতেই হয়, তাহলে অবশ্যই ঈমানদার দাসী খোঁজ করতে হবে।
দাসী বিবাহ জায়েয হওয়ার ব্যাপারে পূর্বকালের ফিকহবিদগণ বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। ইবনে আব্বাস, জারির, সাঈদ ইবনে যুবায়ের, শাবী ও মাকহুল থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেছেন, দাসী বিবাহ করা যাবে না। যাবে কেবল তখন, যদি স্বাধীনা নারী বিবাহ করতে অসমর্থ হয়। হযরত আলী, আবু জাফর, মুজাহিদ, সাঈদ ইবনে যুবায়ের, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব-এর একটি বর্ণনা এবং ইবরাহীম আল হাসান জুহরীর বর্ণনা – এঁরা বলেছেন, পুরুষ ক্রীতদাসী বিবাহ করতে পারে যদিও সে সচ্ছল হয়। আতা রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন স্বাধীনা মেয়ে স্ত্রী থাকলে তার উপর দাসী বিবাহ করা যাবে না। দাসী বিবাহ জায়েয হলেও তার সংখ্যা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, একজন দাসীর অধিক বিবাহ করা জায়েয নয়। ইবরাহীম, মুজাহিদ, ও জুহরী বলেছেন, চারজন দাসী বিবাহ করা জায়েয হবে যদি সে ইচ্ছা করে।
হানাফী ফিকহবিদগণ এবং সাওরী, আওযায়ী, শাফেয়ী রহ. বলেছেন, একজন স্বাধীনা স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও দাসী বিবাহ করা জায়েয হবে না। উসমান আল বত্তী বলেছেন, কোন ব্যক্তি যদি স্বাধীনা স্ত্রীর উপর দাসী বিবাহ করে, এতে কোন দোষ নেই। আর আতা, জারির ইবনে যায়দ ও ইবরাহীম হতে বর্ণিত, তাঁরা বলেছেন, পছন্দ হলে দাসী বিবাহ করা সম্পূর্ণ জায়েয, যদিও সে সচ্ছল অবস্থার লোক হয়। তাই মূলনীতিবিশারদগণ বলেছেন, আয়াতটিতে কারো জন্য স্বাধীনা বংশজ্ঞাত মুসলিম নারীকে বিবাহ করার সামর্থ্য থাকলে যে তার পক্ষে ক্রীতদাসী বিবাহ করা জায়েয হবে না এমন কোন ইঙ্গিত নেই।
অতঃপর আল্লাহর নির্দেশ হল, “তোমরা তাদেরকে বিবাহ কর, তাদের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে। আর নিয়মানুসারে তাদেরকে মহর প্রদান কর।” [সূরা নিসা : আয়াত ২৫]
উল্লিখিত আয়াতাংশের দাবী হচ্ছে, দাসীকে তার মনিবের অনুমতিক্রমেই বিবাহ করতে হবে। বিনা অনুমতিতে বিবাহ করলে সে বিবাহ বাতিল হয়ে যাবে। এটাই আয়াতের বাহ্যিক তাৎপর্য। সুতরাং বোঝা গেল, দাসীর বিবাহ জায়েয হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে মনিবের অনুমিত। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, দাস যদি তার মনিবের অনুমতি না নিয়ে বিবাহ করে তাহলে সে যিনাকার। আল্লাহর কথা, ‘তাদেরকে তাদের প্রাপ্য মহরানা দিয়ে দাও’ – এর বাহ্যিক দাবী হচ্ছে মহরানা স্ত্রীর নিকট হস্তান্তর করা যা ওয়াজিব। কিন্তু দাসীর ক্ষেত্রে মহরানা মনিবের প্রাপ্য। দাসী নিজে নয়। কেননা, মনিবই হচ্ছে তার মালিক। তার সঙ্গে সহবাস করার নিরঙ্কুশ অধিকারী। সে তার দাসীকে অন্য জনের নিকট বিবাহ দিয়ে তার সাথে সহবাস করার অধিকার প্রদান করেছে। তাই নিজের অধিকার অন্যকে দিয়ে দেয়ার বদলাস্বরূপ মহরানা তারই প্রাপ্য। এটাই ফিকহবিদ আলেমগণের সর্বসম্মত অভিমত।
পরিশেষে আল্লাহ তাআলা বিবাহের মৌলিক উদ্দেশ্য পর্যায়ে অত্যাবশ্যক কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে নারী ও পুরুষ উভয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বলেছেন, (পুরুষ) মুহসিন তথা সংরক্ষণশীলতায় এবং নৈতিক চারিত্রিকতার পবিত্র পরিশুদ্ধ এবং উত্তম হবে; অবৈধভাবে যৌন লালসা চরিতার্থকারী হবে না। আর নারীদের বেলায় বলা হয়েছে, তারাও মুহসিনা তথা চারিত্রিক পরিশুদ্ধতা নৈতিক পবিত্রতা এবং সতীত্বসম্পন্না হবে। ব্যভিচারিণী কিংবা গোপন অভিসারিণী নয়। এসব চারিত্রিক ইতিবাচক গুণ-বৈশিষ্ট্য নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই সমানভাবে অত্যাবশ্যক। চারিত্রিক এসব গুণ-বৈশিষ্ট্যে নারী-পুরুষ উভয়কেই ভূষিত হতে হবে এটাই আল্লাহর অভিপ্রায়। নিজে সংরক্ষিত থেকে সংরক্ষণশীলতার জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে। অবৈধ যৌনলালসা চরিতার্থ করা যাবে না। আর যাদেরকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা হবে তারাও পবিত্র, উত্তম, নৈতিক চরিত্র ও সতীত্বসম্পন্না হবে। এমন মেয়েদেরকেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে আল্লাহ নির্দেশ প্রদান করেছেন। আয়াতে ব্যবহৃত ‘মুহসিনিনা’ শব্দটির বহুবিধ তাৎপর্যের মধ্যে এ-ও শামিল রয়েছে যে, সহীহ-শুদ্ধ বিবাহের মাধ্যমে  সহবাস করা। এ অর্থে উপরিউক্ত বক্তব্য যে আয়াতের মূল তাৎপর্যের খুব নিকটবর্তী তা অতি সহজেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বস্তুত বিবাহ তো কেবল চারিত্রিক পরিশুদ্ধাত, নৈতিক পবিত্রতা সংরক্ষণের নিমিত্তেই হয়ে থাকে। একথা সর্বজনস্বীকৃত। বিবাহের মৌলিক উদ্দেশ্যও তো তাই। আর তা কেবল সহীহ-শুদ্ধ বিবাহ দ্বারাই অর্জিত হয়ে থাকে। এ জন্যই আয়াতে ‘গায়রা মুসাফিহিনা’ এবং ‘গায়রা মুসাফিহাত’ (যিনাকার এবং যিনাকারিণী নয়) কথাটি অতি স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে এবং তা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আল-কুরআনে যিনাহকে সিফাহ, যিনাকারকে মুসাফিহ এবং যিনাকারিণীকে মুসাফিহাত বলা হয়েছে। যিনা বিবাহ-সংক্রান্ত যাবতীয় নিয়মকানুনের পরিপন্থি। এতে না বংশ ধারা প্রমাণিত হয়, আর না মহরানা ওয়াজিব হয়। আর এতে নারী, না পুরুষের শয্যা পেল আর না তার উপর ইদ্দত পালন ওয়াজিব হল। হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, লোকদের মধ্যে অনেকেই বাহ্যত যা যিনা তাকে হারামই মনে করে। কিন্তু গোপনে তা করা হলে তাকে হালাল মনে করে। আয়াতে ‘আখদান’ শব্দটি ‘আল-খিদনু’ হতে উদ্ভূত। অর্থ, মেয়ে লোকের বন্ধু। যে তার সঙ্গে গোপনেও যিনায় লিপ্ত হয়। আল্লাহ এ প্রকাশ্য এবং গোপনীয় উভয় প্রকারের নির্লজ্জতার কাজকে সম্পূর্ণ হারাম করে দিয়েছেন। সহীহ-শুদ্ধ বিবাহ ব্যতীত অন্য কোন উপায়ে নারীগমন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।

আহলে কিতাব নারীদের বিবাহ
আহলে কিতাব – এটি কোন জাতির সত্তাগত পরিচিতি নয়। বিশেষণমূলক পরিচিতি। কিতাবের অনুসারীরাই আহলে কিতাব, বাহ্যিক অর্থে তাই বোঝা যায়। আর কিতাব বলতে আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণ কিতাব উদ্দেশ্য। নির্দিষ্ট করে বললে বলতে হয়, তাওরাত, ইঞ্জিল কিতাব। এদের অনুসারীরাই আহলে কিতাব। তাওরাত হযরত মুসা আ.-এর উপর অবতীর্ণ হয়। এর অনুসারীরা ইহুদী নামে পরিচিত। বস্তুত এরা আল কুরআনে বর্ণিত, বনী ইসরাঈল সম্প্রদায়ের বৃহত্তম একটি শাখা। হযরত ইয়াকুব আ.-এর বড় পুত্র ইয়াহুদার নামানুসারে এদেরকে ইহুদী বলা হয়।
ইঞ্জিল হযরত ঈসা আ.-এর উপর অবতীর্ণ হয়। এর অনুসারীরা নাসারা নামে সর্বাধিক পরিচিত। এরাও মূলত বনী ইসরাঈলের একটি শাখা। হযরত ঈসা আ.-এর আহ্বান করেছিলেন, আল্লাহর রাহে কে আমার সাহায্যকারী? তাঁর এ আহবানে সাড়া দিয়ে তারা বলল, আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। এজন্যই তাদেরকে নাসারা বলা হয়। বর্তমানে এরা সমগ্র বিশ্বে খ্রিস্টান নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে উভয় সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব পরিচিতির পরিবর্তে একসঙ্গে বিশেষণমূলক পরিচিতি আহলে কিতাব বলে আল-কুরআনে সম্বোধিত হয়েছে।
আহলে কিতাব নারীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “তোমাদের পূর্ববর্তী আহলে কিতাবদের সতী সাধ্বী নারীরাও তোমাদের জন্য হালাল।” [সূরা মায়েদা : আয়াত ৫]
আহলে কিতাব নারীরা মুসলমানদের জন্য হালাল হওয়ার অন্যতম কারণ হল, তাদের ধর্মমতে বিবাহ ইসলাম ধর্মের অনুরূপ। ইসলাম ধর্মে যেসব নারী হারাম, তাদের ধর্মেও সেসব নারী হারাম। ইসলাম ধর্মে যেমন বিবাহের ঘোষণা তার সাক্ষীদের উপস্থিতিতে হওয়া জরুরি, তেমনি তাদের ধর্মেও এসব বিধান জরুরি। তাফসীরে মাযহারীতে বলা হয়েছে, আহলে কিতাবদের পশু জবাই এবং তাদের নারী বিবাহ উভয়টি এক পর্যায়ের নয়। পার্থক্য হল, জবাইয়ের বৈধতা উভয় পক্ষের জন্যই প্রমাণিত। কিন্তু বিবাহ ব্যতিক্রম। এক্ষেত্রে আহলে কিতাব নারী মুসলমানদের জন্য হালাল হলেও মুসলমান নারী আহলে কিতাব পুরুষদের জন্য হালাল নয়।
আহলে কিতাব নারীকে বিবাহ করার প্রশ্নে পূর্ববর্তীকালের ফিকহবিদ মনীষীগণ দ্বিবিধ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
কিতাবী নারী বিবাহ করা মুসলমানদের জন্য হারাম। হযরত ইবনে উমর রা. এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাঁকে ইহুদী অথবা নাসারা নারী বিবাহ কারার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, আল্লাহ মুশরিক নারীদের মুসলমানদের জন্য হারাম ঘোষণা করেছেন। ‘ঈসা (যিশু) অথবা আল্লাহর কোন বান্দা আমার রব’ – কোন নারীর এমন কথার চেয়ে বড় শিরক কী হতে পারে তা আমি জানি না। তাঁর মতে কিতাবীরাও মুশরিক। তাই তাদেরকে বিবাহ করা মুসলমানদের জন্য হালাল নয়। আল্লাহ বলেছেন, “মুশরিক মেয়েরা ঈমান গ্রহণ না করলে তোমরা তাদেরকে বিবাহ করো না।” [সূরা বাকারা : আয়াত ২২০] ইসামিয়া এবং যায়দিয়া সম্প্রদায়ের আলেমগণও অনুরূপ কথাই বলেছেন।
তবে আল হাসান, মুজাহিদ, সাঈদ ইবনে আবদুল আজীজ ও আবু বকর ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবু মারিয়া থেকে আহলে কিতাব নারী বিবাহ করা মাকরুহ হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। সাওরী সেই মত দিয়েছেন।
আহলে কিতাব নারীকে বিবাহ করা মুসলমানদের জন্য জায়েয। আল্লাহর বাণী, আহলে কিতাবদের সতী সাধ্বী রমণী তোমাদের জন্য হালাল। এটাই জমহুর উলামায়ে কেরামের অভিমত। বিখ্যাত চার ইমামও এটাই সমর্থন করেছেন। দলীল হিসেবে তাঁরা হাম্মাদ সূত্রে বর্ণিত হাদিস উল্লেখ করেছন। তিনি বলেন, আমি ইবরাহীম নাখঈকে ইহুদী নাসারা নারী বিবাহ করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। জবাবে তিনি বলেছেন, না তাতে কোন অসুবিধা নাই। আমি বললাম, আল্লাহ তো বলেছেন, তোমরা মুশরিকদেরকে বিবাহ করো না। তিনি বললেন, এই বিধান মূর্তিপূজারী এবং অগ্নি উপাসকদের ব্যাপারে। আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় হযরত কাতাদাহ রহ. বলেছেন, এরা হল আরব মুশরিকগণ যাদের জন্য তেলাওয়াত করার মত কোন কিতাব নাই।
বর্ণিত আছে, হযরত হুযাইফা রা. একজন ইহুদী নারীকে বিবাহ করেছিলেন। তখন হযরত উমর রা. তাকে লিখে পাঠালেন যে, তুমি তাকে ছেড়ে দাও। জবাবে হুযাইফা রা. লিখলেন, আপনি কি তাকে আমার জন্য হারাম মনে করেন, এই জন্য তাকে ছেড়ে দেব? তখন উমর রা. বললেন, না আমি তা মনে করিনি। তবে আশংকা করি, এরূপ করতে থাকলে মানুষ এক সময় তাদের পতিতাদেরকেও গ্রহণ করতে শুরু করবে। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, কিতাবী নারী বিবাহ করা হারাম নয়। অবশ্য হযরত উমর রা., হযরত হুযাইফা রা. এবং হযরত তালহা রা.-এর কিতাবী নারী বিবাহে অসম্মতি জ্ঞাপন ছিল সতর্কতা এবং বৃহত্তর স্বার্থের খাতিরে। এভাবে কিতাবী নারী বিবাহ মুসলমানদের মাঝে বাড়তে থাকলে একসময় এরূপ বিবাহকে হয়ত আভিজাত্য মনে করা হতে পারে। তখন হয়ত সকলেই ওইমুখী হয়ে মুসলিম নারী-বিমুখ হয়ে যেতে পারে। এতে মুসলিম নারীগণ বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। কিতাবী নারী বিবাহ করা হারাম, এই অর্থে নয়।
আহলে কিতাব নারীদের বিবাহের অনুমতি দেয়ার প্রধান উদ্দেশ্য হল স্বীয় হৃদয়ে আল্লাহর ভীরুতা এবং সততা জাগিয়ে তোলা। এমন যেন না হয় কিতাবী স্ত্রীতে মজে গিয়ে নিজের ঈমান বিসর্জন দিয়ে দুনিয়া আখিরাত উভয় জাহান বরবাদ করে ফেলে। কাফির নারীকে বিবাহ করার মাঝে যেহেতু বিপদ এবং ক্ষতির সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে, তাই আল্লাহ তাদেরকে বিবাহ করতে নিষেধ করেছেন। ঈমান না আনা পর্যন্ত কোন মুশরিক নারীকে বিবাহ করা যাবে না। শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ. বলেছেন, আহলে কিতাবদেরকে অন্যান্য কাফির হতে দুটি কারণে বা বিধানে স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। এক জবাই করা, দুই কিতাবী নারী বিবাহ করা। আর উভয়টি পার্থিব জীবনেই সীমাবদ্ধ।
একথা স্মরণ রাখা একান্ত আবশ্যক যে, কোন বস্তু / বিষয় হালাল হওয়ার অর্থ হল, তার মধ্যে কোন অবৈধ কিছু না থাকা। কিন্তু পারিপার্শি¦ক অবস্থা যদি এমন না হয় যে, সে হালাল বিষয়ে লিপ্ত হলে অনেকগুলো হারাম কিংবা কুফুরীতে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় তাহলে এমন হালাল ভিষয়েকে লিপ্ত হওয়ার অনুমতি নাই।
বর্তমান কালের ইহুদী-খ্রিস্টানগণ কেবল নামেই ইহুদী-খিস্টান। তাদের না আছে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান, আর না আছে কিতাবের প্রতি ঈমান। বস্তুত এখন আর তারা আসমানী কিতাবের অনুসারী নয়। আজ তারা নিজেদেরকে মুসলমানদের জন্য সবচে বড় শত্রু হিসেবে আবির্ভূত করেছে। তাই তাদের সঙ্গে বিবাহ, ঘর-সংসার, উঠা-বসা এবং তাদের নারীদের ফাঁদে পা দেয়া, ইত্যাকার বিষয়গুলো যে কত ভয়ঙ্কর বিপদজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে তা কারো নিকট অস্পষ্ট থাকার কথা নয়। কাজেই ইহুদী-খ্রিস্টানদের সম্পর্কে নতুন করে ভাবনার এখনই উপযুক্ত সময়।

চতুষ্পদ জন্তু
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “সব চতুষ্পদ জন্তু তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে।” [সূরা মায়েদা: আয়াত ১]
মুফাসসীরগণ বলেছেন, ‘আনআম’ বলতে উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, বুনো গাভী এবং হরিণ এই আট প্রকার প্রাণীকে বোঝানো হয়েছে। এই আট প্রকার প্রাণী তোমাদের জন্য হালাল। এগুলো ইসলামী শরীয়তের বিধান মতে জবাই করে খেতে হবে। এসব জীব-জন্তুর গোশত শারীরিক বা আধ্যাত্মিক কোন দিক দিয়েই ক্ষতিকর নয়। সেজন্যই এগুলো খাওয়া হালাল।
আল কুরআনে এ সমস্ত জীব-জন্তুকে ‘বাহিমা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ‘বাহিমা’ শব্দের অর্থ অস্পষ্ট। কেননা, তাদের ভাষা মানুষের নিকট অস্পষ্ট। ইমাম শাবানী বলেন, এসব জীব-জন্তুকে ‘বাহিমা’ বলা কারণ এটা নয় যে, তাদের জ্ঞান বুদ্ধি নাই। যা সাধারণ মানুষজন ধারণা করে থাকে। বরং প্রকৃত সত্য হল কোন প্রাণীই বুদ্ধি ও অনুভূতিহীন নয়। এমনকি বৃক্ষ ও প্রস্তর অনুভূতিহীন নয়। তবে তাদের মানুষের মতো জ্ঞান-বুদ্ধি নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight