আল-কুরআনে সাহাবীদের যত জিজ্ঞাসা : হালাল বস্তুনিচয় সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা / মাওলানা মুজিবুর রহমান

সাহাবায়ে কেরামগণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা ছিল হালাল বস্তুসামগ্রী সংক্রান্ত ব্যাপারে। এরশাদ হচ্ছে, ‘তারা আপনাকে জিজ্ঞাসা করে কী কী বস্তু তাদের জন্য হালাল।’ [সূরা মায়েদা : আয়াত ৪]
উল্লিখিত জিজ্ঞাসার জবাব আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে খুব তাৎপর্যপূর্ণভাবেই প্রদান করেছেন। সুবিস্তৃত সেই জবাবে যাবার পূর্বে এমন জিজ্ঞাসার প্রেক্ষাপট যৌক্তিকতা সম্পর্কে যৎকিঞ্চিত আলোচনা আবশ্যক বলে মনে করছি। তাফসীর এবং শানে নুযূল-সংক্রান্ত গ্রন্থাবলি হতে জানা যায় যে, জিজ্ঞাসাকারী সাহাবীগণ ছিলেন, আদী ইবনে হাতেম এবং জায়েদ ইবনে মুহালহাল আত-তায়ী রা.। উল্লিখিত জিজ্ঞাসার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ইবনে কাসির বর্ণনা করেন, হযরত আদী ইবনে হাতেম এবং হযরত জায়েদ ইবনে মুহালহাল একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আরয করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তো হারাম খাদ্য সম্পর্কে অবগত হলাম এখন আমাদেরকে হালাল খাদ্য সম্পর্কে অবহিত করুন। তখন আয়াতটি নাযিল হয়। সাঈদ ইবনে যুবায়ের সূত্রে অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, তারা উভয়েই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কুকুর এবং বাজপাখি দ্বারা  শিকার করে এমন সম্প্রদায়ের লোক। আর যুরাইহ ও আবু যুওয়াইরিয়া সম্প্রদায়ের কুকুর বন্যপ্রাণী শিকার করে আনে। কিছু প্রাণী মৃত্যুর পূর্বেই আমাদের হস্তগত হয় যা আমরা জবাই করি এবং খাই। আর কিছু প্রাণী মরে যায়। যা আমরা খাই না। এমন পরিস্থিতিতে জন্তুগুলোর বিধান কি? তখন আয়াতটি নাযিল হয়।
হযরত আবু রাফে হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে মদীনার সকল কুকুর মেরে ফেলার নির্দেশ দেন। তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন, হে আল্লাহর রাসূল! যে প্রাণীকে আপনি মেরে ফেলার নির্দেশ দিলেন, তার দ্বারা আমাদের জন্য কী কাজ বৈধ? তখন আয়াতটি নাযিল হয়। হাদিসটি হাকেম তার সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। উপর্যুক্ত ঘটনার ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বর্ণনা করেন, একদা হযরত জিব্রাঈল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আগমন করলেন এবং অনুমতি প্রার্থনা করলেন। কিন্তু অনুমতি পেয়েও তিনি ঘরে প্রবেশ করেননি। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বেরিয়ে এসে বললেন, হে আল্লাহর দূত! আপনাকে তো অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। হ্যাঁ, অনুমতি প্রদান করা হয়েছে বটে, কিন্তু যে ঘরে কুকুর এবং ছবি রয়েছে সে ঘরে আমরা প্রবেশ করি না, বললেন জিব্রাঈল আ.। তারপর তিনি লক্ষ্য করে দেখলেন, ঘরে অনুরূপ কিছু একটা রয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, তখন তিনি আমাকে এমন নির্দেশ দেন, যেন মদীনাতে আর একটি কুকুরও অবশিষ্ট না থাকে, সব মেরে ফেলো। এভাবে কুকুর হত্যার নির্দেশ প্রদানের পর লোকজন তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে লাগল। অতঃপর আয়াতটি নাযিল হয়। আয়াত নাযিলের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপকারী কুকুর রেখে বাকি কুকুর মেরে ফেলার নির্দেশ দেন।
কী কী বস্তু হালাল, সাহাবীদের এমন জিজ্ঞাসা করাকে স্বাভাবিক বিবেচনায় অযৌক্তিক, অনাবশ্যক, এমন ধারণা কেউ কেউ পোষণ করতে পারেন। এই কারণে যে, তারা তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র সংশ্রবধন্য হয়ে তাঁর বাস্তব জীবনাদর্শ প্রত্যক্ষ করেছেন এবং অনুরূপ জীবনানুকরণেই অভ্যস্ত ছিলেন। জীবনানুকরণের এই বাস্তব প্রশিক্ষণে তারা কেবল হালাল বস্তুর দীর্ঘ ফিরিস্তি সম্পর্কে অবগতি লাভ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো কেবল যা হালাল তাই করেছেন, বলেছেন এবং নির্দেশ প্রদান করেছেন। সর্বোপরি ওহীর দরজা তখনো বন্ধ হয়নি। যখনই কোন প্রয়োজন কিংবা সমস্যা দেখা দিয়েছে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলা ওহীর মাধ্যমে তার সমাধান জানিয়ে দিয়েছেন। তাদের মাঝে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদ্যমান, ওহীও চলমান। এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাস্তব জীবনাদর্শ সত্ত্বেও সাহাবীদের ‘কী কী বস্তু হালাল’ এমন জিজ্ঞাসা অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ। এর পেছনে যৌক্তিক কোন রহস্য আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। মানবীয় জ্ঞানে যদিও তার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন অসম্ভব, তারপরও জিজ্ঞাসার প্রদত্ত জবাব এবং তার পূর্বাপর আয়াতের যোগসূত্র, আলোচিত বিষয়, প্রভৃতি সম্পর্কে একটু গভীর মনোনিবেশ সহকারে পর্যালোচনা করলে এরূপ জিজ্ঞাসার যৌক্তিকতা সামান্য হলেও উপলব্ধি করা অসম্ভব কিছু নয়। কী বস্তু হালাল, এমন জিজ্ঞাসা-সম্বলিত আয়াতটি কুরআনের সূরা মায়েদার চতুর্থ আয়াত। সূরাটি মাদানী সূরা। মাদানী সূরাসমূহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এতে বিভিন্ন ধরনের মাসআলা-মাসায়েল, হালাল-হারাম, পারস্পরিক লেনদেন, শরীয়তের দ-বিধি, পারস্পরিক নীতিমালা, উত্তরাধিকার আইন-কানুন, যুদ্ধ-জিহাদের বিধান, সামাজিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিধি-বিধান, প্রশাসনিক নীতিমালা, আর্থসামাজিক নিয়ম-কানুন, ইবাদত, প্রভৃতি সম্পর্কে আলোচনাই প্রাধান্য পেয়েছে। তাফসীরে রুহুল মাআনী গ্রন্থে হযরত আবু উবায়দা হযরত হামযা ইবনে হাবীব এবং হযরত আতিয়্যা ইবনে কায়স হতে বর্ণিত আছে, বলা হয়েছে, সূরা মায়েদা কুরআনের শেষ পর্যায়ে অবতীর্ণ সূরা। সুতরাং এতে যা হালাল করা হয়েছে সেগুলো চিরকালের জন্য হালাল এবং যা হারাম করা হয়েছে তা চিরকালের জন্য হারাম। হযরত ইবনে কাসীর হযরত জুবায়ের ইবনে নুফায়ের সূত্রে অনুরূপ আরেকটি রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন। তিনি একবার হজ্জের সময় হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রা.-এর নিকট উপস্থিত হলেন। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে জুবায়ের, তুমি কি সূরা মায়েদা পাঠ করেছ? জী হ্যাঁ পাঠ করেছি, জানালেন জুবায়ের। তারপর হযরত আয়েশা রা. বললেন, এটি কুরআনের সর্বশেষ নাযিল-হওয়া একটি সূরা। এতে হালাল-হারামের যেসব বিধান বর্ণিত হয়েছে তা অটল, চিরস্থায়ী। এগুলো রহিত হওয়ার সম্ভাবনা নাই। কাজেই এগুলোর প্রতি বিশেষ যতœবান থেকো। ইবনে হিব্বান বাহরে মুহীত গ্রন্থে বলেছেন, সূরা মায়েদার কিয়দাংশ হোদায়বিয়ার সফরে কিয়দংশ মক্কা বিজয়ের সফরে এবং কিয়দাংশ বিদায় হজ্জের সফরে অবতীর্ণ হয়েছে। এতে বুঝা যায় যে সূরাটি সর্বশেষ না হলেও শেষ পর্যায়ে অবতীর্ণ হয়েছে। সূরাটি আরম্ভ করা হয়েছে সেসব বিষয় সমূহের বর্ণনা দ্বারা যা মানুষের জন্য হারাম বা নিষিদ্ধ। এসব হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ অবগত হবার পর স্বভাবতই প্রশ্ন হতে পারে যে, তাহলে কী কী বস্তু হালাল। কাজেই এমন প্রেক্ষপটে সাহাবীদের জিজ্ঞাসা কী বস্তু হালাল কস্মিনকালেও অযৌক্তিক অনাবশ্যক বলে মনে হতে পারে না। সুতরাং এমন জিজ্ঞাসা করাকে অযৌক্তিক কিংবা অনাবশ্যক মনে করাটাই অনভিজ্ঞতা এবং অদূরদর্শিতার পরিচায়ক তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই।
সাহাবায়ে কেরামগণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তারা যে কোন বিষয় সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জিজ্ঞাসা করতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। অতি নগণ্য বিষয় সম্পর্কেও তারা নিঃসঙ্কোচে জিজ্ঞাসা করতেন। এমনকি দৈবাৎ কোন পাপকর্ম সংঘটিত হয়ে গেলেও তা অকপটে স্বীকার করে তার হদ (দ-) বিধান জেনে নিতেন এবং হদ প্রয়োগের জন্য আবেদন জানাতেন। বিভিন্ন হাদিস থেকে তার ভূরি ভূরি প্রমাণ পাওয়া যায়। যারা অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে বিধান জেনে নিতেন, তারা জীবন-যাপন, জগৎ-সংসার সংশ্লিষ্ট বিষয় যাতে ইহকালীন মঙ্গল পারলৌকিক সাফল্য নির্ভরশীল এমন মৌলিক বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে না! এটা তো অকল্পনীয় ব্যাপারমাত্র।
ফিরে আসি আমাদের মূলপর্ব অর্থাৎ জবাবের অংশে। জিজ্ঞাসার জবাবে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, ‘বলে দিন, তোমাদের জন্য সকল ভালো বস্তু হালাল করা হয়েছে এবং শিকারী পশু-পক্ষী যাদেরকে তোমরা প্রশিক্ষিত করে তুলেছ, যেভাবে আল্লাহ তোমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, (আল্লাহর প্রদত্ত জ্ঞানে মানুষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে যে-শিক্ষার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে।) তারা তোমাদের জন্য যা ধরে আনবে, তা তোমরা খেতে পার। আর অবশ্যই তাতে আল্লাহর নাম নেবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর। আজ তোমাদের জন্য সমস্ত ভালো জিনিস হালাল করা হল। আহলে কিতাবদের খাদ্যও তোমাদের জন্য হালাল আর তোমাদের খাদ্রও তাদের জন্য হালাল; এবং মুমিন সচ্চরিত্রা নারী ও তোমাদের পূর্বে যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের সচ্চরিত্রা নারী তোমাদের জন্য বৈধ করা হল যদি তোমরা তাদের মহর প্রদা কর বিবাহের জন্য, প্রকাশ্য ব্যভিচার অথবা গোপন প্রণয়িনী গ্রহণের জন্য নয়। কেউ ঈমান প্রত্যাখ্যান করলে তার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং সে আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। [সূরা মায়েদা : আয়াত ৪-৫]
এটি একটি দীর্ঘ এবং সুবিস্তৃত জবাব। মানব জীবনে বৈধ এমন অনেক বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
উপরিউক্ত জবাব দ্বারা প্রমাণিত হালাল বস্তুসমূহ সাধারণত
ক. সকল পবিত্র বস্তু।
খ. প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিকারী প্রাণীর শিকারকৃত জীব-জন্তু।
গ. আহলে কিতাবদের খাদ্য।
ঘ. সতী-সাধ্বী মুসলিম নারীগণ।
ঙ. আহলে কিতাবদের নারীগণ। এগুলো ব্যতীত সূরার প্রথমে বর্ণিত আরেকটি হালাল বস্তুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিধায় তাও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হল। তাহল, চ. চতুষ্পদ জন্তু। এগুলোর বর্ণনা ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হবে। ইনশাআল্লাহ।
ক. পবিত্র বস্তু।
এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, আজ তোমাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল করা হয়েছে। অতঃপর আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে, তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করা হয়েছে। [সূরা আরাফ : আয়াত ১৫৭]
উপরিউক্ত আয়াতাংশে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, পবিত্র বস্তু হালাল। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে কোন কোন বস্তু পবিত্র বা হালাল তা উল্লেখ করেননি। এছাড়া পবিত্রতার সীমা, সঙ্গা, এবং পবিত্রতা নির্ধারণের মানদন্ড কি তাও উল্লেখিত হয়নি। সেজন্যই উলামা মাশায়েখ ও তাফসীরবিদগণ পবিত্র বস্তু এবং তাদের পবিত্রতা নির্ধারণের মানদন্ডে মতভেদ পোষণ করেছেন। অভিধানে …শব্দটি পবিত্র উত্তম এবং উৎকৃষ্ট প্রভৃতি অর্থেই ব্যবহৃত হয়। তবে আয়াতে স্পষ্ট শুধু মাত্র হালাল বস্তুকেই বুঝিয়েছে। সেজন্য নির্ধারণের মানদন্ড উত্তম, বা উৎকৃষ্টতা নয়, পবিত্রতা বা বৈধতা  হওয়াই একান্ত আবশ্যক। কেননা এমন অনেক হারাম বস্তু সামগ্রী দেখা যায় যা গুণেমানে অনেক উত্তম, উৎকৃষ্ট। উৎকৃষ্টতার মানদন্ডে সেগুলোকে হালাল বা …বলার কোন অবকাশ নেই। আল কুরাআনে …এর বিপরীতে …শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, …দ্বারা যেসব পবিত্র বস্তুকে বুঝানো হয়েছে, সেগুলো ইসলামী শরীয়তের মূলনীতির আলোকে পবিত্র বা শুদ্ধ বলে বিবেচিত। যা সভ্য সমাজে স্বীকৃত মানুষের নিকট মাদৃত এবং ঘৃনাই নয়। এক কথায় ইসলামী শরীয়তে অনুমোদিত বস্তু সামগ্রীই …বলে স্বীকৃত। ইসলামী শরীয়ত সেসব বস্তুকে নোংরা ঘৃণাই সাভ্যস্ত করেছে। যেগুলো নিশ্চিতরূপে মানুষের দেহমন কিংবা আত্মা অথবা উভয়কেই বিনষ্ট করে দেয়। মানুষের চরিত্রকে ধ্বংস করে দেয় একারণেই এগুলো হারাম। পক্ষান্তরে যেসমস্ত বস্তু পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন, পবিত্র যা দ্বারা মানুষের দেহ, আত্মা লালিত হয় এবং উৎকৃষ্ট চরিত্র গঠিত হয় তাই হালাল তাই…বলে স্বীকৃত।
মুহাম্মদ আলী আস সাবুলী র. বলেছেন, …..দ্বারা উদ্দেশ্য হল হালাল রিযিক। সুতরাং আল্লাহ যা হালাল করেছেন তাই পবিত্র আর যা হারাম করেছেন তাই নোংরা অপবিত্র। উমর বিন আ. আজিজ বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল হালাল পবিত্র উপার্জন পবিত্র খাদ্য নয়। কোন কোন বস্তু …তথা পবিত্র, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন উপাদেয় খাদ্য। আর কোন কোন …তথা নোংরা ক্ষতিকর, ঘৃণাই তা সুস্থ রুচিজ্ঞান সম্পন্ন মানুষের আগ্রহ ও অনীহার উপরই নির্ভরশীল। এ ধরনের ব্যাপারে নবী রাসূলগণের সিদ্ধান্তই সবার জন্য আকাট্য দলিল। কেননা মানুষের মধ্যে তারাই সর্বাধিক সুস্থ স্বভাব সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে তাদেরকে সুস্থ স্ববাব সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব, জ্ঞান রুচি দ্বারা ভূষিত করেছেন। স্বয়ং নিজে তাদেরকে শিক্ষা-দীক্ষা প্রদান করেছেন। তাদের চারদিক দিয়ে ফেরেশতাদের পাহারা বসিয়েছেন। ফলে তাদের মন-মস্তিস্ক, স্বভাব-চরিত্র কোন ভ্রান্ত পরিবেশ দ্বারা কলুষিত হওয়া থেকে মুক্ত। তারা যেসব বস্তুকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন বলে আখ্যা দিয়েছেন সেগুলো প্রকৃত পক্ষেই পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পুত-পবিত্র।
পবিত্র বস্তু গ্রহণের জন্য আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ প্রদান করেছেন। এরশাদ হচ্ছে, হে রাসূল! পবিত্র বস্তু হতে খাও এবং নেক আমল কর। [সূরা আল মু’মিনুন, আয়াত: ৫০]
হে ঈমানদারগণ আমি তোমাদেরকে পুত-পবিত্র রিযিক দান করেছি তাহতে খাও। [সূরা বাকারা, আয়তা: ১৭২]
আমি যে পবিত্র রিযিক তোমাদেরকে দান করেছি তাহতে খাও, তবে বাড়াবাড়ি করো না। [সূরা তা-হা, আয়াত: ৮১]
এভাবে পবিত্র বস্তু ভক্ষণের নির্দেশ আল কুরআনের ছত্রে ছত্রে বিবৃত হয়েছে। খাদ্য-দ্রব্য যেহেতু আমানষের শরীরের অংশে রূপান্তরিত হয়, মানব চরিত্র প্রভাবাঞ্চিত হয়, তাই শারীরিক আত্মীক, চারিত্রিক দিক দিয়ে ক্ষতিকর খাদ্য পানাহার এমন বস্তু সামগ্রী হতে সতর্কতা অবলম্বন খুবই জরুরী।
প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিকারী প্রাণীর শিকারকৃত জীব-জন্তু
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত  শিকারী প্রাণী যেমন কুকুর, বাজ পাখি ইত্যাদি দ্বারা শিকারকৃত জীব-জন্তু খাওয়া হালাল।এরশাদ হচ্ছে, আর যে সব শিকারী জন্তুকে তোমরা প্রশিক্ষণ দান কর শিকারের প্রতি প্রেরণের জন্য এবং তাদেরকে ঐ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দাও, যা আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। এমন শিকারী জন্তু তোমাদের জন্য যে শিকার ধরে আনবে তা খাও এবং তাতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর। শরহে বেকায়া এবং কুদুরী প্রণেতাগণের মতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চার ধরনের প্রাণী দ্বারা শিকার করা বৈধ। কুকুর, বাজ পাখি, বাঘ, থাবা বিশিষ্ট প্রাণী। অবশ্য বাঘ দ্বারা শিকার করা নিয়ে ফিকহবিদগণের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। এ ব্যাপারে ফিকহের কিতাব সমূহে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিকারী প্রাণীর শিকারকৃত জীব-জন্তু খাওয়ার ব্যাপারে সকল ইমামগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন। কতিপয় শর্ত সাপেক্ষেই এরূপ শিকার খাওয়া বৈধ। যেমন, ১. প্রশিক্ষিত শিকারী প্রাণী সংশ্রিষ্ট শর্তাবলী। ২. শিকারকৃত প্রাণী সংশ্লিষ্ট শর্তাবলী। ৩. শিকার বা শিকারকারী ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট শর্তাবলী।
প্রশিক্ষিত প্রাণী সংশ্লিষ্ট শর্তাবলী:
১. প্রাণিটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত  হতে হবে। প্রশিক্ষণদাতা মুসলমান কিংবা আহলে কিতাব যেই হোক না কেন। অবশ্য …পন্থায় হতে হবে। প্রশিক্ষণের অর্থ হল শিকারের দিকে প্রেরণ করলে সে শিকার ধরে নিয়ে আসবে। একটা কুকুর দ্বারা শিকারের বেলায় আর বাজ পাখির বেলায় ডাক দিলেই ফিরে আসবে।
২. শিকারকৃত প্রাণী নিজে খাবে না। কিন্তু খেয়ে ফেললে তা হালাল নয়। যদি শিকারের অংশ বিশেষ খেয়ে ফেলে তবে তা ইমাম শাফেয়ী রহ. সহ প্রসিদ্ধ আলেমদের মতে খাওয়া বৈধ হবে না। আর ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেছেন, শিকারী প্রাণী পশু হলে অবৈধ। আর পাখি হলে বৈধ। অবশ্য ইমাম মালেকের মতে এ ধরনের শিকারকৃত প্রাণীর গোস্ত খাওয়ার হালাল।
৩. শিকার ধরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করবে না।
শিকারকৃত প্রাণী সংশ্লিষ্ট শর্তাবলী:
১. শিকারকৃত প্রাণী অবশ্যই হালাল পশু শ্রেণীভুক্ত হতে হবে।
২. জীবিত অবস্থায় ধরে নিয়ে আসতে হবে।
৩. আল্লাহর নামে জবাই করতে হবে।
৪. ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেছেন শিকারকে জখম করাও শর্ত।
শিকারী ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট শর্তাবলী:
১. শিকারী ব্যক্তি মুসলমান হতে হবে।
২. প্রশিক্ষিত প্রাণীকে প্রেরণের সময় বিসমিল্লাহ বলতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে বিসমিল্লাহ বর্জন করলে শিকারকৃত প্রাণী খাওয়া বৈধ হবে না।
৩. তার সাথে এমন কোন ব্যক্তি থাকবে না যার শিকার জবাই বৈধ নয়।
৪. ইচ্ছাকৃতভাবে প্রাণীকে শিকারের দিকে প্রেরণ করতে হবে।
৫. শিকারী প্রাণী প্রেরণের সময় অন্য কোন কাজে ব্যস্ত থাকবে না।
উপরিউক্ত শর্তাবলী পূরণ সাপেক্ষে যে শিকার করা হবে তা খাওয়া সকল ইমামগণের মতে জায়েজ। তবে কোন শর্ত অনুপস্থিত হলে তা খাওয়া বৈধ হবে না।
আহলে কিতাবদের খাদ্য:
আহলে কিতাবদের খাদ্য মুসলমানদের জন্য এবং মুসলমানদের খাদ্য তাদের জন্য বৈধ। এরশাদ হচ্ছে, কিতাবীদের খাদ্য তোমাদের জন্য এবং তোমাদের খাদ্য তাদের জন্য হালাল।
এখন কথা হল আহলে কিতাব কারা। যাদের খাদ্য এবং নারী মুসলমানদের জন্য হালাল? আর কিতাব বলে কোন কিতাব বুঝানো হয়েছে?…শব্দটি …অর্থই ব্যবহৃত। …। কিন্তু আয়াতে কিতাব বলে যে কোন লিখিত পাতাকে বুঝানো হয়নি। বরং এখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত ঐশী কিতাবকেই বুঝানো হয়েছে। এতে কারো দ্বিমত নেই। আর এসব কিতাব যে আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত তা আল কুরআনের সমর্থন দ্বারা নিশ্চিত হতে হবে। যেমন, তাওরাত, ইঞ্জীল, যবুর, এবং মুসা ও ইবরাহীম আ. এর সহীফা সমূহ ইত্যাদি। সুতরাং যেসব জাতি এসব কিতাবের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং তাকে খোদায়ী প্রত্যাদেশ বলে মনে করবে তারাই আহলে কিতাব। যেমন, ইহুদী নাসারাগণ, পক্ষান্তরে আল্লাহর কিতাব বলে কুরআন সুন্নাহর নিশ্চিত পন্থায় প্রমাণিত নয়, তারা আহলে কিতাবের অন্তর্ভুক্ত হবে না। যেমন, মক্কার মুশরেকগণ, অগ্নি উপাসক, মূর্তিপুজারী, হিন্দু বৌদ্ধ, আর্য, শিখ প্রভৃতি। সুতরাং বুঝা গেল আল কুরআনের পরিভাষায় কেবলমাত্র ইহুদী, খৃষ্টান জাতীই আহলে কিতাব বলে স্বীকৃত। কেননা, তারা তাওরাত ইঞ্জীলের প্রতি বিশ্বাসী। আজ-কাল ইউরোপ, আমেরিকা, বৃটেন, ফ্রান্স, ইসরাঈলে বিরাট সংখ্যক ইহুদী-খৃষ্টান রয়েছে। যারা শুধু আদম শুমারী অনুযায়ীই ইহুদী-খৃষ্টান। প্রকৃত পক্ষে তারা না মুসা আ. কে আর না ইশা আ. কে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করে। তাওরাত ইঞ্জীলকে আল্লাহর গ্রন্থ বলে বিশ্বাস করে না। এরা নামে ইহুদী-খৃষ্টান হলেও আল কুরআনের পরিভাষায় ইহুদী খৃষ্টান বলে স্বীকৃত হবে না। কুরআন হাদীসের পরিভাষা অনুযায়ী স্বীকৃত ইহুদী খৃষ্টানদের বিধান আর নাম ধারী ইহুদী খৃষ্টানদের বিধান কখনো এক হবে না।
অভিধানে …বলতে সাধারণত খাদ্য-দ্রব্যকেই বুঝানো হয়। ব্যপকার্থে সকল প্রকার খাদ্য দ্রব্যই তাতে অন্তর্ভূক্ত। তবে আয়াতে খাদ্য বলতে বিশেষ এক ধরনের খাদ্য-দ্রব্যের কথা বলা হয়েছে। সাহাবী তাবেয়ী এবং আগের কালের মনীষীগণের মতে এ স্থলে খাদ্য বলতে আহলে কিতাবদের জবাই করা পশু ও তার গোশতকে বুঝানো হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. আবু দারদা রা. ইবরাহীম, কাতাদা, সুদ্দী, যাহহাক, মুজাহিদ রহ. প্রমুখগণ হতেও অনুরূপ কথাই বর্ণিত হয়েছে। কেননা গোশত ব্যতীত অন্যান্য সকল খাদ্য-দ্রব্যের ক্ষেত্রে আহলে কিতাব, পৌত্তলিক, মুশরিক সকলেই সমান। যেমন, চাল আটা রুটি ফল ইত্যাদি জবাই করার প্রয়োজন নাই। তাই এগুলো যে কোন লোকের নিকট থেকে বৈধ উপায়ে অর্জিত হলে তা মুসলমানদের জন্য খাওয়া হালাল। এতে কারো দ্বিমত নাই। কিন্তু যদি আয়াতে খাদ্য বলতে বিশেষ প্রণালীতে তাদের হাতে প্রস্তুতকৃত অথবা রন্ধনকৃত খাদ্য-দ্রব্য বুঝানো হয়, তাহলে রান্নায় ব্যবহৃত অপরাপর উপাদান বৈধ বা হালাল নিশ্চিত হওয়া সাপেক্ষে খাওয়া বৈধ। অন্যথায় বৈধ নয়। এছাড়া তাদের বাসন কোসন ও হাতের পবিত্রতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে তা থকে বেঁচে থাকাই উত্তম। তবে সর্বসম্মত মতে খাদ্য বলতে তাদের জবাই করা পশু উদ্দেশ্য। সুতরাং আয়াতাংশের অর্থ দাঁড়ায়, আহলে কিতাবদের জবাই করা পশু মুসলমানদের জন্য এবং মুসলমানদের জবাই করা পশু আহলে কিতাবদের জন্য হালাল। এর কারণ হল পশু জবাই করা তাদের ধর্মানুসারে ইসলাম ধর্মের অনুরূপ। আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে পশু জবাই করাকেও তারা বিশ্বাসগতভাবে জরুরী মনে করে। এছাড়া মৃত জন্তু ভক্ষণ করাকেও তারা হারাম মনে করে থাকে। আহলে কিতাবগণ তাদের ধর্মের অনেক পরিবর্তন-পরিবর্ধন সংযোজন এবং বিয়োজনের পরও পশু জবাই করার বিধানটি ইসলামী শরীয়তের অনুরূপই রয়ে গেছে। আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্য কারো নামে জবাই করা জন্তু খাওয়া তারাও হারাম মনে করে এবং জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করাকে জরুরী মনে করে।
কারো কারো মতে আহলে কিতাবদের জবাই করা ঐ সমস্ত পশু মুসলমানদের জন্য খাওয়া হালাল হবে, যেগুলো আল্লাহর নামে জবাই করা হয়েছে। পূর্ববর্তী আলেমদের কেউ কেউ আহলে কিতাবদের আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্যের নামে জবাই করা জন্তু খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। পরবর্তী যুগের আলেমগণ এরূপ মতের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এ ধরনের অভিমত সুস্পষ্ট ভ্রান্ত তার স্বপক্ষে যুক্তি প্রমান পেশ করেছেন। তাদের ফায়সালা হল আহলে কিতাবদের আসল মাযহাবেও এরূপ জন্তু খাওয়া হারাম। কিন্তু যারা হালাল বলেছেন, তারা হয়তো জ্ঞানের দৈন্যতায় নয়তো অদুরদর্শিতায় এরূপ অভিমত প্রদান করেছেন। তাতে সন্দেহ নাই। তারা আসল আহলে কিতাব এবং বিভ্রান্ত আহলে কিতাবদের মাঝে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়েই আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্য নামে জবাই করা জন্তু খাওয়া হালাল হওয়ার কথা বলেছেন।
পক্ষান্তরে সাধারণ সাহাবী, তাবেয়ী এবং মুজতাহিদ ইমামগণ লক্ষ্য করেছেন, আহলে কিতাবদের যে সমস্ত মুর্খ জনগণ আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্য নামে, অথবা আল্লাহর নাম ব্যতীত জবাই করে তা যেমন ইসলামী শরীয়তের বিধানের পরিপন্থী, তেমনি স্বয়ং আহলে কিতাবদের ধর্মমতেরও পরিপন্থী। সে জন্য তাদের ফায়সালা হল এরূপ জবাই করা জন্তু আয়াতে বর্ণিত আহলে কিতাবদের জবাই করা জন্তুর অন্তর্ভূক্ত হবে না। সুতরাং তা খাওয়া হালাল হওয়ার কোন কারণ নাই। এটাই সাধারণ সাহাবী এবং তাবেয়ীদের মত। হযরত ইবনে কাসীরের বরাহ দিয়ে তাফসীরে বাহরে মুহীত গ্রন্থে বলা হয়েছে, আহলে কিতাবগণ যদি জবাই করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ না করে, তবে তা খাওয়া জায়েয নয়। আবু দারদা ওবাদা ইবনে সামেত, এবং একদল সাহাবী অনুরূপ কথাই বলেছেন। ইমাম আবু হানিফা আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ, যুফার এবং ইমাম মালেক প্রমুখগণও তাই বলেছেন। তবে ইমাম নাখয়ী এবং সাওরী এরূপ জবাই করা জন্তুকে খাওয়া মাকরুহ বলেছেন।
কিতাবীদের জবাই করার মাসআলাটি যে বর্তমানেও ইসলামী শরীয়তের অনুরূপ তা বিভিন্ন সময়ে মুদ্রিত হাল আমলের তাওরাত ইঞ্জীল থেকেও তার সমর্থন পাওয়া যায়। এছাড়া বর্তমান যুগে ইহুদী, খৃষ্টান উভয় সম্প্রদায়ের নিকট স্বীকৃত বাইবেলের প্রাচীন আহাদ নামায়ও তার সমর্থন রয়েছে। সেখানে জবাই সংক্রান্ত যেসব বিধি-বিধান রয়েছে তন্মধ্যে,
* যে জন্তু আপনা আপনি মরে যায়, এবং যেসব জন্তুকে অন্য কোন হিং¯্র প্রাণী ছিড়ে ফেলে, তার চর্বি অন্য কাজে লাগাতে পারে কিন্তু কোন অবস্থায়ই তা খেতে পারবে না।
* যে কোন পন্থা প্রক্রিয়ায় মনের আগ্রহে এবং খোদাওন্দ প্রদত্ত বরকত অনুযায়ী জবাই করে মাংশ খেতে পারবে। কিন্তু তোমরা রক্ত কখনো খেয়ো না।
* তোমরা দেব দেবীর নামে কোরবানীর মাংস, রক্ত, কন্ঠরোধে নিহত জন্তু এবং হারাম কর্ম থেকে বিরত থাক।
* আমালে হাওয়ারিয়্যীন গ্রন্থে আছে আমি এ মীমাংসা লিখে দিলাম যে তারা শুধু দেব দেবীর নামে কোরবানীর মাংস থেকে এবং কণ্ঠরোধে নিহত জন্তু ও হারাম কার্য থেকে নিজকে বাচিয়ে রাখবে। এগুলো হচ্ছে আজ কালকার বাইবেল সোসাইটি হতে মুদ্রিত তাওরাত ইঞ্জীলের উদ্ধৃতি। এতে বিস্তর পরিবর্তন-পরিবর্ধনের পরও তা হুবহু করুআনের বিধি-বিধানের অনুরূপই অবশিষ্ট রয়ে গেছে। আর কুরআনে বলা হয়েছে, তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শুকরের মাংস, যে জীব আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্যের নামে জবাই করা হয়েছে, কণ্ঠরোধে নিহত জন্তু, আঘাত জনিত কারণে মৃত জন্তু, উচ্চস্থান হতে পতনে মৃত জন্তু, এবং শিং এর আঘাতে মৃত জন্তু, হিং¯্র জন্তু, ভক্ষণকৃত জন্তু, তবে যদি তোমরা জবাই করে পাক করে নিতে পার, এবং ঐ জন্তু যা দেব দেবীর যঞ্জ বেদীতে জবাই করা হয়েছে। এতদ সংক্রান্ত উভয় ধর্মের বিধি বিধান পাশাপাশি উদ্ধৃত হল, এক্ষুণে বিদগ্ধ পাঠক মহল, আহলে কিতাবদের জবাই করা পশু মুসলমানদের জন্য খাওয়া বৈধ আল কুরআনের এমন ঘোষণার যথার্থতা বিচার করবেন, এটাই কাম্য।
সচ্চরিত্রা মুসলিম নারী:
মুসলিম নারীগণ মুসলিম পুরুষদের জন্য চিরকালই হালাল। এরশাদ হচ্ছে, সচ্চরিত্রা মুসলিম নারীগণ। এখানে সচ্চরিত্রা হওয়ার শর্ত সম্ভবত উৎসাহ প্রদানের জন্য আরোপিত হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সচ্চরিত্রা ভিন্ন অন্য নারী বিবাহ করা হালাল হবে না কেউ বিবাহ করবে না। বস্তুত, চারিত্রিক পরিশুদ্ধতা নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্যই জরুরী। সেজন্যই তো প্রবাদে বলা হয় ‘যেইছা কু তেইছা মিলে’ অর্থাৎ, যেমনের তেমন মিলে। আল্লাহও তাই বলেন, দুশ্চরিত্রা নারীকুল দুশ্চরিত্র পুরুষ কুলের জন্য দুশ্চরিত্র পুুরুষকুল দুশ্চরিত্রা নারীকুলের জন্য উপযুক্ত। সচ্চরিত্রা নারীকুল সচ্চরিত্র পুরুষ কুলের জন্য আর সচ্চরিত্র পুরুষকুল সচ্চরিত্রা নারীকুলের জন্য উপযুক্ত। [সূরা আন নূর, আয়াত: ২৬]
উক্ত আয়াতে একটা…বিধি বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মানব চরিত্রে স্বাভাবিক যোগসূত্র রেখেছেন। দুশ্চরিত্রা নারী, দুশ্চরিত্র পুরুষ পরস্পর পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তেমনি সচ্চরিত্রা নারী এবং সচ্চরিত্র পুরুষ পরস্পর পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এভাবে প্রত্যেকেই নিজ নিজ আগ্রহ এবং রুচিবোধ অনুসারে জীবন সঙ্গী খোঁজ করে নেয়। আল্লাহর নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী সে সেরূপই পায়। এটাই মীমাংসার কথা।
মুসলমান নারী মুসলমান পরুষের জন্য হালাল হলেও এ ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা  রয়েছে। তন্মধ্যে অন্যতম শক্তি হচ্ছে, তারা নিষিদ্ধ নারীর শ্রেণীভুক্ত হবে না। হারাম বা নিষিদ্ধ নারীদের বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে, তোমাদের মাতা, তোমাদের কন্যা, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভ্রাতৃ কন্যা, ভাগনী কন্যা, তোমাদের যে মাতা তোমাদেরকে দুধ পান করিয়েছেন, তোমাদের দুধ বোন, তোমাদের স্ত্রীদের মাতা, তোমরা যাদের সাথে সহবাস করেছ, সে সমস্ত স্ত্রীদের কন্যা, যারা তোমাদের প্রতিপালনে রয়েছে। যদি তাদের সাথে সহবাস না করে থাক, তবে এ বিবাহে তোমাদের কোন গোনাহ নেই। তোমাদের ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রী। এবং দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা। কিন্তু যা অতীত হয়ে গেছে তা স্বতন্ত্র ব্যাপার। [সূরা আন নিসা, আয়াত: ২৩]
অপর আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে, যে সব নারীকে তোমাদের পিতা ও পিতামহ বিবাহ করেছেন, তোমরা তাদেরকে বিবাহ করবে না। কিন্তু যা বিগত হয়ে গেছে সেটা স্বতন্ত্র কথা। বস্তুত, এটা অশ্লীল, গজবের কাজ এবং নিকৃষ্ট আচরণ। [সূরা আন নিসা, আয়াত: ২২]
উক্ত দুটি আয়াতে মুহাররামাত নারীদের বর্ণনা প্রদান করা হয়েছে। মুহাররামাত প্রথমত দুভাগে বিভক্ত।
(ক) …বা চিরস্থায়ী হারাম।
(খ) … বা সাময়িক সময়ের জন্য হারাম। যেমন পর স্ত্রী ততক্ষণ পর্যন্ত হারাম, যতক্ষণ সে তার স্বামীর বন্ধনে আবদ্ধ। তালাক দিয়ে দিলে সে আর হারাম বলে বিবেচিত হবে না। প্রথম প্রকারের হারাম নারীগণ আবার তিন শ্রেণীতে বিভক্ত।
ক. বংশগত সম্পর্কের কারণে হারাম।
খ. বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে হারাম।
গ. দুধ পান সম্পর্কের কারণে হারাম।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. সূত্রে বর্ণিত হাদিসে …আয়াত সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বংশের দিক দিয়ে সাত জনকে এবং বৈবাহিক সম্পর্কের দিক দিয়ে সাত জনকে হারাম করেছেন। বংশের দিক দিয়ে সাত জন হল:
১। মাতা। ২। কন্যা। ৩। বোন। ৪। ফুফু। ৫। খালা। ৬। ভাতিজি। ৭। ভাগিনী। এই সাত জন কুরআনের দলীল দ্বারা বংশের দিক দিয়ে হারাম। উল্লেখ্য যে, আল্লাহ তাআলা ফুফু ও খালাগণকে হারাম করেছেন, তবে তাদের কন্যাগণ কিন্তু হারাম নয়। ফুফুর কন্যা, খালার কন্যা, বিবাহ করা জায়েয এতে কারো দ্বিমত নাই।
বৈবাহিক সম্পর্কের দিক দিয়ে হারাম অপর সাতজন হল, ১। দুধ মাতা। ২। দুধ বোন। ৩। স্ত্রীদের মাতা। ৪। স্ত্রীর পূর্ব বংশের কন্যা। ৫। নিজ পুত্রের বধু। ৬। দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা। ৭। সৎ মা। এই সাত জন নারী বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে হারাম।
উপরিউক্ত নারীগণ নিষিদ্ধ বা হারাম। তবে নিষিদ্ধতার অর্থ এই নয় যে এদেরকে বিবাহ করা পৃথিবীর কারো জন্য বৈধ নয়। বরং এর অর্থ হল বিবাহকারী এবং বিবাহিতার মাঝে উক্তরূপ সম্পর্ক হতে পারবে না। হলেই তবে হারাম। অন্যথায় নয়। অর্থাৎ বিবাহকারীর জন্য বিবাহিতা নারী মা, বোন, কন্যা, ইত্যাদি সম্পর্কের কেউ হবেই সে বিবাহ হারাম।
বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে যে সাতজন নারী হারাম তন্মধ্যে দুধ মাতা, দুধ বোন, এবং স্ত্রীদের মাতা, চিরস্থায়ী হারাম শ্রেণী পর্যায়ে গণ্য। নিজ নিজ পুত্র বধূও অনুরূপ। এ ব্যপারে কোন দিমত নাই। তবে পালক পুত্র বধু এবং স্ত্রীর পূর্ব বংশের কন্যা এদের ব্যপারে কথা আছে। সৎমা এবং দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা জাহেলী যুগের প্রচলিত রেওয়াজ। ইসলাম আগমনের পর তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight