আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী : মুহাম্মাদ মিনহাজ উদ্দিন

মানুষ সমগ্র সৃষ্টিজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ জীব। জ্ঞান-গুণ, বিবেক-বোধ, বুদ্ধিমত্তা-তৎপরতা, কার্যদক্ষতা ও জীবনব্যবস্থা থেকে শুরু করে আনুসাঙ্গিক প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষ অপরাপর অন্যান্য সৃষ্টি থেকে ব্যতিক্রম ও প্রাগ্রসর। জীবন ও জগতের সকল কিছুতে মানুষের স্বকীয়তা-অনন্যতা ও বৈশিষ্ট্য দেদীপ্যমান। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সমুজ্জ্বল ও প্রকৃষ্ট বহুবিধ গুণাবলী দ্বারা ঋদ্ধ করেছেন যা মানুষকে সৃষ্টিকুল থেকে সামগ্রিকভাবে বৈচিত্রময় ও আলাদা করে তুলেছে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘আমি আদম সন্তানদেরকে মর্যাদাশীল করেছি।’ [সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৭০]
পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারাতেও আল্লাহ তাআলা মানুষের মান-মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং ফেরেশতাদের অনুযোগের কথা উল্লেখ করেছেন। তাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে মর্যাদাদানের কারণ ও যথার্থতা বিধৃত হয়েছে সুন্দরভাবে।
মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ হলেন ঈমানদারগণ। তবে ঈমানদারদের স্তরেরও তারতম্য রয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন যারা মানবজগতের হিরণ¥রশ্মি। তারা কাজকর্ম, ইবাদত-বন্দেগি ও সার্বিক কার্যকলাপর দ্বারা সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্যপরশ কামনায় মগ্ন থাকেন এবং প্রতিনিয়ত নিজেদেরকে প্রভুর সকাশে আত্মসমর্পিত রাখেন। ফলে তারা আল্লাহর সমধিক ভালোবাসা ও করুণা লাভে ধন্য হন।
তাদের অনেক গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যদ্দরুন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে অত্যধিক ভালোবাসেন এবং তাদের প্রতি করুণা ও দয়া-অনুকম্পার হাত প্রসারিত করেন। সূরা ফুরকানে আল্লাহ তাআলা তাদের বিভিন্ন গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। আমরা সূরা ফুরকানের ৬৩ নাম্বার আয়াত থেকে ৬৯ নাম্বার আয়াত পর্যন্ত আলোচিত তাঁদের বিভিন্ন চরিত্র-বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীগুলো নিয়ে সংক্ষিপ্তরূপে আলোকপাতের প্রয়াস পাবো।
আল্লাহ তাআলার দাসত্ব:
মানুষ যেহেতু আল্লাহর ‘আব্দ’ বা দাস, সে হিসেবে দাসের কাজ হচ্ছে সদা প্রভুর আদেশ-নিষেধের অনুগত থাকা। সে সবকিছুর জন্য আল্লাহর মর্জির উপর নির্ভরশীল। যে আল্লাহর প্রকৃতপক্ষে বান্দা হওয়ার যোগ্য সে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, অভিরুচি সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছাধীন সম্পাদন করে থাকে এবং সর্বদা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ অবনত মস্তকে পালন করে। এ জন্যেই ইসলাম শব্দের অর্থ হচ্ছে আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পন। অর্থাৎ আল্লাহর সকল হুকুম-আহকাম বিনা দ্বিধা-সংকোচে এবং যুক্তিতর্ক ও প্রশ্নের অবতারণা ব্যতিরেকে নিরঙ্কুশভাবে মেনে নেয়া। এ জন্যে একজন খাঁটি মুমিনের প্রথম পরিচয় হবে আল্লাহর হুকুম-আহকাম সর্বোতভাবে ও অকুন্ঠচিত্তে মেনে চলা।
পৃথিবীতে ন¤্রভাবে চলাফেরা করে:
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর বান্দা হলো তারা যারা জমিনে বিনীতভাবে চলাফেরা করে।’ [সূরা ফুরকান: আয়াত ৬৩]
অর্থাৎ তাদের চালচলনে বিনয়-স্থিরতা ও নিরহঙ্কার প্রকাশ পায়। আত্মগরিমা, শঠতা ও দাম্ভিকতা দেখা যায় না। তাদের দৃষ্টি নি¤œগামী হয় এবং তারা দৃঢ় পদক্ষপে পথ চলে। আল্লাহভীতির কারণে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সদা নমনীয় থাকে এবং যত্রতত্র সেগুলোর ব্যবহার থেকে তারা বেঁচে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তারা দুর্বল-ভীরু কিংবা অক্ষম নয়। বরং আল্লাহভীতি ও আখিরাতের চিন্তা তাদেরকে সজ্জন, সহনশীল এবং নমনীয় ও স্বল্পভাষী করে রাখে।
কেউ মূর্খজনোচিত আচরণ করলে শান্তির কথা শোনায় :
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুর্খেরা যখন তাদের সাথে বাক-বিত-া করে তখন তারা বলে, তোমাদের প্রতি সালাম (আমি   তোমাদের সাথে বিতর্কে জড়াবো না)।’ [সূরা ফুরকান: আয়াত ৬৩] এখানে সালামের অর্থ মুসলমানেরা পরস্পর দেখা-সাক্ষাতে অভিবাদন জানানোর ধর্মীয় মাধ্যম সালাম নয়; বরং ঐ অজ্ঞের শান্তি-সুখ ও নিরাপত্তা কামনা করা এবং বুঝিয়ে দেয়া যে, তোমার অজ্ঞতাপ্রসূত আচরণের জবাব আমি মূর্খতা দিয়ে দেবো না। তোমার সাথে ঝগড়াও করবো না। বরং তোমার শান্তি-সমৃদ্ধি ও মঙ্গল হোক, সেটাই আমি কামনা করি। আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেছেন, ‘ভালো ও মন্দ কখনো সমান হতে পারে না। মন্দকে ভালো আচরণ দ্বারা প্রতিহত করো। অতএব যার সাথে তোমার শত্রুতা রয়েছে, সে যেন তোমার পরমপ্রিয় বন্ধু হয়ে ওঠবে।’ [সূরা ফুসসিলাত: আয়াত ২৫]
সিজদা ও নামাজরত অবস্থায় রাত্রিজাগরণ করে:
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা তাদের রবের ইবাদতে সিজদা ও দ-ায়মান অবস্থায় রাত্রিজাগরণ করে।’ [সূরা ফুরকান: আয়াত ৬৪]
যারা ইবাদতের নিমিত্ত নিদ্রা ও শয্যা ত্যাগ করে রাত্রিজাগরণ করে তারা নিশ্চয় আল্লাহর প্রিয় বান্দা। শেষ রাতের তাহাজ্জুদ নামাজ সকল রাতের নেক বান্দার অভ্যাস ছিল। এ নামাজ মুমিনের মান-মর্যাদা বৃদ্ধি করে। সারা দিনমান তারা ইলম অর্জন-বিতরণ, দাওয়াত-তাবলিগ ও আপন কাজকর্মে ব্যস্ত থাকে এবং নৈশপ্রহরে আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভে ব্রতী হয়। অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের পার্শ্বদেশ শয্যা থেকে পৃথক থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে আশা ও আশঙ্কায় ডেকে থাকে।’ [সূরা সিজদা: আয়াত ১৬]
আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন, ‘তারা রাতের বেলা খুব স্বল্প আরাম গ্রহণ করে এবং শেষপ্রহরে ক্ষমা-মার্জনা কামনা করে।’ [সূরা জারিয়াত: আয়াত ১৭-১৮]
আল্লাহর নিষ্ঠাবান বান্দারা রাতে বিছানা ত্যাগ করে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে নিমগ্ন হয়। প্রভুর করুণা ও পুণ্য লাভের আশায় তারা নামাজ-জিকির এবং ইস্তেগফারে ব্যাকুল হয় ও আত্মসমাহিত হয়।
আল্লাহর অপার মেহেরবানি যে, যারা এশা ও ফজরের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করবে তাদেরকেও তিনি ‘ইবাদতের নিমিত্ত রাত্রিজাগরণকারী’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করবেন। হযরত উসমান রা. বলেন, ‘যে এশার নামাজ জামাতে পড়ে সে অর্ধরাত্রি এবং যে ফজরের নামাজ জামাতের সাথে পড়ে সে বাকি অর্ধরাত্রি ইবাদত করার সওয়াব পায়।’ [আবু দাউদ]
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে, ‘যে ব্যক্তি শোয়া ও বসাবস্থায় অথবা পার্শ্বদেশ পরিবর্তন করা অবস্থায় আল্লাহ তাআলার জিকির করে, সেও উপর্যুক্ত আয়াতের আওতায় পড়বে।
জাহান্নামের শাস্তি হটিয়ে দেয়ার দোআ করে :
আল্লাহর প্রিয় বান্দারা বলে, ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের কাছ থেকে জাহান্নামের শাস্তি দূরে সরিয়ে নাও। জাহান্নামের শাস্তি  নিশ্চয় ধ্বংসের।’ [সূরা ফুরকান: আয়াত ৬৫]
আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ ইবাদতে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে। নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকে না। নির্লিপ্ততা তাদের মনে বাসা বাঁধে না। আখিরাতের ভাবনায় বিভোর হয়ে থাকে এবং যথাসাধ্য চেষ্টা-সাধনা অব্যাহত রাখে। আল্লাহর দরবারে তাদের ইবাদত-বন্দেগি ও অধ্যাবসা-সাধনা, কবুল হওয়ার জন্যে সকাতর আর্তি নিয়ে দোআ-আরাধনায় লিপ্ত থাকে।
অপচয় ও কার্পণ্য করে না:
আল্লাহর বান্দাদের আরেকটি গুণ হলো, ‘তারা যখন খরচ করে তখন তারা অযথা ব্যয় করে না, কৃপণতাও করে না। বরং মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। [সূরা ফুরকান: আয়াত ৬৭]
শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর অসন্তুষ্টিতে খরচ করাকে অপব্যয় বলে। যদিও তা অতি সামান্য হোক। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না। কুরআনের অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ [সূরা বনি ইসলাঈল: আয়াত ২৭]
বৈধ ও শরিয়তের অনুমোদিত ক্ষেত্রেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করা অপচয়ের পর্যায়র্ভুক্ত। কুরআনের ভাষ্যানুযায়ী অযথা ও অনর্থক ব্যয় হারাম ও গুনাহের কাজ। ইদানিং বিয়ে-শাদি ও অন্যান্য অনুষ্ঠানাদিতে প্রচুর পরিমাণে অপব্যয় করা হয়। অথচ শত শত অনাথ-অসহায় ও বিধবা না খেয়ে, না পরে দিনাতিপাত করছে। তাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও ভ্রক্ষেপ করা হয় না। সর্বদা স্মরণ রাখা চাই, কামাই-রোজগার ও খরচাদির ব্যাপারেও আল্লাহর কাছে জবাবদিহি হতে হবে। তাই ব্যয়বাহুল্য, বিলাসিতা ও আয়েশিভাব পরিহার করে চললে নিজের জন্যই মঙ্গল। সৎকর্মশীল ও আল্লাহর প্রিয় বান্দারা অযথা খরচ ও অপব্যয় থেকে বেঁচে থাকার নিরন্তর চেষ্টা করনে।
আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করে না:
আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্যতম একটি গুণ হলো, ‘আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করে না।’ [সূরা ফুরকান: আয়াত ৬৮] ‘শিরক’ করা বা কোনো কিছুকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা সবচে’ মারাত্মক গুনাহ। আল্লাহ তাআলা সব গুনাহ মাফ করলেও শিরকের গুনাহ মাফ করবেন না। হযরত লোকমান আ. তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিয়েছেন, ‘হে পুত্র! তুমি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করিও না। নিশ্চয় শিরক সবচে মারাত্মক জুলম।’ [সূরা লোকমান: আয়াত ১৩]
যেসব কাজ বা বিষয় একমাত্র আল্লাহর অপারশক্তি ও ক্ষমতার আওতাধীন, সে সব কাজ অন্য কোনো বস্তু বা ব্যক্তি করতে পারার মতো ক্ষমতা রাখে মনে করা এবং সে কর্মযজ্ঞসিদ্ধির জন্য তাদের কাছে কোনো প্রকার সাহায্য চাওয়াকে শিরক বা আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন বলে।
কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে না:
আল্লাহর প্রিয় বান্দারা কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করে না ও পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ যার হত্যা অবৈধ করেছেন, সঙ্গত কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করে না’ [সূরা ফুরকান: আয়াত ৬৮]
কোনো নিরপরাধ মানুষকে হত্যার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘কোনো হত্যাকা-ের প্রতিশোধ গ্রহণের নিমিত্ত কিংবা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণ ছাড়া যদি কেউ কাউকে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেউ হত্যা করল। [সূরা মায়েদা: আয়াত ৩২]
ব্যভিচার করে না:
আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ ব্যভিচার-যিনা, অশ্লীল কার্যকলাপ ইত্যাদিতে জড়ায় না। এমনকি ব্যভিচারের নিটকটবর্তীও হয় না। তা থেকে যোজন যোজন দূরত্ব বজিয়ে রাখে। গান-বাজনা, নৃত্য-ছায়াছবি, অশ্লীল দৃশ্য, বেপর্দা ও খোলামেলা চলাফেরা এবং অবাধ মেলামেশা এসব পাপাচার ও গর্হিত কাজ মানুষকে ক্রমান্বয়ে ছোট-বড় ব্যভিচারে লিপ্ত করে। আল্লাহ প্রিয় মানুষেরা এসবের ধারেকাছেও যায় না।
প্রসঙ্গত যারা উপর্যুক্ত গুনাহগুলো করবে, তাদের ব্যাপারে আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যে উল্লেখিত গুনাহসমূহ করবে, সে শাস্তি ভোগ করবে। কিয়ামতের দিবসে তার শাস্তি দিগুণ করা হবে এবং তাকে জাহান্নামে চিরস্থায়ী করে দেয়া হবে’ [সূরা ফুরকান: আয়াত ৬৮-৬৯]
আয়াতে ‘আছামা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তাফসির বিশারদগণ বলেন, আছামা জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম, যা ভীষণ মর্মন্তুদ শাস্তিতে ভরপুর হবে।
যারা কুফর ও শিরকের সাথে সাথে হত্যা ও ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তাদের শাস্তি দ্বিগুণ হবে। এ শাস্তি কাফের ও মুশরিকদের জন্যে প্রযোজ্য। কিন্তু কোনো কাফের-মুশরিক বা গুনাহগার যদি আল্লাহর কাছে তাওবা করে, তাহলে আল্লাহ তাদের অপরাধ মার্জনা করে দেবেন এবং তাদেরকে পুরুস্কারে ভূষিত করবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এ রূপ অপরাধী যদি ঈমান আনে ও তাওবা করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করতে থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাদের পাপরাশিকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দিবেন। এবং আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল দয়াবান।’ [সূরা ফুরকান: আয়াত ৭০]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে কোনো মন্দ কাজ করেছে অথবা নিজের প্রতি অবিচার করেছে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে, তাহলে সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল দয়াবান হিসেবে পাবে।’ [সূরা নিসা: আয়াত ১১০]
কুফর ও শিরকের অবস্থায় যে পাপ করা হয়, তা ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে তাওবা করলে বিগত জীবনের যাবতীয় পাপ মোচন হয়ে যায়। আর কোনো মুমিন যদি ভুলবশতঃ অসাবধানতায় জঘন্য পাপে জড়িয়ে পড়ে, অতঃপর আল্লাহর কাছে তাওবা করে এবং ভবিষ্যতের নিমিত্ত কর্মপন্থা সংশোধন করে নেয়, তবে তাদের তাওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হবে।
অনৈতিক ও মিথ্যা কাজে যোগদান করে না:
আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ মিথ্যাকথন, মিথ্যা আলোচনা, মিথ্যাচর্চার আসর ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করে না। অনৈতিক ক্রিয়ালাপ-পরনিন্দা ও মিথ্যাসাক্ষ্য প্রদান থেকেও বেঁচে থাকে। উপরন্তু এসব থেকে নিজেদের রক্ষা করে চলে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা মিথ্যা কিছুতে উপস্থিত হয় না।’ [সূরা ফুরকান: আয়াত ৭২]
হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘রাসুল সা. মিথ্যাসাক্ষ্য দেওয়াকে মহা কবিরা গুনাহ আখ্যা দিয়েছেন। তাছাড়া মিথ্যা কথা বলাও কবিরা গুনাহ।’
অসার ক্রিয়াকর্মের সম্মুখীন হলে ভদ্রভাবে পাশ কেটে যায়:
তারা যদি দৈবচক্রে অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনর্থক ও বাজে আসর কিংবা কাজের মুখোমুখি হয়, তাহলে কৌশলে ও ভদ্রভাবে তা এড়িয়ে যান। গাম্ভীর্য ও শালীনতা বজায় রেখে সেখান থেকে সরে যান। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘যখন অনর্থক কিছুর পাশ দিয়ে যায়, তখন ভদ্রভাবে চলে যায়।’ [সূরা ফুরকান: আয়াত ৭২]
একবার হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. একটি বাজে মজলিসের পাশ দিয়ে গমন করেন। তখন তিনি সেখানে অপেক্ষা না করে দ্রুত চলে যান। রাসুল সা. এ কথা জানতে পেরে বলেন, ‘ইবনে মাসউদ কারিম (ভদ্র) হয়ে গেছে।’ তারপর তিনি উক্ত আয়াত পাঠ করেন।
আল্লাহর নিদর্শনাবলীর আলোচনা করা হলে বধিরের মতো আচরণ করে না:
যখন আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সামনে আল্লাহর আয়াত ও নিদর্শনাবীল আলোচনা করা হয়, তখন তারা অন্ধ ও বধিরের মতো আচরণ করে না। অর্থাৎ না শোনার না বোঝার কিংবা না দেখার ভান করে না। বরং শ্রবণশক্তি ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে এগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করে। মূর্খের ন্যায় না বোঝা কিংবা বধিরের ন্যায় না শোনার ভান করে না। আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টি ও নিদর্শনাবলীর প্রতি মনোনিবেশ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এবং যাদেরকে তাদের পালনকর্তার নিদর্শনাবলী স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়, তখন তারা অন্ধ ও বধির হয়ে ওঠে না। [সূরা ফুরকান: আয়াত ৭৩] যারা সত্য বুঝেও অন্ধের অভিনয় করবে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে দুনিয়াতে অন্ধ (পথভ্রষ্ট) হবে সে আখেরাতেও অন্ধ হবে। এবং অত্যধিক পথহারা হবে। [সূরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৭২]
স্ত্রী-সন্তানের মাঝে চোখের শীতলতা চেয়ে দোআ করে:
আল্লাহর প্রিয় বান্দারা এভাবে দোআ করে (অন্যান্য দোআও করে), ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানাদির পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদেরকে খোদাভীরুদের ইমাম বা নেতা করুন।’ [সূরা ফুরকান: আয়াত ৭৪]
চোখের শীতলতা অর্থ তাদেরকে আল্লাহর ফরমাবরদারী বা আনুগত্যে মশগুল দেখা। একজন কামিল মুমিনের জন্য চরম কাক্সিক্ষত বস্তু ও পরম চাওয়া-পাওয়া। কারণ সন্তানেরা যদি সৎ ও নেককার হয়, তবে তার ফলাফল তো দুনিয়াতে-ই দেখা যায়। মৃত্যুর পর কবরে সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব পৌঁছতে থাকে।
আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ কেবল নিজের সৎকর্ম নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে না। বরং নিজের স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের যাবতীয় সংশোধন এবং তাদের সৎপথের দিশা দেয়া ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করে যান প্রতিনিয়ত। তাদের হৃদয়ে যেন আল্লাহভীতি সৃষ্টি হয়, সে জন্য সবসময় দোআ করে।
উপর্যুক্ত গুণে যারা বৈশিষ্ট্যম-িত হবেন তাদেরকে কি পুরস্কার দেয়া হবে, সে ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদেরকে ধৈর্য্য ধারণের বিনিময়ে জান্নাতে কক্ষসমূহ দেয়া হবে এবং সেখানে তাদেরকে অভিবাদন ও সালাম জানানো হবে। সেখানে তারা চিরকাল বসবাস করতে থাকবে। অবস্থান ও আবাসস্থল হিসেবে তা কতই না চমৎকার! [সূরা ফুরকান: আয়াত ৭৫-৭৬]
পার্থিব জীবনে তারা মানুষের ভ্রুকুটি ও বিদ্রুপকে উপেক্ষা করেছেন এবং কষ্ট ও ত্যাগ-তিতিক্ষা সহ্য করেছেন। দীনের উপর অটল থাকতে গিয়ে ধৈর্য্যরে পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন। সে জন্য তাদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে এ সুমহান পুরস্কারে ভূষিত করা হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এসব গুণাবলিতে বৈশিষ্ট্যম-িত হওয়ার তাওফিক দান করুন।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক আল-হেরা (আরবি ম্যাগাজিন)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight