আল্লাহর অনুপম গুণাবলি : ডা. গোলাম মোস্তফা

পূর্ব প্রকাশিতের পর..
১৪. আহকামুল হাকিমীন আল্লাহ্ সব বিচারকের তুলনায় সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক
আল্লাহর ঘোষণা: “আল্লাহই আহকামুল হাকিমীন অর্থাৎ আল্লাহ্ কি সব বিচারকের তুলনায় সর্বশ্রেষ্ঠ বড় বিচারক নন? [সূরা তীন:৮] ইমাম আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইবনুল মুনযির, বায়হাকী, হাকেম এবং ইব্ন মারদুইয়া হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন সূরা আত্-তীনের শেষ আয়াত পর্যন্ত পাঠ করবে, তখন যেন সে বলে, ‘বালা ওয়া আনা আলা যালিকা মিনাশ্ শাহিদীন’ অর্থাৎ হ্যাঁ, হ্যাঁ আমিই এর একজন সাক্ষী। কোনো কোনো বর্ণনানুযায়ী এ স্থানে নবী সা. নিজে পড়তেন, “সুব্হানাকা ফাবালা” অর্থাৎ হে আল্লাহ্ তোমার পবিত্রতা স্বীকার করি, তুমি যা বলেছো তা অতীব সত্য। অবিশ্বাসী মুশরিকদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ তার নবী সা. কে বলেন, ‘হে মুহাম্মাদ! বল, তবে কি আমি আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যকে হাকাম-বিচারক-ফয়সালাকারী ও মিমাংসাকারী মানবো? অথচ আল্লাহ্ই পূর্ণ বিস্তারিত বিবরণসহ তোমাদের নিকট কিতাব-আল-কুরআন নাযিল করেছেন।’ [আনআম:১১৪] সূরা হুদে এই আয়াতের প্রতি লক্ষ করুন যেখানে, ‘নূহ্ আ. তার রবকে সম্বোধন করে বলেন, হে আমার রব, আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত এবং আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য, আর আপনি তো বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক। ওয়া আন্তা আহকামুল হাকিমীন। [সূরা হুদ:৪৫, আরাফ:৮৭; আরাফ:১৫৫; ইউনুস:১০৯; ইউসুফ:৮০]

১৪.২ খাইরুল ফাতিহীন আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ মিমাংসাকারী-ফয়সালাকারী
হযরত সুলাইমান আ. এর সময়কালীন ঘটনা, সে সময় সাবা নামক এক সম্প্রদায় আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে পূঁজা করত। আল্লাহর অশেষ কৃপা ও অনুগ্রহে সাবা রাণী তার সম্প্রদায়সহ সুলাইমান আ. এর দাওয়াত গ্রহণ করে আল্লাহর উপর ঈমান আনে। [নামল:৪২-৪৪] ফলে আল্লাহ্  সাবা সম্প্রদায়ের উপর অনুগ্রহ করেন। সাবাবাসীরা বৃহৎ বাঁধ নির্মাণ করে পানি সেঁচের ব্যবস্থা করে এবং তাদের এলাকায় প্রচুর ফসল উৎপন্ন শুরু হয়। তারা অন্যান্য দেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে প্রভূত সম্পদের মালিক হয়। কিন্তু দুঃখজনক ঘটনা এই যে, তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ভুলে যায়, ইবলীস শয়তানের মিথ্যা প্রলোভনে সম্পদ বৃদ্ধির লোভে নিজেদের উপর যুলুম করে বসে, ফলে আল্লাহ্ তাদের বাঁধ ভেঙ্গে দিয়ে তাদেরকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দেন। অথচ আল্লাহ্ই আকাশ ও পৃথিবী থেকে সকলের জন্য রিযিক প্রদান করেন। আর প্রত্যেক স্পম্প্রদায়কে তাদের নিজেদের অপরাধের জন্য আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ্  কিয়ামতের দিন সকলকে একত্র করবেন, তারপর তিনি আমাদের মধ্যে সঠিকভাবে ফয়সালা করে দিবেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী, সর্বজ্ঞ। [হুদ:৪৫’ আরাফ:৮৭; আরাফ:১৫৫; ইউনুস:১০৯; ইউসুফ:৮০; আহকাফ:২; ফাতাহ:৪,৭,১৯] হযরত শুয়াইব আ. এর সম্প্রদায়েরা যখন তার ঈমানী আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করে, তখন তিনি আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করেনে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে ন্যায্যভাবে মীমাংসা করে দাও এবং তুমিই শ্রেষ্ঠ মীমাংসাকারী ওয়া আনতা খাইরুল ফাতিহীন। [আরাফ:৮৯]

১৪.৩ খাইরুল ওয়ারিছীন আল্লাহ্ চূড়ান্ত সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী-মালিকানার অধিকারী
হযরত জাকারিয়া আ. তার রবকে আহ্ববান করে বলেছিলেন, “হে আমার রব! আমাকে একা [নিঃসন্তান] হিসাবে রেখো না, তুমি তো শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী-মালিকানার অধিকারী [খাইরুল ওয়ারিছীন]। তারপর আল্লাহ্  তার ডাকে সাড়া দিলেন এবং তাকে দান করলেন ইয়াহ্ইয়া আ. কে সন্তানরূপে এবং তার জন্য তার স্ত্রীকে সন্তান ধারণের যোগ্যতা সম্পন্ন করে দিয়েছিলেন। তারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করত, তারা আমাকে ডাকত আশা ও ভীতির সাথে এবং তারা ছিল আল্লাহর নিকট বিনীত। [আম্বিয়া:৮৯-৯০] আল্লাহ্ আকাশ, পৃথিবী, পর্বতমালা, গ্রহ নক্ষত্রের সৃষ্টি রহস্য বর্ণনা করেন, তিনিই সবার জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করেন। আল্লাহ্র নিকট আছে প্রত্যেক বস্তুর ভা-ার এবং তা থেকে তিনি নির্দিষ্ট পরিমাণেই সরবরাহ করে থাকেন। আল্লাহ্ বৃষ্টি সমৃদ্ধ বায়ূ প্রেরণ করেন, আকাশ হতে বারি বর্ষণ করেন, তারপর তিনি মানুষকে পান করান; অথচ মানুষেরা এইসব সম্পদের কোষাধ্যক্ষ নও। [হিজর:১৬-২২] আল্লাহ্ই চূরান্ত মালিকানার অধিকারী [কাসাস:৫৮]। নিশ্চয় তিনিই জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান এবং তিনিই সকল কিছুর চূড়ান্ত উত্তরাধিকারী ‘ওয়া নাহনুল ওয়ারিছূন’ [হিজর:২৩]

১৪.৪ খাইরুর রাযিকীন আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা
হযরত ঈসা ইব্ন মারইয়াম আ. বলল, ‘হে আল্লাহ্ আমাদের রব, তুমি আমাদের জন্য আকাশ হতে খাদ্যপূর্ণ পাত্র প্রেরণ কর, এটি হবে আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবার জন্য আনন্দোৎসব স্বরূপ এবং তোমার নিকট হতে নিদর্শন। আর আমাদেরকে জীবিকা দান কর; তুমিই তো শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা-রিযিকদাতা। [মায়েদা:১১৪] আল্লাহ্ নিজেই রিযিক-জীবিকাদাতা, বিরাট মহান শক্তিধর, পরাক্রমশীল। [যারিয়াত:৫৮] ‘যারা হিজরত করে আল্লাহর পথে, তারপর নিহত হয়েছে অথবা মারা গেছে, তাদেরকে আল্লাহ্ অবশ্যই উৎকৃষ্ট জীবিকা দান করবেন; আর নিশ্চয় আল্লাহ্ তিনি তো শ্রেষ্ঠ ও সর্বোৎকৃষ্ট জীবিকাদাতা [হজ:৫৮; সাবা:৩৯]
‘হে মুহাম্মাদ! বল, আমার রব তো তার বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা রিযিক বর্ধিত করেন এবং যার প্রতি ইচ্ছা সীমিত করেন। তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে তিনি তার প্রতিদান দিবেন। তিনিই শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা। [সাবা:৩৯] বুখারী ও তিরমিযী শরীফে তাফসীর অধ্যায়ে দুটি ভিন্ন সনদে জাবির ইবন আবদুল্লাহ্  রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার জুমআর দিন একটি বানিজ্য দল মদীনায় আসল। আমরা নবী সা. এর সঙ্গে ছিলাম। বারজন লোক ব্যতীত সবাই সেদিকে ছুটে গেল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ নাযিল করলেন, ‘যখন তারা দেখল ব্যবসা ও কৌতুক, তখন তারা তোমাকে দাড়ানো অবস্থায় রেখে তার দিকে ছুটে গেল। (হে মুহাম্মাদ) বল, আল্লাহর নিকট যা আছে তা ক্রিড়া-কৌতুক ও ব্যবসা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট এবং আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা ওয়াল্লাহু খাইরুর রাযিকীন। [জুমআ:১১]

১৪.৫ আরহামুর রাহিমীন আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু-দয়াবান
হযরত মুসা আ. পবিত্র তূর পাহাড়ে চল্লিশ রাত্রি পূর্ণ করার পর যখন ফিরে আসে [আরাফ:১৪২] তখন দেখে যে তার সম্প্রদায়ের সামিরী নামে একজন লোক তাদের লোকদের অলংকার দিয়ে গোবৎস আকৃতি একটি মূর্তি তৈরি করে বলল, ‘এই মূর্তিটি তোমাদের ইলাহ্ ও মূসার ইলাহ। [তহা:৮৫-৮৮] মুসা আ. তুর পাহড় থেকে ফিরে এসে তার ভাই হারুন, সামিরী এবং সম্প্রদায়ের লোকদের প্রতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হয়। পরিশেষে হযরত মুসা আ. বলল, ‘হে আমার রব, আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা কর এবং আমাদিগকে তোমার রহমতের মধ্যে দাখিল কর; এবং তুমিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু-দয়াবান, আরহামুর রাহিমীন [আরাফ:১৫০-১৫১] ‘আইয়ুব আ. তার রবকে বলেছিলেন, আমাকে তো শয়তান যন্ত্রণায় ও কষ্টে ফেলেছে। আমি তাকে বললাম, তুমি তোমার পা দ্বারা যমীনে আঘাত কর (ফলে মাটির নিচ থেকে পানি বের হল)। এই সুশীতল পানি পান কর এবং গোসল কর। [সোয়াদ:৪১-৪২] আমি তার দোআ কবুল করেছিলাম এবং বিদূরিত করেছিলাম তার কষ্ট যাতে সে নিপতিত হয়েছিল এবং ফিরিয়ে দিয়েছিলাম তাকে তার পরিবার পরিজন এবং তাদের সাথে তাদের তরফ থেকে রহমতরূপে এবং উপদেশ স্বরূপ ইবাদাতকারীদের জন্য [আম্বিয়া:৮৪; সোয়াদ:৪৩] আইয়ুব আ. তার রবকে আহ্বান করে বলেছিল, ‘আমি দুঃখ-কষ্টে পড়েছি, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু-দয়াবান, ওয়া আনতা আরহামুর রাহিমীন [আম্বিয়া:৮৩]

হযরত ইউসুফ আ. এর ভাইগণ যখন প্রথমবার মিসরে তার নিকট থেকে সাহায্য নিয়ে ফিরে এসে তাদের বাবা হযরত ইয়াকুব আ. কে তাদের ছোট ভাই কে তাদের সাথে নিয়ে পুণঃরায় মিসরে সাহায্য আনার অনুরোধ করে, তখন তাদের বাবা বলল, ‘আমি কি তোমাদেরকে বিনয়ামিন (ছোট ভাই) সম্বন্ধে সেরূপ বিশ্বাস করব, যেরূপ পূর্বে তোমাদেরকে বিশ্বাস করেছিলাম তার ভাই ইউসুফ সম্বন্ধে? আল্লাহ্ই রক্ষণাবেক্ষণে শ্রেষ্ঠ এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু, আল্লাহু খায়রুন হাফিযাও ওয়া হুয়া আরহামুর রাহিমীন। [ইউসুফ:৬৪]

১৪.৬ আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ ¯্রষ্টা
আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া-তাআলা মানব সৃষ্টির রহস্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার উপাদান থেকে; তারপর আমি একে শুক্রবিন্দুরূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে; পরে শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি রক্তপি-ে, তারপর রক্তপি-কে পরিণত করি মাংসপি-ে, মাংসপি-কে পরিণত করি অস্থিপঞ্জরে; তারপর অস্থিপঞ্জরকে ঢেকে দেই মাংস দ্বারা; অবশেষে মানুষকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টিরূপে। অতএব মহান বরকতময় আল্লাহ্ কত সর্বোত্তম ¯্রষ্টা -ফাতাবারাকাল্লাহু আহ্সানুল খালিকীন। [মুমিনুন:১২-১৪] হযরত ইল্য়াস আ. রাসূলদের একজন ছিলেন, তিনি তার সম্প্রদায়কে সাবধান করেছিলেন এবং বলেছিলেন তোমরা কি বা’আলা দেবীকে গ্রহণ করে পরিত্যাগ করবে সর্বশ্রেষ্ঠ ¯্রষ্টা আ’হ্সানুল খালিকুন আল্লাহ্কে, যিনি তোমাদের রব এবং তোমাদের প্রাক্তন পূর্বপুরুষদের রব। [সাফফাত:১২৩-১২৬]

১৪.৭ খাইরুল মাকিরীন আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী মক্কা হতে মদীনা হিজরতের পূর্ব পর্যন্ত মুহাম্মাদ সা. এর ব্যাপারে ঠিক কি ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে এবং কি উপায়ে ইসলামের অগ্রযাত্রা রোধ করা যেতে পারে, এ নিয়ে মক্কার সকল গোত্রের গোত্র প্রধান কাফির-মুশরিকরা তাদের পরামর্শ সভাস্থলে (দারুন-নাদওয়া) ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কেউ নবী সা. কে গ্রেপ্তার-বন্দী করার পরামর্শ দেয় এবং কেউ তাকে মক্কা থেকে বহিষ্কার করার পক্ষে মত দেয়। শেষ পর্যন্ত আবূ জাহেল মত প্রকাশ করে যে, সকল গোত্র হতে উচ্চ বংশজাত এক একজন ক্ষীপ্রহস্ত যুবকদের একটি দল এক সঙ্গে এক আকস্মিক হামলায় মুহাম্মাদ সা. কে হত্যা করবে। মুহাম্মাদ সা. এর গোত্র বনু আবদে মানাফের পক্ষে একাই এতগুলি গোত্রের সাথে যুদ্ধ বা লড়াই করা সম্ভব হবে না, বিধায় তারা হত্যার বিনিময়ে রক্তপণ (দিয়াত) নিতে বাধ্য হবে। আবূ জাহেলের এই মত গৃহিত হয়, হত্যার জন্য লোক ঠিক করা হয়, হত্যার সময়ও নির্দিষ্ট হয়। নির্দিষ্ট রাতে হত্যাকারীরা মুহাম্মাদকে হত্যার উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়। কিন্তু তাদের হামলা করার পূর্বেই নবী কারীম সা. রাতের অন্ধকারে আপন ঘর থেকে বেরিয়ে হযরত আবূ বকর রা. কে সাথে নিয়ে আল্লাহর হুকুমে মদীনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। ফলে কাফির মুশরিকদের সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়। এরি পরিপ্রেক্ষিতে আয়াত নাযিল হয়। আল্লাহর ঘোষণা, “স্মরণ কর, কাফিরগণ তোমার (নবী সা.) বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল তোমাকে বন্দী করবার জন্য বা হত্যা করবার জন্য অথবা দেশ থেকে নির্বাসিত করবার জন্য এবং তারা ষড়যন্ত্র করে আর আল্লাহ্ কৌশল করেন; আর আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী, ওয়াল্লাহু খারুল মাকিরীন। [আনফাল:৩০]

১৪.৮ সব জ্ঞানীদের উপরে আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী
মিসরে যখন হযরত ইউসুফ আ. এর বৈমাত্রের ভাইয়েরা খাদ্যসামগ্রী আনার জন্য আগমন করেন তখন তিনি তাদের চিনতে পারেন। খাদ্য-সামগ্রীর সকল ব্যবস্থা করে হযরত ইউসুফ আ. তাদেরকে তাদের বৈমাত্রের ভাইকে (অর্থাৎ নিজের ভাই বিনয়ামিন-কে) আনার জন্য বলেন এবং বেশী পরিমান খাদ্যসামগ্রী দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। দ্বিতীয় বার হযরত ইউসুফ আ. এর বৈমাত্রের ভাইয়েরা তাদের বৈমাত্রের ভাইকে (বিনয়ামিনকে) সাথে নিয়ে মিসরে আসে। বিনয়ামিন হলো হযরত ইউসুফ আ. এর সহোদর ভাই এবং তাকে হযরত ইউসুফ আ. তার কাছে রেখে দেওয়ার জন্য বিনিয়ামিনের খাদ্যের মালপত্রের মধ্যে কৌশলে গোপনে একটি পানপাত্র রেখে দেয়। পরে বিনিয়ামিনের মাল-পত্রের মধ্য থেকে পানপাত্র উদ্ধার করা হলে বিনয়ামিনকে আটক করে। আল্লাহ্, বলেন, “এইভাবে তিনি ইউসুফের জন্য কৌশল করেছিলেন। মিসরে রাজার আইনে তার সহোদরকে (বিনয়ামিনকে) আটক করতে পারত না, আল্লাহ্ ইচ্ছা না করলে। আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নীত করি। প্রত্যেক জ্ঞানবান ব্যক্তির উপরে আছে একজন সর্বজ্ঞানী, ওয়া ফাউকা কুল্লি যি ইলমিন আলীম। [ইউসুফ:৬৫-৭৬]

১৪.৯ আল্লাহ্ সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল বিশ্বজাহানের মধ্যে আল্লাহ্ হচ্ছেন সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী সত্তা (রাফী’উদ্ দারাজাত)। তিনিই হচ্ছেন সকলের রব, তিনিই একমাত্র ইবাদাত পাওয়ার যোগ্য সত্ত্বা এবং তিনিই হচ্ছেন একমাত্র সুন্দর নামের অধিকারী। তার সৃষ্টির মধ্যে যে যতই উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হোক না কেন, আল্লাহর মর্যাদার নিকটবর্তী হওয়ার কথা ধারণাও করা যেতে পারে না। আল্লাহ্ গুণ, ক্ষমতা, শক্তি, প্রভুত্বে প্রতিপালনে, ইবাদাত, উপাসনায় তার শরিক করার কথা কল্পনা করা যায় না। তিনিই আরশের অধিপতি এবং সেখানে তিনি অধিষ্ঠিত। তাই আল্লাহ্র ঘোষণা, “তিনি সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী (রাফী’উদ্ দারাজাত) আরশের অধিপতি, তার বান্দাদের মধ্য থেকে যার প্রতি ইচ্ছা নিজের নির্দেশ রূহ্ নাযিল করেন, যেন সে সাক্ষাতের দিন (কিয়ামতের দিন) সম্পর্কে লোকদিগকে সাবধান করে দেয়। [গাফের:১৫]

১৪.১০ আল্লাহ্ই গোপন ও প্রকাশ্য সম্পর্কে জ্ঞাত  এখানে গাইব অর্থ অদৃশ্য বা গোপন যা দেখা যায় না, যা কিছু সৃষ্টিলোকের অন্তরালে লুকায়িত আছে তা গাইব। শাহাদাত অর্থ দৃশ্য বা প্রকাশ্য যা কিছু সৃষ্টি লোকের মধ্যে প্রকাশিত এবং যা কিছু সবার নিকট জ্ঞাত। আল্লাহ্ই সকল কিছুর ¯্রষ্টা, তিনি একমাত্র সৃষ্টির কৌশল সম্পর্কে অবগত, তিনিই সকল সৃষ্টির পরিকল্পনাকারী এবং রূপকার। তিনিই সৃষ্টির অনেক কিছুই মানুষের দৃষ্টি ও জ্ঞানের অগুচরে রেখেছেন, আর তার সৃষ্টির সামান্যই মানুষের দৃষ্টি এবং জ্ঞানের মধ্যে রেখেছেন। অপর পক্ষে সকল সৃষ্টিই, তা গোপন-অদৃশ্যই হোক, আর প্রকাশ্য-দৃশ্যই হোক  তার দৃষ্টি এবং জ্ঞানের মধ্যে রয়েছে। আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া-তাআলা বলেন, “তিনি আকাশসমূহ এবং পৃথিবীকে যথাযথভাবে সত্যসহকারে সৃষ্টি করেছেন এবং সেদিন (পুনরুত্থানের দিন) তিনি বলবেন, ‘হও’ তখন হয়ে যাবে (কিয়ামত-হাশর হয়ে যাবে); তার কথা সর্বাত্মক ভাবে সত্য। যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে, সেদিনের কর্তৃত্ব তো তারই। তিনিই অদৃশ্য-গোপন ও দৃশ্য-প্রকাশ্য সব কিছুর পরিজ্ঞাতা; আর তিনিই অত্যন্ত প্রজ্ঞাময় ও সর্ববিষয়ে অবহিত আলিমুল গাইবি ওয়াশ শাহাদাতি ওয়া হুয়াল হাকীমুল খবীর।’ [আনআম:৭৩]

তাবুক যুদ্ধে যারা অংশ গ্রহণ করেনি তাদের মধ্যে মদীনার এবং মরুবাসীর কিছু মুনাফিক ছিল। আর কয়েকজন সাহাবা ছিল যাদের কোনোরূপ ওযর না থাকা সত্ত্বেও তারা যুদ্ধে যোগদান করেননি। মুনাফিকরা মূলত কুফুরী করেছিল, আর তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। অপর পক্ষে যারা ঈমানদার দূর্বল, পীড়িত এবং অর্থ সাহায্যে অসমর্থ এই সব সাহাবাদের যুদ্ধ থেকে অব্যহতি দেয়া হয়েছিল। তাবুক থেকে রাসূল সা. এবং তার সৈন্যবাহিনী মদীনায় ফিরে আসলে মুনাফিক ও মরুবাসীরা নবী আ. এর নিকট যুদ্ধে না যাবার কারণ হিসাবে মিথ্যা অজুহাত ও ওযর পেশ করে। আর কিছু সংখ্যক মুনাফিক যারা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি আর ওযর পেশ করার জন্যে আসেনি তাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ বলেন, হে নবী বল, অজুহাত পেশ করনা, আমরা তোমাদের কখনও বিশ্বাস করব না; আল্লাহ্ আমাদেরকে তোমাদের খবর জানিয়ে দিয়েছেন এবং আল্লাহ্ অবশ্যই তোমাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করবেন এবং তার রাসূলও। তারপর যিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা তার নিকট তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তীত করা হবে এবং তিনি তোমরা যা করতে, তা তোমাদেরকে জানিয়ে দিবেন। [তাওবা:৯৪]

কাফির, মুশরিক এবং আখেরাত অবিশ্বাসীদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ বলেন, “আল্লাহ্ই জীবন দান করেন, মৃত্যু ঘটান এবং তার অধিকারে রাত ও দিনের পরিবর্তন। অথচ এই সব লোকেরা তা বিশ্বাস করেনা। তারা আখেরাত বিশ্বাস করেনা বরং বলে, আমাদের মৃত্যু হলে আমরা মাটি এবং অস্থিতে পরিণত হলেও কি আমরা মাটি থেকে পুনর্জীবিত হব? এই সব কাফির-মুশরিকরা বলে এই পৃথিবী এবং এতে যা কিছু আছে আল্লাহ্ই সব কিছুর মালিক; তারা বলে, আল্লাহ্ই সপ্ত আকাশ এবং মহা আরশের অধিপতি; তারা আরো বলে, সকল কিছুর কর্তৃত্ব আল্লাহ্র হাতে যিনি আশ্রয় দান করেন, যার উপরে কোনো আশ্রয়দাতা নেই। এতকিছু স্বীকার করার পরেও এই সব কাফির-মুশরিকরা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে এবং বলে যে, আল্লাহ্ সন্তান গ্রহণ করেছেন, অথচ আল্লাহ্ সকল প্রকার শরিক এবং শিরক্ থেকে মুক্ত ও পবিত্র, তিনিই একমাত্র ইলাহ্। তিনিই প্রকাশ্য এবং গোপন বিষয়ের পরিজ্ঞাতা, মুশরিকরা আল্লাহকে যার সাথে শরিক করে আল্লাহ্ তার থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। [মুমিনুন:৮৪-৯২] “তিনি আল্লাহ্ আকাশ হতে পৃথিবী পর্যন্ত সমুদয় বিষয় পরিচালনা করেন, তারপর এক দিন সমস্ত কিছুই তার সমীপে বিচারের জন্য সমুত্থিত হবে, যে দিনের পরিমাপ হবে তোমাদের হিসাবে সহ¯্র বৎসর। তিনিই অদৃশ্য এবং দৃশ্য সম্বন্ধে পরিজ্ঞাতা, পরাক্রমশীল, পরম দয়ালু। [সাজাদা:৫-৬]

কাফির-মুশরিকরা আল্লাহ্ ব্যতীত দেব-দেবীদের সুপারিশকারী হিসাবে তাদের পূজা-অর্চনা করে, অথচ আল্লাহ্ বলেন এইসব দেব-দেবীদের কোনো ক্ষমতা নেই সুপারিশ করার; কিন্তু এই মুশরিকরা এই সাধারণ বিষয়টি বুঝতে অক্ষম। অপর পক্ষে সকল সুপারিশ আল্লাহরই ইখতিয়ারে, আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সর্বময় কর্তৃত্ব আল্লাহরই, তারপর তারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। এক আল্লাহর কথা বললে মুশরিকরা আখিরাত বিশ্বাস করেনা, তাদের অন্তর বিতৃষ্ণায় সংকুচিত হয় এবং আল্লাহর পরিবর্তে দেব-দেবী নামক উপাস্যগুলির উল্লেখ করা হলে তারা আনন্দে উল্লাসিত হয়। হে মুহাম্মাদ! তাদেরকে বল, “হে আল্লাহ্ আকাশম-লী এবং পৃথিবীর ¯্রষ্টা, দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা তোমার বান্দাগণ যে বিষয়ে মতবিরোধ করে, তুমি তাদের মধ্যে এর ফয়সালা করে দিবে । [যুমার:৪৩-৪৬]

১৪.১১ খাইরুল মুতীন আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ দানকারী নবী সা. প্রত্যেক নামাযে সালাম ফিরানোর পর বলতেন: আল্লাহু আকবার (একবার); আস্তাগ্ফিরুল্লাহ্ (তিনবার)। এরপর পড়তেন:
হে আল্লাহ্, আপনি শান্তি, আপনার নিকট থেকে শান্তি আসে, হে মহা সম্মানের অধিকারী ও মর্যাদা প্রদানের অধিকারী, আপনি বরকতময়। আল্লাহ্ ছাড়া কোনো ইলাহ্ নেই, তিনি এক-অদ্বিতীয় এবং তার কোনো শরীক বা অংশীদার নেই; রাজত্ব-সার্বভৌম ক্ষমতা তারই, যাবতীয় প্রশংসা একমাত্র তারই; তিনিই সব কিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। হে আল্লাহ্! আপনি কাউকে যা দান করেন তাতে বাধা দেওয়ার কেউ নেই; আর আপনি যাকে কোনো কিছু দিতে বিরত থাকেন তাকে তা দেওয়ার মতো কেউ নেই; আপনার রহমত না হলে কারো চেষ্টা ফলপ্রসূ হবে না’।

আল্লাহ্ই হচ্ছেন একমাত্র জ্ঞান ও সম্পদ দানকারী আল-গানিয়্যু ও মাওলা। তিনি হচ্ছেন মহান উদার, মহৎ এবং সবকিছু থেকে অভাবমুক্ত সত্তা। আল্লাহ্ই সকল সৃষ্টির অভাব পুরণকারী, সম্পদের সুসম বন্টনকারী, জীবন ধারণের জন্য সকলের উদার রিযিকদাতা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ দানকারী, খাইরুল মুতীন। তার নিকট থেকেই আসে সকল প্রকার রিযিক, শান্তি এবং নিরাপত্তা। তাই প্রতিটি মুসলমান তাদের দোআয় তাদের সকল প্রকার আবেদন, নিবেদন, ফরিয়াদ, মিনতি আল্লাহর নিকট পেশ করে এই জন্যই যে আল্লাহ্ই একমাত্র দেবার মালিক, প্রয়োজন পুরণে সক্ষম সত্তা।

১৪.১২ আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ সসন্বয় বিধায়ক   হযরত নূহ্ আ. আল্লাহর নির্দেশে নৌকা তৈরি করে ঈমানদার ব্যক্তিদের নিয়ে নৌকায় আরোহণ করেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় মহা প্লাবন থেকে পরিত্রাণ পান। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ্  নূহ্ কে শিক্ষা দিলেন এবং বললেন যে, “বল, হে আমার রব! আমাকে এমনভাবে নৌকা থেকে অবতরণ করাও যা হবে আমাদের জন্য মুবারাকময়-কল্যাণময়; আর তুমিই সর্বশ্রেষ্ঠ সম্বনয়কারী, সর্বোত্তম স্থানে অবতরণকারী ওয়া আংঙতা খাইরুল মুংঙযিলিন। [মুমিনুন:২৯] সর্বশ্রেষ্ঠ সমন্বয়কারী’ আল্লাহর এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য সকল সৃষ্ট জিনিসের উপর আল্লাহর চুড়ান্ত প্রজ্ঞা, জ্ঞান, শক্তি এবং কর্তৃত্বের বহিপ্রকাশ। আল্লাহর এইসব বৈশিষ্ট্যের কারণে মুমিনগণ আল্লাহর ব্যাপারে তাদের ঈমানকে আরো প্রখর করে, তাদের মন-প্রাণ আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং আত্মসম্পর্পণ করে।

১৫. আল্লাহর আইন-বিধান   সর্বশ্রেষ্ঠ ¯্রষ্টা আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া-তাআলার অনুপম বৈশিষ্ট্য এই যে তিনি মানুষকে সবচেয়ে সুন্দর অবয়বে সৃষ্টি করে ছেড়ে দেন নি বরং তিনি  মানুষকে হিদায়েতের জন্য, সিরাতাল মুসতাকীমের উপর, দীন ইসলামের উপর চলার জন্য আইন, কানুন, নিয়ম, নীতি, আদেশ, নিষেধ, হালাল, হারাম, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী অনুপম বৈশিষ্ট্যম-িত মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাযিল করেন। আল্লাহ্ হযরত মুহাম্মাদ মোস্তাফা সা. কে নবুয়াত ও রিসালাতের পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন। রাসূল সা. তার ২৩ বছরের নবুয়াতী জীবনে রিসালাতের দায়িত্ব পালন করে বাস্তবায়ন করেছেন আল-কুরআনের সকল শিক্ষা ও আহকাম। আল্লাহর অপার ইচ্ছাই তিনি কুরআনের সকল বিধিবিধান ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করেন; স্থাপন করেছেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত; প্রতিষ্ঠিত করেছেন ইসলামি জীবন ব্যবস্থা। পরকালিন জীবনের সফলতা অর্জনের উদ্দেশ্যে আমাদেরকে ইহ্কালিন জীবনের সকল ক্ষেত্রে ও বিভাগে আল্লাহর দেওয়া আদেশ এবং নিষেধ মেনে চলা, পালন করা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে তা বাস্তবায়ন করাই হবে মুসলিম উম্মাহর সর্বপ্রধান ফরয কাজ। আল-কুরআন এবং সুন্নাহর আলোকে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ গুলি হলো:

১৫.১ আল্লাহ্ যা আদেশ করেছেন:  আল্লাহ্ আদেশ করেন, আল্লাহর প্রভুত্ত্বে প্রতিপালনে ঈমান আনা, আল্লাহর জন্য শুধুমাত্র ইবাদাত নির্দিষ্ট করা এবং তার সুন্দর নাম ও গুণাবলির উপর ঈমান আনা। আল্লাহ্ আদেশ করেন, তার উদ্দেশ্যেই সম্পূর্ণরুপে একনিষ্ঠ ও একমুখী হয়ে একমাত্র তারই ইবাদাত করা এবং ইবাদাতে আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করা। আল্লাহ্ আরো আদেশ করেন ঈমান আনার জন্যে গাইব-অদৃশ্যে, ফিরিশতায়, আসমানি কিতাবসহ আল-কুরআনে, সকল নবী-রাসূল সহ মুহাম্মাদ সা. এর উপর, পরকালের উপর, তাকদীরের ভাল-মন্দ এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর। [বাকারা:৩-৪, বাকারা:১৭৭৭, আলে ইমরান:২৫, কাসাস:৬১, ইয়াসিন:৫১, মুরসালাত:৩৯]
আল্লাহ্ আদেশ করেন, কেবলমাত্র আল্লাহর সাথে যুক্ত সকল হক-অধিকার সমূহ পুরাপুরি মেনে চলার জন্য যেমন, জ্ঞান অর্জন, পবিত্রতা সাধন, সালাত কায়েম, যাকাত প্রদান, সাওম পালন এবং হজ্জ সম্পাদন করা’। আল্লাহ্ আরো আদেশ করেন, বান্দার হক-অধিকারের সাথে যুক্ত সকল কাজ-কর্ম যেমন পারস্পরিক লেন-দেন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে পবিত্রতা রক্ষা করা, আমানাত রক্ষা করা, মিরাস-উত্তরাধিকার আইন বাস্তবায়ন করা,  পিতা-মাতার প্রতি সদয় ব্যবহার করা। [আনআম:১৫১] পারস্পরিক আচার-আচরণ, ব্যবহার-শিষ্টাচার, নৈতিকতা, মূল্যবোধ সকল পর্যায়ে নিষ্ঠার সাথে চর্চা করা; বিচার ব্যবস্থা এবং বিচার-সাক্ষ্যের মধ্যে সর্বাবস্থায় পবিত্রতা রক্ষা করা; প্রশাসনিক ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সমাজনীতি, সমরনীতি, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রনীতির মধ্যে সর্বাবস্থায় পবিত্রতা রক্ষা করা; আল্লাহ্ সৎকাজের আদেশ করেন এবং অসৎকাজের নিষেধ করেন।

আল্লাহ্ এবং বান্দার হক-অধিকারের সাথে যুক্ত কাজ-কর্মের ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ যদি বিয়ে কর তবে মোহরানা প্রদান কর এবং স্ত্রীর জন্য সম্মানের সাথে খোর-পোশের ব্যবস্থা কর। কোনো কারণে যদি স্বামী-স্ত্রী একত্রে বসবাস করা একেবারেই কঠিন-অসম্ভব হয়ে পড়ে তবে তালাক দাও আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায়; তদ্রুপ খোলা, ঈলা, ইদ্দাত পালন, এই সব বিধি-বিধানও হতে হবে আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায়। মুমিন পুরুষ এবং মুমিন নারীর প্রতি আল্লাহর আদেশ এই যে, তারা পর্দা বজায় রেখে দৃষ্টিকে সংযত করবে এবং লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। [নূর:৩০-৩১] আল্লাহ্ আদেশ করেন আল্লাহ্ নির্দেশিত পন্থায় অপরাধের শাস্তি প্রয়োগ করতে, যাতে করে সমাজ এবং দেশ থেকে অপরাধ নির্মূল হয়ে যায়। আল্লাহ্ আদেশ করেন চুরি, সশস্ত্র ডাকাতি ও লুন্ঠন, জোর করে সম্পদ অপহরণ, যিনা-ব্যাভিচার এবং মদ্য পানের মত অপরাধের শাস্তির বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে, যাতে করে সমাজ এবং দেশ থেকে এই সব অপরাধ সমূলে নির্মূল হয়ে সর্বাবস্থায় শান্তি বিরাজ করে।

১৫.২ আল্লাহ যা হারাম বা নিষেধ করেন- আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া-তাআলা তার সৃষ্ট কিছু বস্তু এবং কিছু কাজকে হারাম করেছেন শুধুমাত্র মানুষের কল্যাণের জন্যে। আল-কুরআনে আল্লাহ্ হারাম বিষয়গুলিকে খুব স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন এবং নবী মুহাম্মাদ সা. তার ২৩ বছরের নবুওতি জীবনের  মাধ্যেমে তা বাস্তবায়ন করেন। যেইসব  বস্তু এবং কজাগুলি হারাম তা হলো,

আল্লাহ্ নিষেধ-হারাম করেন, “আল্লাহ্ হারাম করেন তার সাথে কাউকে শরিক করা। [আনআম:১৫১] নিষেধ করেন যুলুম, কুফুরী, মুনাফেকি ফাসেকী, তাগূতী, বিদ’য়াত, হাওয়া (খেয়াল-খুশী-কুপ্রবৃত্তি), অন্যায়-অবিচার, জাহিলিয়াতের কুসংস্কার, অতি-প্রাকৃতিক অযৌক্তিক অন্ধবিশ্বাস। নিষেধ করেন বেশী বেশী ধারণা-অনুমান করা থেকে; কেননা কিছু কিছু ধারণা-অনুমান মিথ্যা ও পাপ এবং তা সর্বাবস্থায় হারাম। আল্লাহ্ হারাম করেন মুখ ও জিহ্বার সাথে যুক্ত কথা যেমন, একে অপরকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ-অপমান করা, কাউকে মন্দ নামে ডাকা, কারো নামে গীবত করা যাতে তার মান-সম্মানের ক্ষতি হয়, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা তথ্য দেওয়া, চোগলখোরী করা, নিরাপরাধ মুমিন নারী ও পুরুষকে কথার মাধ্যমে কষ্ট ও পীড়ন করা এবং অন্যায় ভাবে তাদের চরিত্রের অপর মিথ্যা দোষারোপ করা । [নূর:২৩]

আল্লাহ্ আরো হারাম করেন: “নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করা । [আনআম:১৫১, আরাফ:৩৩] আত্মহত্যা করা, দারিদ্রের ভয়ে সন্তানদেরকে হত্যা করা। [আনআম:১৫১] ইসলাম গ্রহণ করার পর দীন-ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, চুরি-ডাকাতি-লুন্ঠন-অপহরণ-রাহাযানী করা, অন্যায়ভাবে অপরের সম্পদ ভক্ষণ করা, অপব্যায়-অপচয় করা, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অশ্লীলতার নিকট যাওয়া। [আনআম:১৫১, আরাফ:৩৩]
বিনা অনুমতিতে কারো ঘর-বাড়িতে প্রবেশ করা। [নূর:২৭] মানুষের গোপন বিষয় অকারণে জানা, যেনা-ব্যভিচার করা, নারী ধর্ষণ করা, দুই আপন বোনকে একই সংগে বিয়ে করে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করা, মুমিন পুরুষের জন্য মুশরিক নারী বিয়ে করা, তদরূপ মুমিন নারীর জন্য মুশরিক পুরুষ বিয়ে করা, একই সংগে চারের অধিক স্ত্রী রাখা, মাসিক ¯্রাব চলা কালীন স্ত্রী মিলন করা, দীন-ইসলামের সাথে যারা শত্রুতা ও যুদ্ধ করে তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করা”। আল্লাহ্ হারাম করেন: “মৃত জন্তুর মাংস, প্রবাহিত রক্ত, শুকুরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো নামে জবাইকৃত জন্তুর মাংস, মদ ও সমস্ত নেশা-মাদক জাতীয় দ্রব্য”।

আল্লহ্ নিষেধ করেন, “ব্যবসা-বাণিজ্যে ঠগ-বাজী করা, ওজনে কম করা, মদ ও সকল হারাম জিনিসের ব্যবসা করা, মাদক দ্রবের ব্যবসা করা, সুদের ব্যবসা করা, ঘুস নেওয়া-দেওয়া করা, বেশ্যাবৃত্তিকে ব্যবসা হিসাবে গ্রহণ করা, মুমিনদের জন্য ব্যভিচারী-ব্যভিচারিণী-মুশরিক নারী-পুরুষকে বিয়ে করা, জুয়ার ব্যবসা করা, পাশা-তীর দ্বারা ভাগ্য গণনা করা, ব্যবসায়ী পণ্যে ভেজাল মিশানো, প্রতারণা করা, আল্লাহ্ ছাড়া কারো নামে হলফ-কসম করা ইত্যাদি। বুখারী শরীফে ইব্ন ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উমর ইব্ন খাত্তাব রা. কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম আমাকে বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ্ তাআলা তোমাদের পিতা ও পিতামহের নামে হলফ-কসম করতে নিষেধ করেছেন। উমর রা. বলেন, আল্লাহর কসম, যখন থেকে আমি রাসূলুল্লাহ্ সা. কে এ কথা বলতে শুনেছি, তখন থেকে আমি স্বেচ্ছাই বা ভুলক্রমে তাদের নামে হলফ-কসম করিনি। বুখারি শরীফে আবদুল্লাহ্ ইব্ন ওমর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের পিতা-পিতামোহগণের নামে হলফ-কসম করো না’।

১৬. আল্লাহর রহমত, দয়া, অনুগ্রহ ও অনুকম্পা   আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া-তাআলার অনুপম বৈশিষ্ট্য এই যে তিনি তার সকল সৃষ্টির প্রতি দয়া ও রহমত করাকে নিজের উপর কর্তব্য বলে স্থির করেছেন। আল্লাহ্ অনুগ্রহশীল বিশ্বজাহানের প্রতি, সমস্ত অনুগ্রহ আল্লাহরই হাতে, আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা নিজ রহমতের জন্যে বিশেষভাবে মনোনীত করেন, যাকে ইচ্ছা তার অনুগ্রহ প্রদান করেন, আল-কুরআন আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে ও রহমতে নাযিলকৃত নিয়ামত, নিশ্চয় আল্লাহ্ মানুষের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণশীল, যারা আল্লাহকে ভয় করবে তার জন্য সমুদয় কল্যাণ, আল্লাহর অনুগ্রহ ও রাহমাত না থাকলে আল্লাহর শাস্তি থেকে কেউই অব্যাহতি পাবে না,  নিজ অনুগ্রহে আল্লাহ্ মুমিন ও মুত্তাকিদের হিদায়েতের পথে পরিচালিত করেন, দান করেন পূর্ণ পুরস্কার।

আল্লাহ্ মুমিনদের উদ্দেশ্যে শয়তান সম্পর্কে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। কেউ শয়তানের পদাংক অনুসরণ করলে শয়তান তো অশ্লীলতার ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়। আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তোমাদের কেউই কখনও পবিত্র হতে পারবে না, তবে আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা পবিত্র করে থাকেন এবং আল্লাহ্ সবশ্রুতা, সর্বজ্ঞ। [নূর:২১] আল্লাহ্  তার বান্দাদের প্রতি এতটায় অনুগ্রহশীল এবং দয়ার্দ্র যে তিনি নিজেই বান্দাকে শিখিয়ে দিচ্ছেন তার নিকট দোআ করার পদ্ধতি এই ভাবে যে, “হে আমাদের রব! আমাদেরকে সরল-সঠিক পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে বক্র করবেন না; আর আমাদের দান করুন আপনার তরফ থেকে রহমত। আপনি তো মহাদাতা । [আলে ইমরান:৮]

আল্লাহ্ তিনি এমন এক সত্তা যিনি আকাশ ও যমীনের গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছুর খবর জানেন। অতীতের সম্প্রদায়েরা আল্লাহর প্রদত্ত্ব সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে, নবী-রাসূলদেরকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছে, নবী-রাসূলদের নিকট ফিরিশতা নাযিল না হলে তাঁদেরকে নবী-রাসূল বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। পরিণামে আল্লাহ্ তাদের এইসব হঠকারিতা ও অবিশ্বাসের কারণে তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এইসব ধ্বংলীলার ধ্বংসাবশেষ এখনো পৃথিবীতে দেখা যায়। আল্লাহ্ এই সব অতীত কাহিনী বর্ণনা করে নবী সা. কে বলছেন, “বল, আকাশ ও যমীনের যা কিছু আছে তা কার? বল, আল্লাহরই”। আল্লাহ্  তার নিজের উপর তার বান্দাদের প্রতি দয়া-রহমত করা কর্তব্য বলে স্থির করে নিয়েছেন। [আনআম:১২] এই কারণে আল্লাহ্ তাআলা তার আইন অমান্যকারী এবং আল্লাহদ্রোহীদের সংগে সংগে শাস্তি দেন না, তাদেরকে কিছুকালের জন্য অবকাশ দেন। এইসব যালিম ব্যক্তিদেরকে তাদের রবের নিদর্শন স্মরণ করিয়ে দিলেও তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা সকল অসৎকর্ম ভুলে যায়, সৎপথে আহ্বান করলেও তারা সৎপথে আসেনা। এরপরও পরম ক্ষমাশীল, দয়াবান-রহমান তাদের কৃতকর্মের জন্যে সাথে সাথে পাকড়াও করেন না । [কাহাফ:৫৮]

আল্লাহ্ ঘোষণা করেন, হে মুহাম্মাদ! “বল, হে আমার বান্দাগণ , তোমরা যারা নিজেদের প্রতি বাড়াবাড়ি-অন্যায়-অবিচার-জুলুম করেছো, তোমরা আল্লাহ্র রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ সমুদয় গুনাসমূহ মাফ করে দিবেন। নিশ্চয় তিনিই তো ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। [যুমার:৫৩] এরপর আল্লাহ্  তার বান্দাদেরকে তার অনুগত হয়ে তার দিকে ফিরে আসার জন্য আহ্বান করছেন, উপদেশ দিচ্ছেন আল্লাহর কিতাবের উত্তম কাজের অনুসরণ করার দিকে, তারা যেন ফিরে আসে এবং অনুসরণ করে যে কোনো শাস্তি আসার পূর্বেই, কেননা আল্লাহ্ পক্ষ থেকে শাস্তি এসে গেলে তারা আর কোনো দিক থেকে সাহায্য পাবে না । [যুমার:৫৪-৫৫]

বুখারী শরীফে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুশরিকদের কিছু লোক অত্যধিক হত্যা করে এবং অত্যধিক ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। তারপর তারা মুহাম্মাদ সা. এর কাছে আসে এবং বলে, আপনি যা বলেন এবং আপনি যেদিকে আহ্বান করেন তা অতি উত্তম। আমাদের যদি জানিয়ে দিতেন আমরা যা করেছি, তার কাফ্ফারা কি? এর প্রেক্ষিতে নাযিল হয়, “এবং যারা আল্লাহর সংগে অন্য কোনো ইলাহ্ ডাকে না, আল্লাহ্ যাকে হত্যা করা নিষেধ করেছেন, তাকে না-হক হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না, আরো নাযিল হল, “হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অন্যায় করে ফেলেছো, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না । [যুমার:৫৩]

১৭. আল্লাহ্ হিদায়েতের জন্য আল-কুরআন অবতীর্ণ করেছেন   আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত জিবরীল আ. এর মাধ্যমে আল-কুরআন নামক আসমানি কিতাব মুহাম্মাদ সা. এর উপর নাযিল হওয়া একটি বিস্ময়কর, আশ্চর্যজনক এবং ঈমানদারদের জন্য অতি বড় অনুগ্রহ। আল্লাহ্র বড় অনুগ্রহ এবং রহমত যে তিনি স্পষ্ট আহ্কাম-বিধান সম্বলিত, সতর্ককারী এবং সুসংবাদ সরূপ মুত্তাকীদের জন্য রহমত ও হিদায়েত সরূপ মহাসম্মানিত আল-কুরআন নাযিল করেন। আল্লাহ্ ঘোষণা করেন, “এই আল-কুরআন একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার উপর নাযিল করেছি, যা পূর্বেকার কিতাবের সত্যায়নকারী এবং তা এই উদ্দেশ্যে নাযিল করেছি যে এর সাহায্যে তুমি জনপদসমূহের এই কেন্দ্র (কাবা) এবং তা চারপাশের অধিবাসীদেরকে সতর্ক ও সাবধান করবে। যারা পরকাল বিশ্বাস করে তারা এই কিতাবের উপর ঈমান রাখে, আর তারা নিজেদের সালাত সমূহের হিফাজত করে । [আনআম:৯২]

আল্লাহর আরো ঘোষণা, “এমনিভাবে আমরা এই বরকতময় কিতাব কুরআন নাযিল করেছি। অতএব তোমরা তার অনুসরণ করে চল এবং তাকওয়াপূর্ণ ও সাবধানতার নীতি-আচরণ গ্রহণ কর, সম্ভবতঃ তোমাদের প্রতি রহমত প্রর্দশন করা হবে। [আনআম:১৫৫] আল্লাহর ঘোষণা: “হে মুহাম্মাদ! তোমার প্রতি যে অহী নাযিল করা হয়েছে, তা থেকে তুমি তিলাওয়াত করে শুনাও; তার কিতাবের বাণীর কোনো রদবদল করার কেউ নেই; তুমি তাকে ছাড়া আর কাউকে তোমার আশ্রয়স্থল হিসাবে পাবেনা। [কহাফ:২৭] “হে মুহাম্মাদ বল, তোমার রবের নিকট থেকে রূহুল-কুদুস সত্যসহকারে কুরআন নাযিল করেছে, যারা মুমিন তাদেরকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য এবং হিদায়েত ও সুসংবাদ স্বরূপ মুসলিমদের জন্য। [নাহাল:১০২] উপরক্ত আয়াত দ্বারা আল্লাহ্  নিজেই সত্যায়ন করছেন যে এই বরকতময়  কুরআন আল্লাহ্র নিকট থেকে অবতীর্ণ।

আল-কুরআন এমন একটি ঐশী কিতাব যা পূর্বে অবতীর্ণ সকল ঐশী কিতাবের সত্যায়নকারী, সমর্থনকারী এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অতিবড় গুরুত্বপূর্ণ স্পষ্ট নিদর্শন। আল্লাহ্ কুরআনকে নাযিল করেছেন সহজ করে উপদেশ গ্রহণ করার জন্য; ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-দেশ থেকে সব রকমের জাহিলিয়াত, পঙ্কিলতা, মিথ্যা, অন্যায় এবং অপবিত্রতা দূর করার জন্য। কুরআন হচ্ছে ‘সত্য-মিথ্যা’, ‘হক-বাতিল’, ‘মুমিন-কাফির’ এবং ‘ন্যায়-অন্যায়’ এর মধ্যে পার্থক্যকারী হিদায়েতের মহা উৎস, ইহ্কালীন ও পরকালীন কল্যাণের মাধ্যম এবং মানব জীবনের মূল্যবোধের প্রেরণা। ঈমান ও আমলে সালেহা-সৎকর্ম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করার প্রধান উৎস হচ্ছে ঐশী গ্রন্থ আল-কুরআন এবং নবী মোস্তাফা সা. এর সুন্নাত পদ্ধতিতে কুরআনের সকল শিক্ষাকে বাস্তবায়ন করাই হচ্ছে প্রধান ফরজ কাজ।

আল-কুরআন সত্যরূপে সুস্পষ্টরূপে নির্দেশ দেয় ঈমান আনার, নির্দেশ দেয় সকল প্রকার আহকাম ও আদেশ পালনের। আদেশ করে সকল প্রকার হালাল গ্রহণের, নিষেধ করে সকল প্রকার হারাম থেকে বেঁচে থাকতে, আর নিশ্চিত করে আল্লাহ্ ও বান্দার অধিকার আদায়ের। শিক্ষার জন্য বর্ণনা করে নিদর্শন, দৃষ্টান্ত, উদাহরণ, রূপক এবং বর্ণনা করে অতীত, চলমান ও ভবিষ্যৎ ঘটনাবলি। আল্লাহ্ তার কিতাব আল-কুরআন এর মাধ্যমেই আমাদের দীন-জীবন ব্যবস্থাকে পূর্ণাঙ্গ করেছেন, তার সকল নিয়ামত সম্পূর্ণ করেছেন এবং ইসলামকে আমাদের জন্য দীন হিসাবে মনোনীত করেছেন। আল-কুরআন নাযিল হয়েছে নবী মোস্তফার সা. উপর, একমাত্র তার ব্যাখ্যা,  অনুকরণে ও অনুসরণের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে; মুসলিমানের ঘরে বাস্তবায়ন করবে সৎকর্ম এবং গড়ে তুলবে ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক পবিত্র জীবন ব্যবস্থা।

১৮. আল্লাহ্ সুপারিশ বা সাফায়াত গ্রহণ তার ইখতিয়ারে  শেষ বিচারের দিন আল্লাহ্ তার অনুগ্রহ এবং অসীম দয়ার মাধ্যমে তার মনোনীত বান্দাদের সুপারিশ বা শাফায়াত গ্রহণ আল্লাহর বৈশিষ্ট্য সমূহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ্ সুপারিশ-শাফায়াত গ্রহণ করবেন এবং আশা করা যায় যে আল্লাহ্ এই সুপারিশের ভিত্তিতে তার অনেক বান্দাদের ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ্ নবী-রাসূল থেকে শুরু করে সিদ্দিক, শহীদ, নেককার সালেহীন ব্যক্তিদের সুপারিশ করার অনুমতি দান করবেন। আশা করা যায় যে, আল্লাহ্ যাঁদেরকে সুপারিশ-শাফায়াত করার অনুমতি দিবেন, তাঁদের শাফায়াত আল্লাহ্ গ্রহণ করবেন। আল্লাহ্ সুপারিশ বা শাফায়াত গ্রহণ করবেন যাঁকে আল্লাহ্ শাফায়াত করার অনুমতি দিবেন। যার ব্যাপারে আল্লাহ্ অনুমতি দিবেন শুধুমাত্র তার পক্ষেই শাফায়াত করা যাবে, অন্য কারো জন্য নয়।

অন্যদিকে অপরাধীদের জন্য শাফায়াত কোনো কাজে আসবে না। কিয়ামতের দিন অপরাধীদের জন্য কেউ শাফায়াত করতে পারবেনা। আল্লাহর ঘোষণা, ‘দয়াময়-রহমান যাকে অনুমতি দিবেন ও যার কথা তিনি পসন্দ করবেন সে ব্যতীত কারো সুপারিশ-শাফায়াত কিয়ামতের দিন কোনো কাজে আসবেনা । [তহা:১০৯] আল্লাহ্  সুব্হানাহু ওয়া-তাআলা বহু রাসূল প্রেরণ করেছেন, ওহী প্রাপ্ত এইসব রাসূলগণের দাওয়াত ছিল, ‘হে আমাদের সম্প্রদায়, আল্লাহ্ ব্যতীত কোনো ইলাহ্ নেই, সুতরাং তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর’। কিন্তু মুশরিকদের অধিকাংশ রাসূলগণের দাওয়াতকে প্রত্যাখান করেছে, বলেছে দয়াময়-আল্লাহ্ ফিরিশতাদের সন্তান হিসাবে গ্রহণ করেছেন। অথচ আল্লাহ্ পবিত্র, মহান; আর ফিরিশতারা তো তার সম্মানিত বান্দা। এইসব ফিরিশতারা আগে বেড়ে কথা বলে না বরং তারা আল্লাহর আদেশ অনুসারেই সকল কাজ সম্পাদন করেন। আল্লাহ্  জানেন এইসব ফিরিশতাদের সামনে ও পিছনে কি আছে। এইসব ফিরিশতারা আল্লাহর সমীপে শুধু সেসব লোকদের জন্যেই কোনো সুপারিশ করে ও করবে যাদের প্রতি আল্লাহ্ তাআলা সন্তুষ্ট রয়েছেন; ফিরিশতারাও সব সময় আল্লাহর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে । [আম্বিয়া:২৫-২৮]

বনী ইসরাইলকে লক্ষ করে আল্লাহ্ ঘোষণা করছেন, ‘তোমরা সেই কিয়ামতের দিনকে ভয় কর যেদিন কেউ কারো কোনো উপকারে আসবেনা, কারো নিকট থেকে কোনো বিনিময় গৃহিত হবেনা এবং কোনো সুপারিশ কারো পক্ষ থেকে লাভজনক হবেনা এবং তারা সাহায্য প্রাপ্ত হবেনা। [বাকারা:১২২-১২৩] আল্লাহ্র ইবাদাত থেকে পলায়নকারীদের আখিরাতে কোনো পৃষ্ঠপোষক, সাহায্যকারী এবং শাফায়াতকারী থাকবেনা। আল্লাহর ঘোষণা: ‘হে মুহাম্মাদ সা., তুমি কুরআন দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করে দাও যারা ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের রবের নিকট সমবেত করা হবে এমন অবস্থায় যে আল্লাহ্ ব্যতীত তাদের কোনো অভিভাবক বা সুপারিশ করার কেউ থাকবে না। [আনআম:৫১]

কিয়ামতের দিন মুশরিক এবং অপরাধিগণ হতাশ হয়ে পড়বে, তাদের শরিকদের(দেব-দেবী-উপাস্যরা) কেউই তাদের জন্য সুপারিশকারী হবেনা, বরং তখন তারা তাদের এ শরিক করার ঘটনাই অস্বীকার করবে। [যুমার:১৩] আল্লাহ্  কিয়ামতের দিন মুশরিক-অবিশ্বাসীদের এবং তাদের মা’বুদদের একত্রিত করবেন, সেদিন এই দেব-দেবী বলবে, ‘হে আল্লাহ্, তুমি পবিত্র ও মহান, আমরা তো ছিলাম তোমার বান্দা, এই মুশরিকরা ভোগের সামগ্রী পেয়ে তোমার কথাই ভুলে গেছে। আর এই ভাবে তাদের মা’বুদদেরা তাদের বিরুদ্ধে উল্টো তাদেরকে অপরাধি সাবস্থ্য করবে । [ফুরকান:১৭-১৮]

১৯. আল্লাহর যা পছন্দ করেন এবং যা দেখে তিনি আনন্দিত হন   আল্লাহর ঘোষণা, ‘যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তারাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। তাদের রবের নিকট আছে তাদের পুরস্কার স্থায়ী জান্নাত যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আল্লাহ্ তাদের প্রতি রাযি-খুশি এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এই সব কিছুই তার জন্য যে সে নিজের রবকে ভয় করেছে। [বায়্যিনাহ:৭-৮]
হুদায়বিয়ায় যখন নবী সা. তার সাহ্বাাগণ উমরা করার জন্য অবস্থান করছিলেন, তখন মক্কার মুশরিকদের সংগে আলোচনার জন্য হযরত উসমান ইব্ন আফ্ফান রা. কে রাসূল সা. তার দূত হিসাবে মক্কায় প্রেরণ করেছিলেন। এরি মধ্যে গুজব রটে যে উসমান রা. কে মক্কার মুশরিকরা তাকে হত্যা করেছে। উসমান রা. এর হত্যার বদলা গ্রহণের জন্য মুহাম্মাদ সা. এর আহ্বানে সাহাবাগণ জিহাদের বায়আত গ্রহণ করেন। এই বায়আত ইতিহাসে ‘বাআতুর রিদওয়ান’ নামে খ্যাত। এরি পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘আল্লাহ্ তো মুমিনদের উপর সন্তুষ্ট হলেন যখন তারা বৃক্ষতলে তোমার (নবী সা. এর) নিকট বায়আত গ্রহণ করল, তাদের অন্তরে যা ছিল তা তিনি অবগত ছিলেন; তাদেরকে তিনি দান করলেন সাকীনাহ্ প্রশান্তি  এবং তাদেরকে পুরস্কার দিলেন আসন্ন বিজয়ের অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের । [ফাতাহ:১৮]

আল্লাহ্ পছন্দ করেন ঐসব মুমিনদেরকে যারা আল্লার্হ পথে যুদ্ধ করে এবং আল্লাহ্কে করযে হাসানা বা নিঃস্বার্থভাবে ঋণ প্রদান করেন। আল্লাহ্ তার জন্য তাদের দানকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে দিবেন। [বাকারা:২৪৪-২৪৫] হযরত তালুতের অধিকাংশ সৈনবাহিনী তার হুকুম অমান্য করে নদী পার হওয়ার সময় তার কঠোর নিষেধ থাকা সত্ত্বেও পানি পান করে তালুতের নাফারমানি করে এবং দলছুট হয়ে যায়। অল্পসংখ্যক সৈনবাহিনী নিয়ে তালুত যখন শত্রু বাহিনী জালুতের বিরুদ্ধে এগিয়ে যায় তখন তাদের একাংশ বলে যে জালুত ও তার সৈনবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মত শক্তি তাদের নেই। কিন্তু যেসব ঈমানদাদের বিশ্বাস ছিল যে, তাদের একদিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাত হবে, তারা বলল, ‘আল্লাহর হুকুমে কত ক্ষুদ্র দল কত বৃহৎ দলকে পরাভূত করেছে। তারা ধৈর্য ধারণ করল এবং আল্লাহ্র সাহায্য চাইল, আল্লাহ্ তাদেরকে সাহায্য দান করলেন এবং আল্লাহর হুকুমে দাউদ আ. জালুতকে হত্যা করল। [বাকারা:২৪৯-২৫১] আর এই ভাবে ঈমানদারদের ঈমান দেখে আল্লাহ্  আনন্দিত হন এবং ঈমানদারদের দলকে বিজয় দান করেন।
লেখক : ডক্টর, গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight