আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে! মীম হাবিবী

গল্প শুধু গল্প নয়, শুধু পড়ে যাবার বিষয় নয়, গল্পের পেছনে একটা ছায়া থাকে, সেটা আমাদের পথ দেখায়। রূপকথা শুধু চুপকথা নয়, শুধু শুনে যাবার বিষয় নয়, সেখানে একটা প্রেরণা থাকে, থাকে পথ-নির্দেশনা। কাহিনী শুধু কাহিনী নয়, নতুন পথ নির্মাণের বাহিনীও, সংকট উত্তরণের মূলমন্ত্রও। যুগে যুগে এই যে এতো গল্প, এতো কাহিনী, এতো রূপকথা রচিত হয়েছে, সবগুলোর পেছনে একটা মেসেজ, একটা বার্তা প্রেরণের উদ্দেশ্য অবশ্যই ছিলো। এবং এখনও যে রচিত হচ্ছে তারও একটা বার্তা অবশ্যই আছে। রচয়িতারাও একটা মেসেজ অবশ্যই দিতে চান পাঠকের কাছে।
পঞ্চম শ্রেণিতে আমাকে বাংলা পড়াতে হয়। সেখানে একটি গল্প আছে, “হাতি আর শেয়ালের গল্প” । গল্পটা এরকম, এক বনে পশু পাখিরা খুব সুখে বসবাস করত, শান্তিতে তাদের রাতগুলি-দিনগুলি অতিবাহিত হত। হঠাৎ একদিন একটা মস্ত বড় হাতি কোত্থেকে এসে ঢুকে পড়ল বনে। হাতিটা বনে ঢুকেই সেই বনের পশু-পাখিদের উপর অত্যাচার শুরু করে দিল। যাকেই সামনে পায়, কোনো কারণ ছাড়াই, তার উপর হামলে পড়ে। নির্যাতন করে। ফলে বনে সবাই তার ভয়ে তটস্থ। হাতির বিরুদ্ধে কেউ টুঁ শব্দ করে না। এমন কি বনের যারা শক্তিশালী প্রাণি, বাঘ-সিংহ, এরাও টুঁ শব্দ করে না হাতিটার বিরুদ্ধে। এই জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে দুই কথা বলে না। প্রতিবাদে জ্বলে ওঠে না। বনের অন্য পশু-পাখিরা সবাই অস্থির। তারা ভেবে কুল পায় না, কি করবে! কীভাবে এই মত্ত হাতির নাগপাশ থেকে মুক্তি পাবে!! কী তাদের মুক্তির পথ ও পন্থা! শেষে একদিন তারা সবাই সিংহের গুহায় আসে। শলাপরামর্শ করে। এবং সবাই মিলে শিয়ালকে দায়িত্ব দেয়। শেষ পর্যন্ত শেয়াল বুদ্ধি খাটিয়ে হাতিটাকে নদীতে ডুবিয়ে মারে। তখন বনের সব পশু-পাখি হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। জুলুমের নাগপাশ থেকে মুক্তি পায়।
তো এই যে গল্প, গল্পটা পড়ানোর পর আমি ছেলেদেরকে প্রশ্ন করি গল্পের শিক্ষাটা কী? মেসেজটা কী? এই গল্পটি আমাদের কী শিক্ষা দেয়? ছাত্ররা একেকজন একেক কথা বলে। একেকভাবে গল্পটা ব্যাখ্যা করে। গল্পের শিক্ষাটা বলার চেষ্টা করে। মেসেজটা তুলে আনতে চেষ্টা করে। ছেলেদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুনবার পর আমি তাদের বলি: এই যে এই গুমোট সময়, বোবা-কাল আমরা যাপন করছি, মুখে হাত দিয়ে বোবা হয়ে বসে আছি, বক্ষের বদ্ধ ঘরে আমাদের কান্নারা গুমরে মরে; কিন্তু আমরা প্রকাশ করছি না। করতে পারছি না। আমার দেশের সম্পদে ডাকাতরা হামলে পড়ে, লুটে-পুটে খায়; আমরা কিছু বলি না, বলছি না, বলতে পারছি না। আমার দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করছে, নিঃস্ব করে ফেলছে; কিন্তু আমরা টুঁ শব্দটিও করছি না, করতে পারছি না। ওই বনের পশুদের মতো আমরা তটস্থ। ভীত। সন্ত্রস্থ।
তো এই যে বোবা-সময়, এটা কী উদ্ধার-রহিত? ওই গল্পটি আমাদের সংকট উত্তরণের পথ নির্মাণ করে। পথ দেখায়। গল্প থেকে আমরা সমাধানে পৌঁছতে পারি না, উদ্ধার-রহিত নয়। কোনো সমস্যাই সমাধান-হীন নয়। প্রত্যেক সমস্যারই সমাধান আছে। কিন্তু সমাধানের জন্য আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। আমাদেরকেই জেগে উঠতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ওই গল্পে যেমন বনের সব পশু এক হয়ে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এসেছিল, সমস্যার সমাধান করেছিল, তেমনি আমরাও যদি একতাবদ্ধ হই, তাহলে এই অন্ধকার, এই তমাল, এই তিমির রাত্রি কেটে যাবে। আমাদের জীবনে আসবে তখন নতুন ভোর। ঝলমলে নতুন সকাল। আমার দেশ আবার নতুন আলোয় উজ্জ্বল হবে। হেসে উঠবে।
জালেমের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হওয়া, জুলুম প্রতিহত করা, ইসলামের শিক্ষা। সীরাতের শিক্ষা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা। আসলে প্রতিটি সমস্যার সমাধান ইসলামে রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাতে রয়েছে। কিন্তু সমস্যার সমাধানের জন্য আমরা ইসলামের কাছে যাই না, সীরাতুন্নবীর দ্বারস্থ হই না। তাই আমাদের তিমির রাত্রির আর অবসান হয় না। আমাদের জীবনে তাই আসে না নতুন ভোর।
যাবিদ গোত্রের এক লোক মক্কায় এলো। কিছু জিনিস বিক্রয় করার জন্য। আ’স বিন ওয়ায়েল নামক এক লোক তার কাছ থেকে একটা জিনিস ক্রয় করল। কিন্তু টাকা দিলো না। অস্বীকার করল টাকা দিতে। তখন যাবিদ গোত্রের লোকটি অনেক চেষ্টা-তদবির করলো। মক্কার অনেক মান্যগণ্য ব্যক্তির কাছে গেলো। অনেক কাকুতি-মিনতি করলো। কিন্তু কেউই কর্ণপাত করলো না। তার কথা শুনলো না। আমলে নিল না তা কেউ-ই। শেষ পর্যন্ত লোকটি, আরবের একটি প্রাচীন প্রথামতে, পরদিন সূর্য উদিত হবার সময় আবু খুবাইস পাহাড়ের উঠে উচ্চৈঃস্বরে নিজের অভিযোগের কথা, সমস্যার কথা বলল।
মক্কাবাসীরা তখন সাধারণত কাবা ঘরের পাশে বসে থাকত। এই ফরিয়াদ মক্কার লোকদের ছোঁবল মারল। আবু খুবাইসে উঠে ফরিয়াদের কথা বললে তা আরবদের আঁতে ঘা লাগত। তাদের মান-সম্মানে লাগত। এখনও তার ব্যতিক্রম হলো না। এবার সবাই নড়েচড়ে বসল। যুবাইর বিন আবদুল মুত্তালিব উঠে গেল। মক্কার সম্ভ্রান্ত লোকদের একত্রিত করল আবদুল্লাহ বিন জাদআনের বাড়িতে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও ছিলেন সেখানে। একটা সংঘঠন করলেন এবং সবাই এই কথার উপর শপথ করলেন যে, আমরা কারো প্রতি জুলুম করব না। মজলুমকে তার হক দিয়ে দেব। তারপর আ’স বিন ওয়ায়েল থেকে জিনিসটা নিয়ে লোকটির কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলো।
সেই সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স ছিলো বিশ বছর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সংঘের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। কাকতালীয়ভাবে সেই সময়, সেই শপথ অনুষ্ঠানে মক্কার সম্ভ্রান্ত লোকদের মধ্যে ‘ফযল’ নামে তিনজন লোক ছিলো। তো এই তিন ফযলের দিকে সম্বন্ধ করে এই সংঘের নামকরণ করা হলো “হিলফুল ফুযুল” ফযলদের শপথ। [পায়গামে সীরাত মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ রহমানী, ৭৪-৭৫ পৃষ্ঠা।]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়ত প্রাপ্তির পরে এই সংঘের কথা প্রায়ই বলতেন। বলতেন, আজও যদি কেউ আমাকে সেদিকে, সেই সংঘের দিকে, আহ্বান করে, আমি অবশ্যই তাতে সাড়া দেব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই কথা থেকে বোঝা যায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। প্রতিরোধের পাহাড় গড়ে তুলতে হবে। চুপ করে বসে থাকলে চলবে না। এবং সেই প্রতিরোধ সংঘে যদি কেউ ডাকে, অবশ্যই সাড়া দিতে হবে। এটা ইসলামের শিক্ষা। সিরাতুন্নবীর শিক্ষা।
আমাদের জাতীয় কবি, প্রাণের কবি, কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের মনের কথাটি কত চমৎকারভাবেই না বলেছেন “আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে”!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight