আপ কী আমানত আপ কী সিওয়া মেঁ / মাওলানা কলিম সিদ্দিকি : এই নিন আপনার আমানত / অনুবাদ : আবদুস সাত্তার আইনী

কিছু কথা

একটি ছোটো শিশু খালি পায়ে হেঁটে আসছে। সে আগুনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার কচি দুটি পা আগুনে পড়তে যাচ্ছে। আপনি সব দেখছেন। এখন আপনি কী করবেন?
আপনি তৎণাৎ ছুটে গিয়ে শিশুটিকে কোলে তুলে নেবেন এবং তাকে আগুন থেকে বাঁচাতে পেরে বিপুল আনন্দ অনুভব করবেন।
তেমনি কোনো মানুষ যদি আগুনে ঝলসে যায় বা আগুনে পুড়ে যায়, আপনি তা দেখে অস্থির হয়ে পড়বেন। মানুষটির জন্য আপনার হৃদয়ে সমবেদনা জেগে উঠবে।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন—এমন কেনো হয়? কারণ পৃথিবীর সব মানুষ এক বাবা-মা আদম-হাওয়ার সন্তান। তাছাড়া প্রত্যেক মানুষের বুকেই আছে হৃদয়। হৃদয়ে আছে প্রেম-ভালোবাসা-সমবেদনা। তাই মানুষ অন্যের দুঃখ-বেদনায় বিচলিত হয় এবং তাকে সাহায্য করে সুখ অনুভব করে। প্রকৃত মানুষ তো সেই যাঁর হৃদয়ে আছে সমগ্র মানবতার জন্য প্রেমময় আবেগ; তাঁর প্রতিটি কাজ মানুষের সেবার জন্য এবং তিনি যেকোনো মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে ওঠেন। তিনি মানবতার সেবাকে তাঁর জীবনের প্রধান আবশ্যক কর্তব্য বিবেচনা করেন।
এই পৃথিবীতে মানুষের জীবন ণস্থায়ী। মৃত্যুর পর আরো এক জীবন আছে। সে-জীবন অন্তহীন ও চিরস্থায়ী। প্রকৃত মালিকের বন্দেগি ও আনুগত্য না করে মৃত্যুবরণ করলে পরকালে জান্নাত পাওয়া যাবে না। বরং তাকে চিরকালের জন্য জাহান্নামের উন্ধন হয়ে জ্বলতে হবে।
আজ আমাদের লাখ-লাখ কোটি-কোটি ভাই না বুঝেই জাহান্নামের ইন্ধন হওয়ার প্রতিযোগিতায় ছুটছে। তারা সেসব পথেই দৌড়াচ্ছে যেগুলো সোজা জাহান্নামের সঙ্গে গিয়ে মিশেছে। যাঁরা আল্লাহর জন্য মানুষকে ভালোবাসেন এবং প্রকৃত মানবতায় বিশ্বাস করেন—এই পরিস্থিতিতে তাঁদের কাজ হলো এগিয়ে আসা এবং নরকের পথে প্রতিযোগিতায়-ছোটা মানুষগুলোকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর আবশ্যক কর্তব্য পালন করা।
আমরা আনন্দিত যে মানবতার নিখাদ দরদি এবং মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাবার জন্য ব্যাকুল মাওলানা কলিম সিদ্দিকি সাহেব আপনাদের সেবায় প্রেম ও ভালোবাসার কিছু ফুল নিবেদন করেছেন। এই নিবেদনে মানবতার জন্য তাঁর প্রেম বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। একজন খাঁটি মুসলমান আমাদের ওপর যে-দায়িত্ব ছিলো মাওলানা কলিম সিদ্দিকি এই নিবেদনের মাধ্যমে তা সম্পন্ন করেছেন।
আমার এই সংপ্তি বক্তব্যের সঙ্গে আমি তাঁর হৃদয়ের টুকরোগুলো এবং আপনার আমানত আপনার হাতে তুলে দিচ্ছি।

ওয়াসি মুহাম্মদ সুলাইমান
সম্পাদক, মাসিক আরমুগান
ফুলাত, মুজাফ্ফরনগর,
ইউপি, ভারত

আমাকে ক্ষমা করুন
আমার প্রিয় পাঠকবৃন্দ, আমাকে মা করুন। আমি আমার এবং মুসলমান ভাইদের প থেকে আপনাদের কাছে মা প্রার্থনা করছি। তাঁরা এই দুনিয়ার সবচেয়ে বড়ো শয়তানের ধোঁকায় পড়ে আপনাদের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ আপনাদের কাছে পৌঁছায় নি। এই শয়তান তাদের অন্তরে পাপ নয় বরং পাপীর প্রতি ঘৃণা বদ্ধমূল করে দিয়ে পৃথিবীকে রণেেত্র পরিণত করেছে। এই ভ্রান্তির কথা চিন্তা করেই আমি হাতে কলম তুলে নিয়েছি যাতে আপনাদের প্রাপ্য আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারি। আমি কোনো লোভ বা স্বার্থের জন্য নয়—ভালোবাসার খাতিরেই আপনাদের সঙ্গে মানবতার কিছু কথা বলবো।
তিনিই প্রকৃত মালিক যিনি অন্তরের কথা বুঝতে পারেন। আমার অন্তর্যামী মালিক সাী—আমি চূড়ান্ত নিষ্ঠার সঙ্গে মুদ্রিত এই পৃষ্ঠাগুলো আপনাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে প্রকৃত ভালোবাসা ও সমবেদনার দাবি পূরণ করতে চাই। এই কথাগুলো আপনাদের কাছে না-পৌঁছানোর শোকে আমি বহু রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি। আমার কথা সম্পূর্ণ সত্য। আমার পুস্তিকাটি পড়ার পর আপনাদের অন্তরই তা স্যা দেবে।

প্রেমময় কিছু কথা
এসব কথা বলার মতো নয়; তারপরও আমার বাসনা, আপনারা আমার প্রেমময় কথাগুলো ভালোবাসার চোখে দেখবেন এবং মমতার সঙ্গে পাঠ করবেন। এটা আমার জন্য নয়; সেই মালিকের জন্য যিনি বিশ্বনিখিলের সৃষ্টিকর্তা এবং তার নিয়ন্ত্রক। এতে আমার আত্মা ও হৃদয় স্বস্তি পাবে—আমি আমার ভাই-বোনদের আমানত তাঁদের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছি এবং মানুষ ও তাদের ভাই হওয়ার কর্তব্য পালন করতে পেরেছি।
এই পৃথিবীতে আসার পর একজন মানুষের জন্য যে-সত্য জানার এবং যে-সত্য মানার প্রয়োজন পড়ে, যে-দায়িত্ব ও কর্তব্য তাকে পালন করতে হয়—আমি দরদপূর্ণ কথায় সেগুলো ব্যক্ত করার চেষ্টা করেছি।

প্রকৃতির সবচেয়ে বড়ো সত্য
এই জগতের, বরং প্রকৃতির সবচেয়ে বড়ো সত্য হলো—এই পৃথিবী, সমস্ত সৃষ্টি, গোটা বিশ্বনিখিলের সৃষ্টিকর্তা এবং নিয়ন্ত্রক ও পরিচালক কেবল এবং কেবল এক অদ্বিতীয় মালিক। তিনি তাঁর সত্তা, গুণাবলি, স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্তগ্রহণে এক ও অদ্বিতীয়। জগতের সৃষ্টি ও পরিচালনা এবং জগতের ধ্বংস ও বিনাশে তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি এমন শক্তি যা সব জায়গায় বিরাজমান। তিনি সবকিছু শোনেন এবং সবাইকে দেখেন। গোটা পৃথিবীর গাছের কোনো পাতাও তাঁর অনুমতি ছাড়া নড়ে না, পড়ে না। প্রতিটি মানুষের আত্মা তাঁর স্যা দেয়। সে যেই হোক এবং তার ধর্ম যাই হোক। সে মূর্তিপূজক হোক বা অন্য কেউ হোক। সে তার বুকের ভেতরে এই বিশ্বাস লালন করে যে তার সৃষ্টিকর্তা, তার রিযিকদাকা, তার প্রতিপালক এবং তার প্রকৃত মালিক সেই একজনই।
মানুষের বোধ ও বিবেচনায় সেই চিন্তা ছাড়া আর কোনো চিন্তা আসে না। গোটা বিশ্বনিখিলের মালিক একজনই। যদি কোনো বিদ্যালয়ে দু’জন প্রিন্সিপাল থাকেন তাহলে সেই বিদ্যালয় অচল হয়ে পড়ে। যদি একটি গ্রামে দু’জন গ্রামপ্রধান থাকেন তাহলে সে-গ্রামের শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ে। একটি দেশে দু’জন বাদশাহ থাকেন না এবং কোনো রাষ্ট্রে দু’জন রাষ্ট্রপ্রধান নেই। তাহলে এই বিশ্বনিখিলের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা একজনের বেশি দু’জন মালিকের মাধ্যমে কীভাবে চলতে পারে? দুনিয়ার শৃঙ্খলা-বিধানে একাধিক সত্তা কীভাবে সক্রিয় হবেন?

একটি দলিল
মহান আল্লাহর বাণী পবিত্র কুরআন তার সত্যতা প্রমাণের জন্য এই পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে : ‘আমি আমার বান্দার প্রতি যে-গ্রন্থ [কুরআন] অবতীর্ণ করেছি তাতে তোমাদের কেনো সন্দেহ থাকলে [কুরআন আল্লাহপাকের সত্যগ্রন্থ নয়] তোমরা তার অনুরূপ কোনো আনয়ন করো [তৈরি করো] এবং তোমরা যদি সত্যবাদী হও তাহলে আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে [সাহায্য করার জন্য] ডেকে নিয়ে আসো।’ [তরজমাতুল কুরআন, সূরা বাকারা : আয়াত ২৩]
চৌদ্দশো বছর পূর্ব থেকে এখন পর্যন্ত বহু সংখ্যক সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, প-িত ও দার্শনিক বহুবিধ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ-গবেষণা করেছেন এবং অমতা প্রকাশ করে মাথা নত করেছেন। বস্তুত কেউ-ই আল্লাহ তাআলার সেই চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে পারেন নি এবং পারবেনও না।
সেই পবিত্র কিতাবে মালিক আমাদের বিবেক-বুদ্ধিকে আকর্ষণ করার জন্য অনেক প্রমাণ উপস্থিত করেছেন। একটি উদাহরণ এমন : ‘যদি আসমান ও জমিনে একাধিক মালিক ও পরিচালক থাকতো তাহলে উভয়টিতে ভয়ঙ্কর বিপর্যয় সৃষ্টি হতো।’ [তরজমাতুল কুরআন, সূরা আম্বিয়া : আয়াত ২২]
কথা পরিষ্কার। যদি একজনের বদলে একাধিক মালিক ও শাসক থাকতো তাহলে কলহ ও লড়াই হতো। একজন বলতো, এখন হবে রাত। আরেকজন বলতো, না, এখন হবে দিন। একজন বলতো, দিন হবে ছয়মাসের। আরেকজন বলতো, না, দিন হবে তিনমাসের। একজন বলতো, সূর্য আজ পশ্চিম দিক থেকে উঠবে। আরেকজন বলতো, না, সূর্য আজ পুব দিক থেকে উঠবে। দেব-দেবীদের বাস্তবিক যদি এই অধিকার থাকতো যে তারা আল্লাহপাকের কর্মকা-েও অংশীদার হতে পারে তাহলে দেখা যেতো এক বান্দা পূজা-অর্চনা করে তার আর্জি গ্রহণে বৃষ্টির দেবতাকে রাজি করিয়ে ফেলেছে; কিন্তু বড়ো মালিকের প থেকে নির্দেশ এলো, এখন বৃষ্টি হবে না। তখন ছোটো দেবতারা তাঁর বিরুদ্ধে হরতাল করে বসতো। মানুষ বসে থাকতো দিনের আলো ফোটার আশায়; কিন্তু সূর্য উঠতো না। পরে জানা যেতো, সূর্যের দেবতা হরতালে অংশগ্রহণ করেছে।

সত্য স্যা
সত্য হলো, দুনিয়ার প্রতিটি বস্তু স্যা দেয় এবং নিখুঁত নিয়মে চলমান বিশ্বনিখিলের শৃঙ্খলা স্যা দেয় যে এই জাহানের মালিক এক ও অদ্বিতীয়। তিনি যখন চান এবং যা চান, করতে পারেন। তাঁর সত্তাকে কল্পনা ও চিন্তার ছাঁচে বাঁধা সম্ভব নয়। তাঁর ছবি তৈরি করাও সম্ভব নয়। এই মালিক বিশ্বজাহানকে মানুষের কল্যাণ এবং তাদের সেবা করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। সূর্য মানুষের সেবা করে, মানুষের অধীন এই জমিনও মানুষের সেবা করে। আগুন মানুষের সেবা করে। পানিও মানুষের সেবা করে। পৃথিবীর সব জড় ও অজড় বস্তু মানুষের সেবা করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আর মালিক মানুষকে তাঁর বান্দা বানিয়ে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত ও আনুগত্য করার জন্য। সে এই দুনিয়াতে সকল মুআমালাত-মুআশারাত যথার্থভাবে ও সুচারুরূপে আঞ্জাম দেবে এবং এসবের সঙ্গে সঙ্গে তার মালিক ও মাবুদও রাজি-খুশি হবেন।
ইনসাফের দাবি হলো, যখন সৃষ্টিকর্তা, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা, পানাহারদাতা, রিযিকদাতা এবং জীবনের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করার মালিক সেই একজনই, তখন একজন খাঁটি সত্যবাদী মানুষও নিজের জীবনে এবং জীবন-সম্পর্কিত যাবতীয় কর্মকা-ে সেই মালিকের আনুগত্য করবে; তাঁর হুকুম-আহকাম মেনে চলবে। সেই মালিকের অনুগত হয়ে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সব কাজ সম্পন্ন করবে। সুতরাং কোনো মানুষ যদি সেই এক ও অদ্বিতীয় মালিকের হুকুম-আহকাম না মানে এবং নাফরমানির ভেতর দিয়ে জীবন-যাত্রা অব্যাহত রাখে তাহলে প্রকৃত অর্থে তাকে মানুষ বলাই সঙ্গত নয়।

এক অমোঘ সত্য
সেই সত্য মালিকের মহাসত্য গ্রন্থ কুরআন মাজিদের অনেকগুলো সত্যর মধ্য থেকে একটি অমোঘ সত্য আমরা উচ্চারণ করতে পারি : ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। তারপর তোমাদেরকে আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে।’ [তরজমাতুল কুরআন, সূরা আনকাবুত : আয়াত ৫৭]
উল্লিখিত আয়াতটির দুটি অংশ রয়েছে। প্রথম অংশটি হলো প্রতিটি প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। এটি এমন সত্য যা পৃথিবীর প্রতিটি দেশের প্রতিটি ধর্মের প্রতিটি মতাদর্শের মানুষ সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করে। এমনকি যারা ধর্মে বিশ্বাস করে না, স্রষ্টায় বিশ্বাস করে না, তারাও এই সত্যের সামনে অবনত-মস্তক। পশু-পাখিও পর্যন্ত মৃত্যুর সত্যতা উপলব্ধি করে। ইঁদুর বেড়াল দেখলেই প্রাণ নিয়ে পালায়। তার জানের ভয় আছে। কুকুরও রাস্তায় চলন্ত গাড়ি দেখলে নিজেকে বাঁচানোর জন্য দৌড়ে পালায়। কারণ এরাও মৃত্যুকে বিশ্বাস করে। তারা জানে এভাবে দৌড়ে না পালালে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত।

মৃত্যুর পর
এই আয়াতটির দ্বিতীয় অংশে পবিত্র কুরআন মাজিদ একটি অকাট্য সত্যের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই সত্য যদি মানুষ উপলব্ধি করতে পারে তাহলে গোটা দুনিয়ার পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। সত্যটি হলো—মহান মালিক ঘোষণা করছেন—তোমরা মৃত্যুর পর আমার কাছেই ফিরে আসবে এবং দুনিয়াতে তোমরা যেসব কাজ করেছো সেগুলোর প্রতিদান পাবে। মৃত্যুর পর তোমরা পচে-গলে মাটিতে মিশে যাবে বা মাটিতে পরিণত হবে এবং দ্বিতীয়বার তোমাদের সৃষ্টি করা হবে না—এমনটি নয়। এটাও সত্য নয় যে মৃত্যুর পর তোমাদের আত্মা অন্য কারো দেহে প্রবেশ করবে। এই দর্শন কোনো বিবেচনাতেই মানুষের যৌক্তিক বিচারে গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রথম কথা হলো, পুনর্জন্মবাদের দর্শন কোনো বৈদিক গ্রন্থেই পাওয়া যাবে না। অবশ্য পরবর্তীকালের পুরাণে এই দর্শনের বর্ণনা উপস্থিত। [পুরাণ : ১. প্রচীন কাল থেকে পুরুষানুক্রমে প্রবহমান কাহিনী, বিশেষত কোনো জাতির আদি ইতিহাস-সম্পৃক্ত বিশ্বাস, ধারণা ও নৈসর্গিক ঘটনাবলির ব্যাখ্যা; অথিকথা; মিথ। ২. পুরাকালের হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রসিদ্ধ ব্যক্তি, সমাজ ও ধর্ম ইত্যাদি অবলম্বনে সংস্কৃতে রচিত আখ্যায়িকা বা কথা। যেমন—বিষ্ণুপুরাণ, ভাগবত পুরাণ। এই দর্শন অনুযায়ী জন্মগতভাবেই পিতার গুণাবলি পুত্রে এবং পুত্রের গুণাবলি পৌত্রে স্থানান্তরিত হবে।] এই দর্শনের সূচনা হয়েছিলো এভাবে যে শয়তান ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে উঁচু-নিচু শ্রেণিতে বিভক্ত করেছিলো। ধর্মের নাম করে নমশূদ্রদের থেকে সেবা গ্রহণ করা হতো এবং তাদেরেক নিচুশ্রেণির ভাবা হতো। কথিত উঁচুশ্রেণির লোকেরাই ছিলো ধর্মের ঠিকাদার। সমাজের দলিত-পীড়িত-নিষ্পেষিত মানুষেরা যখন ধর্মের ঠিকাদারদের কাছে জানতে চায়, আমাদের সৃষ্টিকর্তা খোদা তো সব মানুষকে সমান সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের নাক-কান-চোখ এবং প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সবার জন্য সমানভাবে সৃষ্টি করেছেন, তাহলে আপনারা কেনো নিজেরাই নিজেদের শ্রেষ্ঠ ও অভিজাত মনে করছেন আর আমাদের কেনো নিচু ও ইতর শ্রেণির ভাবছেন? তখন ধর্মের ঠিকাদারেরা পুনর্জন্মবাদের আশ্রয় নিয়ে এই জবাব দেয়, পূর্বজনমে তোমাদের গর্হিত কৃতকর্মই এই জনমে তোমাদের নীচু ও ইতর করে রেখেছে।
এই দর্শনের মূলকথা হলো, প্রতিটি আত্মাই দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণ করে; কৃতকর্মের ফলানুসারে ভিন্ন ভিন্ন দেহলাভ করে এবং এই পৃথিবীতে আগমন করে। যাদের কর্মকা- গর্হিত ছিলো তাদের আত্মা পশুর দেহে প্রবেশ করে এই পৃথিবীতে আসে। আর যাদের কর্মকা- অতিশয় গর্হিত ছিলো তাদের আত্মা চলে যায় তরুলতার দেহে। এবং যাদের কর্মকা- ভালো তারা পুনর্জন্মবাদের চক্র থেকে মুক্তি লাভ করে।

পুনর্জন্মবাদের বিপে তিনটি প্রমাণ
এক . এই বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, গোটা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা এ-ব্যাপারে একমত যে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম সৃষ্টি হলো উদ্ভিদ। তারপর সৃষ্টি হয়েছে প্রাণীজগত। প্রাণীজগত সৃষ্টির কোটি কোটি বছর পর সৃষ্টি হয়েছে মানুষ। যখন এই পৃথিবীতে কোনো মানুষের অস্তিত্বই ছিলো না এবং তাদের আত্মার খারাপ কাজের কোনো বালাই ছিলো না—স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—ঐ সব কাদের আত্মা ছিলো যেগুলো অসংখ্য তৃণলতা-বৃরাজি ও পশুপাখির আকৃতিতে দেহলাভ করেছিলো?
দুই. দ্বিতীয় কথা হলো, পুনর্জন্মবাদের দর্শন মেনে নিলে এ-কথাও মানতে হবে যে পৃথিবীতে প্রাণীদের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাবে। যেসব আত্মা ভালো কাজের কারণে পুনর্জন্ম থেকে রেহাই পাবে প্রাণীর হিসেব থেকে তাদের সংখ্যা বাদ যাবে। বাস্তবতা যদি এটাই হতো তাহলে মানুষ, পশু-পাখি, তৃণলতা ও গাছগাছালির সংখ্যায় ধারবাহিক হ্রাসমানতা অব্যাহত থাকতো। কিন্তু আমরা দেখছি দিন দিন প্রাণীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
তিন. তৃতীয় কথা হলো, পুনর্জন্মবাদের দর্শন অনুসারে এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণকারী ও মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান হওয়ার কথা ছিলো। অথচ আমরা দেখি মৃত্যুবরণকারী মানুষের তুলনায় জন্মগ্রহণকারী শিশুর সংখ্যা অনেক বেশি। কখনো কখনো কোটি কোটি মশা জন্ম নেয়। এই তুলনায় মৃত মানুষের সংখ্যা খুবই অল্প।
আমাদের দেশে কখনো কোনো শিশু সম্পর্কে এমন গুজবও ছড়িয়ে পড়ে যে সে আগের জন্মে যে-বাড়িঘরে বসবাস করতো সেগুলো চেনে। আগের জন্মে তার না কী ছিলো তাও সে বলতে পারে। সে যে পুনর্জন্মগ্রহণ করেছে তাও বলতে পারে। সত্য কথা হলো, বাস্তবতার  সঙ্গে এসব গুজবের কেনো মিল নেই। বাস্তবতা ভিন্ন। এসব বিষয় বিভিন্ন মানসিক উন্মাদনা, আত্মিক ব্যাধি এবং সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসব ব্যাধি ও উন্মাদনার যথার্থ চিকিৎসা ও প্রতিকার হওয়া উচিত। বাস্তবতার সঙ্গে এসব গুজব ও ফিসফিসানির দূরতম সম্পর্কও নেই।

কর্মের ফলাফল পাবেই
মানুষ যদি তাদের প্রতিপালকের ইবাদত-বন্দেগি করে, তাঁর হুকুম-আহকাম মেনে চলে, ভালো ও সৎকাজ করে এবং ভালো কাজ করতে করতেই মৃত্যুবরণ করে তাহলে তারা তাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহে জান্নাত লাভ করবে। জান্নাতে আছে সুখভোগের যাবতীয় উপকরণ। কিন্তু জান্নাতের আরাম-আয়েশের উপকরণ মানুষ কখনো চোখে দেখে নি, কানে শোনে নি, এমনকি কারো মন কখনো সেসব কল্পনাও করে নি। জান্নাতে সবচেয়ে বড়ো নিয়ামত হলো মানুষ সেখানে আপন প্রতিপালককে চোখের সামনে দেখতে পারবে। এর চেয়ে আনন্দদায়ক ও প্রশান্তিদায়ক আর কিছুই নেই।
আর যারা গর্হিত কাজ করবে; আপন প্রতিপালকের প্রভুত্বে অন্যকে অংশীদার বানাবে, র্শিক করে আপন প্রতিপালকের নাফরমানি করবে তারা জাহান্নামে নিপ্ত হবে। জাহান্নামে সে আগুনে জ্বলবে। দুনিয়াতে সে যেসব পাপকাজ, অন্যায়, অনাচার করেছিলো সেগুলোর শাস্তি ভোগ করবে। তাদের জন্য সবচেয়ে বড়ো শাস্তি হবে তারা তাদের প্রতিপালকের দর্শন লাভ থেকে বঞ্চিত হবে। তাদের জন্য থাকবে তাদের মালিকের ভয়ঙ্কর শাস্তি।

প্রতিপালকের অংশীদার বানানো সবচেয়ে বড়ো পাপ
প্রকৃত ও সত্য মহান মালিক তাঁর কিতাব কুরআন মাজিদে আমাদের উদ্দেশে বলেছেন, নেক ও সৎকাজ ছোটোও হয়, বড়োও হয়। তিমনিভাবে সেই মালিকের কাছে পাপকাজও ছোটোও হয় এবং বড়োও হয়। মালিক আমাদের জানিয়েছেন, যে-অন্যায় ও পাপচার মানুষের জন্য সবচেয়ে বড়ো এবং সবচেয়ে ভয়াবহ শাস্তি আবশ্যক করবে, যে-পাপ কখনো মা করা হবে না, তা যে করবে সে সবসময় জাহান্নামে জ্বলবে, কখনো জাহান্নাম থেকে বের হতে পারবে না; সে মৃত্যু কামনা করবে কিন্তু তার মৃত্যু হবে না, তা হলো সেই এক—অদ্বিতীয় মালিকের সঙ্গে অন্য কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা; তিনি ব্যতীত অন্য কারো সামনে মাথা নত করা; তিনি ছাড়া অন্য কাউকে উপসনার উপযুক্ত মনে করা। তিনি ছাড়া অন্য কাউকে মৃত্যুদাতা, জীবনদাতা, রিযিকদাতা, উপকার ও অপকারের অধিকারী মনে করা সবচেয়ে ভয়াবহ পাপ এবং ভয়ঙ্কর অবিচার। সেই অংশীদার ও উপাস্য চাই দেব-দেবী হোক, সূর্য-চন্দ্র হোক বা পির-ফকিরই হোক—তাদের কাউকে সেই মালিকের সত্তা বা গুণাবলি বা সিদ্ধান্তগ্রহণের স্বাধীনতায় সমক বা অংশীদার সাব্যস্ত করা র্শিক। মালিক কখনো এই পাপ মা করবেন না। র্শিক ছাড়া যাবতীয় পাপ তিনি চাইলে মা করবেন। আমাদের যুক্তি-বিচারেও সেই পাপ এতোটাই জঘন্য যে আমরা তা চূড়ান্ত ঘৃণা করি।

একটি উপমা
একটি উপমা দেওয়া যাক। মনে করুন কারো স্ত্রী খুবই বিত-াপ্রিয়। তুচ্ছ তুচ্ছ কথায় ঝগড়ায় লিপ্ত করে। কোনো কথাই শোনো না, কোনো কথাই মানে না। কিন্তু তাকে যদি ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয় তাহলে সে বলে, আমি শুধু তোমার, তোমারই থাকবো। তোমার দরজায় পড়ে থেকেই জীবন শেষ করবো এবং এক মুহূর্তের জন্যও তোমার ঘর ছেড়ে বাইরে যাবো না। তাহলে শতো রাগ সত্ত্বেও স্বামী তাকে তাড়িয়ে দেবে না; আপসে তার সঙ্গে থাকতে বাধ্য হবে।
তার বিপরীতে এক ব্যক্তির স্ত্রী সেবাপরায়ণ ও পরম আনুগত্যশীল। সবসময় সে স্বামীর প্রতি দৃষ্টি রাখে। খোঁজ-খবর রাখে। স্বামী অর্ধেক রাতেও বাড়ি ফিরলে সে তার জন্য অপো করে। খাবার-দাবার গরম করে তার সামনে পরিবেশন করে। পাশে বসে থেকে ভালো-মন্দ কী লাগবে না লাগবে তা জিজ্ঞেস করে এবং প্রেম ও উষ্ণতাময় কথাবার্তা বলে। এমন স্ত্রীই একদিন স্বামীকে বলতে লাগলো, তুমি আমার জীবনসঙ্গী ঠিক আছে; কিন্তু শুধু তোমাকে দিয়ে আমার কাজ চলছে না। এজন্যই আমি অমুক প্রতিবেশীকে আজ থেকে আমার স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেছি। বলা বাহুল্য, এই স্বামীর মধ্যে যদি সামান্যতম আত্মমর্যাদাবোধ থাকে—এটা সে বরদাশ্ত করবে না। সে এক মুহূর্তের জন্যও এই সেবাপরায়ণ কিন্তু নির্লজ্জ স্ত্রীকে তার সঙ্গে রাখবে না।
বস্তুত, এমনটি কেনো হয়? কোনো স্বামীই তার বিশেষ স্বামীসুলভ অধিকারে কারো অংশীদারি মেনে নেয় না। [কিন্তু অনেক সময়ই স্ত্রী তার স্ত্রীসুলভ অধিকারে অংশীদারি মেনে নেয়। সে-অংশীদারি হতে পারে এক বা একাধিক নারী থেকে।] দেখুন, একফোঁটা নাপাক তুচ্ছ তরল থেকে সৃষ্ট হয়েও আপনি আপনার অধিকারে কারো অংশীদারি মেনে নিতে পারছেন না। তাহলে যে-মালিক একফোঁটা তুচ্ছ তরল থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তিনি কীভাবে এটা বরদাশ্ত করবেন যে তাঁর সৃষ্ট মানুষ তাঁর সঙ্গে অংশীদার সাব্যস্ত করবে? তিনি কীভাবে মেনে নেবেন যে তাঁর সঙ্গে অন্য কারো উপাসনা করা হবে, পূজা-অর্চনা করা হবে? এই পৃথিবীতে আমরা যা-কিছু দেখি এবং যা-কিছু আমাদের দৃষ্টির আড়ালে আছে সব তো তাঁর দান। যে-গণিকা নারী তার আব্রু-ইজ্জত বিক্রি করে এবং প্রতিটি আগন্তুকের কাছে সোপর্দ করে তার শরীর, এ-কারণে সে আমাদের চোখে যতোটা নীচু ও ঘৃণ্য, র্শিককারী মানুষ মালিকের দৃষ্টিতে তার চেয়েও বেশি নীচু ও ঘৃণ্য। [ইতোপূর্বে লেখক পাপীকে নয় পাপকে ঘৃণা করার মন্ত্রে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন; কিন্ত এখানে তিনি—আগন্তুক পুরুষদের প্রতি নয়—গণিকা নারীর প্রতি প্রকাশ করেছেন চূড়ান্ত ঘৃণা।]
সে প্রকৃত মালিককে বাদ দিয়ে যার ইবাদতই করুক না কেনো—চাই তা দেব-দেবী হোক, ফেরেশতা হোক, জিন হোক, মানুষ হোক, ভূত-প্রেত হোক, মূর্তি-প্রতিমা হোক, কবরস্থানের বাসিন্দা হোক, বস্তু বা অবস্তু হোক—সে তাঁর চোখে নীচু ও ঘৃণ্য।

মূর্তিপূজার বিপে পবিত্র কুরআন
মূর্তিপূজার বিষয়টিকে পরিষ্কারভাবে বোঝানোর জন্য কুরআন শরিফে একটি উপমা পরিবেশিত হয়েছে। কুরআনের এই বর্ণনা গভীর চিন্তার দাবি রাখে। কুরআনের ভাষায়: [তরজমা] ‘হে মানুষ একটি উপমা পেশ করা করা হচ্ছে, মনোযোগ দিয়ে তা শোনো : আল্লাহকে ছেড়ে তোমরা যাদের ডাকো [মূর্তি-প্রতিমা ও মাজারের বাসিন্দা] তারা তো কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, এই উদ্দেশ্যে তারা সবাই একত্র হলেও। [সৃষ্টি করা তো দূরের কথা,] মাছি যদি তাদের সামনে থেকে কিছু [প্রসাদ বা অন্যকিছু] ছিনিয়ে নিয়ে যায়, তাও তারা তার কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। অন্বেষক [উপাসক] ও অন্বেষিত [উপাস্য] কতোই দুর্বল; তারা আল্লাহর যথোচিত মর্যাদা উপলব্ধি করে না, আল্লাহ নিশ্চয়ই মতাবান, পরাক্রমশালী। [তরজমাতুল কুরআন, সূরা হজ : আয়াত ৭৩-৭৪]
কী চমৎকার উপমা! সৃষ্টিকর্তা তো স্বয়ং আল্লাহ। তিনি যাবতীয় প্রাণী ও প্রাণহীন বস্তু সৃষ্টি করেছেন। আর হাতে-তৈরি মূর্তিগুলো যারা বানিয়েছে তারা তো একদল উদাসীন মানুষ। মূর্তিগুলোর যদি সামান্যতম অনুভূতি থাকতো তাহলে তারা মানুষেরই উপাসনা করতো।

একটি নির্বোধ চিন্তা
কেউ কেউ বলেন, আমরা প্রতিমাপূজা করি, কারণ ওগুলো আমাদেরকে মালিকের পথ দেখিয়েছে এবং ওগুলোর উসিলাতেই আমরা মালিকের করুণা ও সাহায্য লাভ করেছি। এই যুক্তিটা এমন যে, কোনো ব্যক্তি কুলির কাছে ট্রেন সম্পর্কে তথ্যাদি জিজ্ঞেস করলো। কুলি তাকে ট্রেনের তথ্যাদি বলে দিলো। তথ্য জানার পর সে ট্রেন নয়, কুলির পিঠেই চেপে বসলো এবং বলতে লাগলো, এই কুলিই তো আমাকে ট্রেনের তথ্য জানিয়েছে। এমনিভাবে আল্লাহ সম্পর্কে যিনি জ্ঞান বিতরণ করেন এবং মানুষকে আল্লাহর পথ দেখান, আল্লাহকে ছেড়ে তাঁর ইবাদত করা ট্রেনের বদলে কুলির পিঠে চেপে বসার মতোই চরম নির্বুদ্ধিতা।
কোনো কোনো ভাই বলেন, আমরা শুধু ধ্যানে মগ্নতা ও চিন্তায় নিবিষ্টতা অর্জনের জন্যই মূর্তিগুলো ঘরে রাখি। এটা খুবই চমৎকার কথা—গাঢ় মগ্নতার সঙ্গে আমি একটি খুঁটির দিকে তাকিয়ে আছি এবং বলছি আমি কেবল আমার বাবার প্রতি ধ্যানে নিবিষ্টতা আনার জন্য খুঁটির দিকে তাকিয়ে আছি! কোথায় বাবা আর কোথায় খুঁটি! কোথায় হাতে-তৈরি দুর্বল মূর্তি আর কোথায় সীমাহীন পরাক্রমশালী, অসীম দয়ালু সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী মালিক! মূর্তির উপাসনায় তাঁর ধ্যান সৃষ্টি হয় নাকি ভঙ্গ হয়?
সারকথা হলো, যেকোনোভাবেই হোক এবং যাকেই হোক বা যেটাকেই হোক—আল্লাহর সঙ্গে শরিক সাব্যস্ত করা সবচেয়ে বড়ো পাপ। এই পাপ আল্লাহপাক কখনো মা করেন না এবং এই পাপের কারণে মানুষ চিরদিনের জন্য জাহান্নামের ইন্ধন হবে।

ঈমান সর্বশ্রেষ্ঠ ভালো কাজ
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড়ো নেক ও ভালো কাজ হলো ঈমান। ঈমান সম্পর্কে বলা হয়েছে—পৃথিবীর সকল ধর্ম এই বিষয়ে একমত—সবাইকে এই পৃথিবীর সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে এবং মৃত্যুর পর তাদের সঙ্গে থাকবে কেবল ঈমান। ঈমানদার তাকেই বলে যে হকদারের হক আদায় করে, পাওনাদারের পাওনা আদায় করে। তার বিপরীতে যে হক মেরে দেয়, পাওনা আদায় করে না তাকে জালেম ও পাপাচারী বলা হয়। মানুষের ওপর সবচেয়ে বড়ো হক তার সৃষ্টিকর্তার। মানুষের কাছে তাঁর অধিকার সর্বোচ্চ। কারণ তিনি সব মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাদের জীবন দিয়েছেন, রিযিক দিচ্ছেন এবং তিনিই জীবন ও মৃত্যুর একমাত্র মালিক। আল্লাহপাকই আমাদের সবার প্রতিপালক এবং একমাত্র তিনিই ইবাদতের উপযুক্ত। কেবল তাঁরই ইবাদত করা যেতে পারে এবং তাঁরই ইবাদত করতে হবে। তাঁকেই ধন-দৌলত, উপকার ও অপকার, সম্মান ও অসম্মানের মালিক বিশ্বাস করতে হবে। তাঁর দেওয়া এই জীবন তাঁরই আনুগত্যে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ব্যয় করতে হবে। তাঁকেই মানা যেতে পারে এবং তাঁকেই মানতে হবে। এটার নামই ঈমান। এই এক—অদ্বিতীয় মালিককে মানা ছাড়া, একমাত্র তাঁর আনুগত্য করা ছাড়া কোনো মানুষ ঈমানদার হতে পারবে না, ঈমানওয়ালা হতে পারবে না। বরং তাকে বলা হবে বে-ঈমান ও কাফের।
মালিকের সবচেয়ে বড়ো অধিকার, তাঁর সবচেয়ে বড়ো হক মেরে দিয়ে কেউ যদি মানুষের সামনে তার ঈমানদারি ফলায় তাহলে সে মস্ত বড়ো ডাকাত। যে-ডাকাত ভয়াবহ ডাকাতি করে বিপুল টাকা-পয়সা অর্জন করেছে। সে দোকানে এসে দোকানদারকে বলছে, হিসেবের ভুলে একটাকা আমার কাছে বেশি চলে এসেছিলো। এই নিন আপনার একটাকা। অপরের বিশাল সম্পদ অন্যায়ভাবে লুট করে নেওয়ার পর কাউকে একটাকা ফিরিয়ে দেওয়া যেমন অনাচার, মালিকের সবচেয়ে বড়ো অধিকার ও হক বিনষ্ট করার পর নিজেকে ঈমানদার জাহির করাও তেমনি অনাচার। কারণ সে প্রকৃত মালিককে বাদ দিয়ে অন্যদের ইবাদত-বন্দেগি করছে এবং এর চেয়ে নিকৃষ্ট ঈমানদারি আর নেই।
ঈমানের দাবি হলো, মানুষ কেবল এক—অদ্বিতীয় মালিককেই মানবে এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সে আল্লাহর হুকুম-আহকাম মেনে চলবে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের ল্েয একনিষ্ঠভাবে তাঁর আনুগত্য করবে। আল্লাহপাকের দেওয়া জীবন তাঁর মর্জিমত পরিচালনা করার নামই দীন। তাঁর বিধি-বিধান উপো করে নিজের মর্জিমত জীবন-যাপন করাই হলো বেদীনি বা ধর্মহীনতা।

সত্যধর্ম
আদিকাল থেকে চলে আসা সত্যধর্ম একটিই। সত্যধর্মের শিা হলো, এক—অদ্বিতীয় মালিককেরই আনুগত্য তরতে হবে এবং একমাত্র তাঁরই বিধি-বিধান মানতে হবে। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেছেন— ‘আল্লাহর কাছে মনোনীত ধর্ম হলো ইসলাম।’ [তরজমাতুল কুরআন, সূরা আলে ইমরান : আয়াত ১৯]
আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেছেন— ‘কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো কবুল করা হবে না এবং সে হবে আখেরাতে তিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।’ [তরজমাতুল কুরআন, সূরা আলে ইমরান : আয়াত ১৯]
এটা মানুষের দুর্বলতা যে তার দৃষ্টিশক্তি নির্দিষ্ট সীমায় আবদ্ধ। তার শ্রবণেন্দ্রিয়েরও শ্রবণশক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তার শোঁকার মতা, চাখার শক্তি এবং স্পর্শার্জিত অনুভূতিও সীমাবদ্ধ। চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বক—এই পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় দ্বারা মানুষের মস্তিষ্ক ও বিবেক তথ্য-জ্ঞান-অনুভূতি লাভ করে। জ্ঞানেন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে মস্তিষ্ক ও বিবেকেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
মহান মালিক আমাদের কীরূপ জীবন পছন্দ করেন? আমরা কীভাবে তাঁর ইবাদত করবো? মৃত্যুর পর মানুষের কী হবে? কোন্ মানুষের জন্য জান্নাত মিলবে এবং তাদের কাজ কী? কী কী কৃতকর্মের কারণে মানুষ জাহান্নামে যাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর মানুষের মস্তিষ্ক, বিবেক, বোধ ও বুদ্ধি থেকে পাওয়া যাবে না।

পয়গাম্বর
মানুষের এই দুর্বলতার প্রতি দয়াপরবশ হয়েই মহান মালিক তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে সেই সব মহান মানুষের ওপর—যাঁদেরকে এই দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত মনে করা হয়েছে—ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাঁর পয়গাম ও বাণী অবতীর্ণ করেছেন। নির্বাচিত মহাপুরুষেরা মানুষকে জীবন-যাপনের পদ্ধতি ও নীতিমালা, মহান মালিকের আনুগত্য ও ইবাদত-বন্দেগির হুকুম-আহকাম, মানুষের পে বিবেক ও মস্তিষ্ক চালনা করে উদ্ঘাটন-অসম্ভব জীবন-বস্তবতা এবং আরো নানা প্রয়োজনীয় বিষয় শিা দিয়েছেন। নির্বাচিত মহাপুরুষদেরকে নবী, রাসূল ও পয়গাম্বর বলা হয়। অবতারও বলা যায় তাদেরকে—তবে শর্ত হলো, এখানে অবতারের উদ্দেশ্য হবে সেই সব মানুষ আল্লাহপাক যাঁদেরকে মানুষের কাছে তাঁর বাণী ও পয়গাম পৌঁছে দেওয়ার জন্য উপযুক্ত মনে করেছেন এবং নির্বাচিত করেছেন। কিন্তু আজকাল অবতারের অর্থ দাঁড়িয়েছে ভিন্ন। মানুষ মনে করে খোদা নিজেই মানুষের রূপ ধারণ করে এই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন। এটা ভ্রান্তিবিলাস ও অন্ধবিশ্বাস। এবং অবশ্যই এটা চরমতম পাপ। এই ভ্রান্তবিশ্বাস মানুষকে এক মালিকের ইবাদত-বন্দেগি থেকে সরিয়ে দেয় এবং মূর্তি-প্রতিমার পূজা-অর্চনার নিগড়ে ফাঁসিয়ে দেয়।
আল্লাহপাক মানুষকে সরল ও সত্যপথে পরিচালনা করার জন্য যাঁদেরকে নির্বাচিত করেছেন সেই সব মহান পুরুষেরা—যাঁদেরকে আমরা নবী, রাসূল, পয়গাম্বর বলি—যুগে যুগে প্রতিটি জাতিতে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁরা সবাই মানুষকে এক আল্লাহকে মানার, একমাত্র তাঁরই ইবাদত করার এবং কেবল তাঁরই সন্তুষ্টি অর্জন করার ল্েয জীবন-যাপনের পদ্ধতি ও নীতিমালা (শরিয়ত বা ধর্মীয় নিয়ম-কানুন) শিখিয়েছেন এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেছেন। তাঁরা সবাই মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য করার কথা বলেছেন। নবী-রাসূলগণের মধ্যে কেউই এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করার আহ্বান জানান নি। বরং তাঁর এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করা বা অন্য কাউকে ইবাদতের উপযুক্ত মনে করাকে ভয়ঙ্কর পাপ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁরা সবচেয়ে বেশি এই পাপ থেকেই মানুষকে বিরত রেখেছেন। মানুষ তাঁদের কথায় বিশ্বাস করেছে এবং সরল ও সঠিক পথে চলেছে।

মূর্তিপূজার সূচনা
নবী, রাসূল, পয়গাম্বর এবং তাঁদের অনুসারী সৎ ও বুযুর্গ মানুষেরা মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁদের মৃত্যুবরণ করাটাই স্বাভাবিক ছিলো। কারণ মৃত্যু নেই একমাত্র স্রষ্টার; আর সবাইকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। নবী-রাসূল ও বুযুর্গ ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর তাঁদের অনুসারী মানুষেরা তাঁদের স্মরণ করতেন এবং অনেক কান্নাকাটি করতেন। শয়তান এটাকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে নেয়। শয়তান শুরু থেকেই মানুষের প্রধান শত্রু। আল্লাহপাক মানুষকে পরীা করার জন্য শয়তানকে ধোঁকা এবং কুপ্ররোচনা দেওয়ার মতা প্রদান করেছেন। তাই শয়তান মানুষকে মন্দ ও গর্হিত কাজে প্ররোচিত করে এবং বিপথগামী করে। আল্লাহপাক দেখতে চান তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে কারা তাঁর আনুগত্য ও ইবাদত-বন্দেগি করে আর কারা শয়তানের আনুগত্য করে তার দোসর হয়।
শয়তান শোকতাপগ্রস্ত মানুষের কাছে এসে কুপ্ররোচনা দিতে শুরু করলো। সে তাদের বললো, তোমরা নবী-রাসূল ও বুযুর্গ ব্যক্তিদের অনেক বেশি ভালোবাসো। মৃত্যুর পর তাঁরা তোমাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছেন। তোমরা তাঁদের জন্য দুঃখ করছো। তাঁরা সবাই ছিলেন আল্লাহপাকের বিশেষ বান্দা। আল্লাহপাক তাঁদের স্মৃতি মুছে দেবেন না। এই জন্য আমি তাঁদের একটি মূর্তি বানিয়ে দিলাম। তোমরা এই মূর্তিটিকে দেখে সান্ত¡না পাবে।
শয়তান মূর্তি বানিয়ে মানুষের সামনে উপস্থিত করলো। মানুষের মনে যখন মহান ব্যক্তিদের স্মরণে বেদনার উদ্রেক হতো, তারা মূর্তির দিকে তাকিয়ে থাকতো। ধীরে ধীরে মূর্তির প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসা তাদের হৃদয়ে প্রোথিত হয়ে গেলো। শয়তান এবার আরেকটি সুযোগ নিলো। সে মানুষকে বোঝালো, নবী-রাসূল ও বুযুর্গ ব্যক্তিরা আল্লাহপাকের নিকটতম বান্দা ছিলেন। তোমরা তাঁদের মূর্তির সামনে তোমদের মাথা অবনত করো তাহলে তোমরাও আল্লাহপাকের নৈকট্য লাভ করবে। মানুষের হৃদয়ে আগে থেকেই মূর্তির প্রতি ভালোবাসা বদ্ধমূল ছিলো। তাই শয়তানের প্ররোচনায় তারা দিধা করলো না। মূর্তির সামনে তারা মাথা নত করলো এবং মূর্তিপূজা শুরু করলো। এভাবেই মূর্তিপূজার সূচনা হলো। যে-মানুষ একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত-উপাসনা করতো সেই মানুষ মূর্তি ও প্রতিমার উপসনা শুরু করলো এবং র্শিকের জালে ফেঁসে গেলো।
আল্লাহপাক মানুষকে এই দুনিয়াতে তাঁর প্রতিনিধি বানিয়েছেন। যখন আল্লাহকে ব্যতীত অন্যদের সামনে মাথা নত করতে শুরু করলো, মাটি ও পাথরের তৈরি মূর্তির উপাসনা করলো, তারা নিজেদের ও অন্যদের চোখে নীচ ও ইতর এবং মহান মালিকের চোখেও হীন ও ইতর ও নিকৃষ্টরূপে আবির্ভূত হলো। তারা আল্লাহপাকের রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে চিরস্থায়ী জাহান্নামের ইন্ধন হলো। এরপর আল্লাহপাক আবার তাঁর নির্বাচিত পুরুষ নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁরা মানুষকে কেবল মূর্তিপূজা থেকে নয়, সকল প্রকার জুলুম ও অনাচার, যাবতীয় মন্দ ও গর্হিত কাজ ও চারিত্রিক কলুষতা থেকে বিরত রেখেছেন। কিছু মানুষ তাঁদের কথা শুনেছে এবং কিছু মানুষ তাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। যারা নবী-রাসূলের কথা শুনেছে তাদের প্রতি আল্লাহপাক খুশি ও সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং যারা নবী-রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করেছে, তাঁদের নসিহত ও হেদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে, আল্লাহপাকের প থেকে তাদেরকে এই দুনিয়াতেই ধ্বংস ও বরবাদ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

[আগস্ট-২০১৭ সংখ্যায় সমাপ্য]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight