আপন ভুবনে আল্লাহ্কে পাওয়ার সাধনা এ’তেকাফ : ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

এ’তেকাফ আরবী শব্দ, পবিত্র কুরআনের পরিভাষা। আভিধানিক অর্থ, কোন স্থানে অবস্থান করা। শরীয়তের পরিভাষায় এর অর্থ, রোযা ও এ’তেকাফের নিয়তসহ মসজিদে অবস্থান করা। মহিলারা মসজিদের পরিবর্তে ঘরে একটি জায়গা ঘেরাও দিয়ে আলাদা করে এ’তেকাফ করবেন। মাহে রমযান মানব জাতির জন্য আল্লাহ্র অগণিত অফুরন্ত রহমত ও নেয়ামত বয়ে এনেছে। তন্মধ্যে এ’তেকাফ অন্যতম। সাধারণত আমরা নেয়ামত বলতে অপ্রত্যাশিত টাকা-পয়সা, পদমর্যাদা বা অন্তত ভাল খাবার জিনিস বুঝি। কিন্তু এ’তেকাফের এ নেয়ামতের স্বাদ ভিন্নতর। এ’তেকাফ শুধু আজকে নয়, মানব সভ্যতার শুরু থেকে এর রেওয়াজ প্রচলিত। আল্লাহ্র নির্দেশে হযরত ইব্রাহীম আ. মক্কা নগরীতে যে তাওহীদী সভ্যতা ও সংস্কৃতির গোড়া পত্তন করেন তাতেও তাওয়াফ ও নামাযের সাথে এ’তেকাফ বিধিবদ্ধ ছিল। এমন কি হযরত ইব্রাহীম ও তাঁর পুত্র ইসমাইল আ. এর মাধ্যমে কাবাঘর নির্মাণের পেছনে আল্লাহ্র অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, এ ঘরে যেন তাঁর বান্দারা এসে এ’তেকাফ করেন। আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন,
আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, এ’তেকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পাক পবিত্র রাখ। [সূরা বাকারা : আয়াত ১২৫]
এই ঘোষণা ও নির্দেশ থেকেই এ’তেকাফের অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। ইসলামপূর্ব জাহেলিয়াতের যুগেও এ‘তেকাফের রেওয়াজ ছিল। যেমন হাদীসে বর্ণিত, হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত, একদা হযরত ওমর রা. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, হুজুর! জাহেলিয়া যুগে আমি এক রাত্রি মসজিদে হারামে এ‘তেকাফ করব বলে মানত করেছিলাম। হুজুর বললেন, তোমার মানত পূর্ণ কর। [বুখারী, মুসলিমের বরাতে মিশকাত]
দেহ ও অত্মা নিয়েই মানুষ। নানা ভোগ-বিলাসিতায় দেহ যখন সবল প্রবল হয় তখন নফস মোটা হয়, পশুবৃত্তির জন্ম নেয়। তখন আকারে-আকৃতিতে মানুষ থাকলেও মনের দিক থেকে, চরিত্রে মানুষ জন্তু-জানোয়ারের স্তরে নেমে যায়। আমাদের সময়ে জাগতিক শিার উচ্চতর বিদ্যাপিঠে অধ্যয়নের সময় যখন ছাত্ররা হত্যা, ধর্ষণ, সন্ত্রাস নিয়ে গর্ব করে তখন নির্দ্বিধায় বলা যায়, এরা আর মানুষ নয়, জন্তু-জানোয়ার। এ ধরনের জানোয়াররাই ধর্ষণের সেঞ্চুরী উদ্যাপন করে গোটা জাতির মুখে, শিা প্রতিষ্ঠানগুলোর কপালে কলঙ্কের কালি লেপন করেছিল।
আরো বিস্তৃত পরিসরে গেলে, আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট কিনটনের চারিত্রিক নষ্টামীর যে সব লজ্জাকর কুরুচিপূর্ণ ফিরিস্তি ইন্টারনেটে সারা দুনিয়ায় প্রচারিত হয়েছিল তাতে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, গায়ে সভ্যতার লেবাস থাকলেও এরা অসভ্যতার চরম সীমায় পৌঁছেছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড সাহেবের চরিত্রের যেসব কুরুচিপূূর্ণ তথ্য বিশ^ প্রচার মাধ্যমের খোরাক হয়েছে, তাও তো পাশ্চাত্য সভ্যতার জন্য লজ্জাজনক। হয়ত পাশ্চাত্যের অন্ধ ভক্তরা বলতে চাইবেন, এটি ওদের সমাজে কোন ব্যাপার নয়? এ নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথার প্রয়োজন কি? বলব : কোন ব্যাপার যদি না-ই হয় তাহলে কিনটন সাহেব নিজে পাপ করেছেন বলে স্বীকার করেছিলেন কেন? কেন এর জন্য আপন স্ত্রী, দেশের জনগণ, ঐ নষ্টা মেয়ে ও স্বয়ং বিধাতার কাছে মা চাইলেন? বর্তমান প্রেসিডেন্টকে নিয়ে ওদের মিডিয়ার লেখালেখিও প্রমাণ করে কাজটি নিশ্চয় গর্হিত হয়েছে। আরো ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে সেখানকার খ্রিস্টান ধর্মগুরুদের চারিত্রিক নষ্টামীর কাহিনী প্রতিনিয়ত সংবাদ মাধ্যমে আসে। যা প্রমাণ করে বর্তমান তথাকথিত সভ্য সমাজ সভ্যতার কোন স্তরে নেমে গেছে।

আসলে তাদের কাছ থেকে অত্মা, আত্মিক চেতনা ও নৈতিক চরিত্র বিদায় নিয়েছে। জাগতিক উন্নতি, পেশি শক্তির জোর মনুষ্যত্বের একমাত্র মূল্যবোধে পরিণত হয়েছে। পাশ্চাত্য জগত ও এর প্রভাবে আমাদের দেশেও অত্মার অপমৃত্যুতে আমাদের অবস্থা শিতি জানোয়ারের স্তরে নেমে এসেছে এবং কুরআন মজীদের সে ঘোষণার সমার্থক হয়েছে। আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন, আমি তো বহু জ্বিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। তাদের অন্তর আছে, কিন্তুু তার দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চু আছে তার দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের কর্ণ আছে তার দ্বারা শ্রবণ করে না। এরা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় বরং তার চেয়েও অধিক বিভ্রান্ত। তারাই হল গাফেল। [সূরা আরাফ : আয়াত ১৭৯]
অথচ আল্লাহ্ মানুষকে সৃষ্টির সেরা করে সৃষ্টি করেছেন। তাকে বানিয়েছেন ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ আপন ‘খলিফা’ প্রতিনিধি। তাই সৃষ্টির আদিতে আনুষ্ঠানিক অভিষেকে ফেরেশতারা সবাই প্রথম মানুষ আদম আ. কে সিজদা করেছিল; কিন্তু আজ তার অবস্থা…?
এ অধঃপতন হতে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় মানবাত্মার মুক্তি ও উৎকর্ষ সাধন, সর্বপ্লাবি আধ্যাত্মিক বিপ্লব। অত্মার শক্তি যখন প্রবল হয় তখন দেহের পশুশক্তি ও স্বভাব দুর্বল ও অত্মার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তখন মানুষের মর্যাদা ফেরেশতাদের ছাড়িয়ে যায়। এই আত্মিক উন্নতি বিধানের জন্যই সমগ্র মানব জাতির জন্য অফুরন্ত রহমত হয়ে এসেছে রমযান। আর তাতে অন্যান্য আয়োজনের মধ্যে রয়েছে এ’তেকাফ।
শহুরে পরিবেশে কর্মজীবনে আমরা যখন হাঁপিয়ে উঠি তখন এতটুকু শান্তির আশ্রয় চাই। এমন কোনো ঠিকানা খুঁজে বেড়াই, যেখানে নিরিবিলি নির্জনে আপন মনের সাথে কথা বলতে পারব। নিজকে আবিষ্কার করতে পারব। যারা জাগতিক অর্থ বৈভব, মতা ও পদমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত তাদের মনের মানুষটি আরো অসহায়ভাবে কাঁদে এমনি একটু জায়গা, একটুখানি আশ্রয়ের জন্য। তারা তাই ছুটে যায় পার্কে, ভ্রমণ বিলাসে, নিসর্গের কোলে অথবা অন্তত শরৎ ও শীতে প্রাতঃকালীন পায়চারিতে। কিন্তু তারা কি শান্তির নাগাল পায়?
নিঃসন্দেহে এ ধরনের অতৃপ্ত হৃদয়ের সবচেয়ে উত্তম ঠিকানা মসজিদ। মসজিদের নিভৃত অন্দরে এ’তেকাফ। এ’তেকাফে সংসারের সাথে সাময়িক সম্পর্ক ছিন্ন করে মানুষ চলে যায় আপন ভুবনে। সেখানে আপন মনের সাথে কথা বলে। নিজকে আবিষ্কার করে। অতীতকে বিশ্লেষণ করে। একান্তভাবে নিজেই নিজের মাঝে হারিয়ে যায়। তখনই খুঁজে পায় আরেকজন পরম সত্ত্বাকে। যিনি তার অত্মার আত্মীয়। যিনি তার মনের কানে সারাণ কথা বলেন। ইন্দ্রিয় আকর্ষণ প্রলোভন ও জাগতিক ব্যস্ততায় যে কথা শুনতে পায়নি এতদিন, আজ মসজিদের নিভৃত কোণে, মহিলারা ঘরের নিঃসঙ্গ অন্দরে সে কথা শোনে, তার সাথে কথা বলে। মনের সব কথা খুলে বলে। দুঃখ বেদনা যা আপন মায়ের কাছেও বলতে পারেনি, স্বামী স্ত্রীর কাছে, স্ত্রী স্বামীর কাছে প্রকাশ করতে সাহস করেনি, আজ সেগুলো একেক করে বলে মন হালকা করছে। আলমে আরওয়াহতে ‘ক্বালু বালা’ বলে তার সাথে যে চেনা-পরিচয় হয়েছিল তা এতদিন ভুলে রয়েছিল, আজ পুনঃপরিচয় হল। হৃদয়ের অটুট বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হল তার সাথে। তিনি আরশের মালিক হলেও আজ যেন একান্ত নিকটের। একেবারে কাছের। গর্দানের শাহ্রগের চাইতেও নিকটের।
দুনিয়ার সব মানুষই চায় পরম প্রেমাস্পদ আল্লাহ্র সাথে তার যোগাযোগ হোক। আল্লাহ্ সদা রহমতের দুয়ার খুলে রাখুন তার প্রতি। কিন্তু সে পথ পায় না খোঁজে। এমন অনেক ধর্ম আছে, যার অনুসারীরা সংসার ত্যাগ করে বৈরাগী সেজেছে। কিন্তু তার সন্ধান পায়নি তারা। কারণ ‘প্রপার চ্যানেল’ বলে একটি কথা আছে। এটা বাদ দিয়ে অযথা ঘুরলে ল্যভ্রষ্ট হতে হবে, হয়েছেও তাই। ইসলাম সেই সাধনার, তাঁকে পাওয়ার সরল-সহজ পথ দেখিয়েছে। আজীবন বৈরাগী হয়ে পথে ঘাটে উদভ্রান্ত হওয়া নয়, বরং সংসারে সংযমী হয়ে লোকালয়ে নিজের মনের মাঝে তাকে আবিষ্কার করার প্রক্রিয়া শিখিয়েছে, যার একটি এ’তেকাফ। অর্থাৎ কয়েকটি দিনের জন্য একমাত্র আল্লাহ্র হয়ে যাওয়া। তখনই আল্লাহ্র সাথে অত্মার গভীর বন্ধন সৃষ্টি হবে, আত্মিক জগতের জ্ঞান, রহস্য ও সম্পদ রাশি অবিরাম বর্ষিত হবে। আধ্যাত্মিক সম্পদ রাশির অন্যতম খনি লাইলাতুল কদর লাভ করতে হলে তাই প্রয়োজন এ’তেকাফ। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তা-ই করেছেন। নবুওয়াত লাভের পূর্বেও রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার অদূরে হেরা গুহায় ধ্যান মগ্নতায় কাটিয়েছেন বহু বছর। বিশেষত নবুওয়াত লাভের পূর্বে একাগ্র ধ্যানে নিমগ্ন ছিলেন হেরা গুহায় টানা ছয় মাস। কখনো মা খাদীজা রা. পৌঁছে দিতেন তার ধ্যানের ছবি প্রিয়তম স্বামীর কাছে দুর্গম পর্বত চূড়ায় হেরা গুহায় পানীয় ও আহার।
হযরত মূসা আ. এর জীবনেও আমরা দেখি একই দৃশ্য। বনি ইসরাইল ফেরাউনের অত্যাচার থেকে নিস্তার পেয়ে আল্লাহ্র প হতে হেদায়াত ও জীবন বিধানের জন্য প্রার্থনা জানায় হযরত মূসার আ. মাধ্যমে। আল্লাহ্ পাক দরখাস্ত মঞ্জুর করেন এবং তাওরাত প্রদানের পূর্বশর্ত হিসেবে বলেন, মূসা! তুমি তূর পর্বতে অবস্থান করে এক মাসকাল আমার আরাধনা ও অতন্দ্র সাধনায় নিমগ্ন থাক। তারপর আমি তোমাকে এক কিতাব দান করব। মূসা আ. তাই করলেন। ফলে তাওরাত লাভ করলেন। এরপর আরো দশদিন উপাসনা-আরাধনায় নিমগ্ন থাকার নির্দেশ দিলেন। কারণ ছিল, হযরত মূসা আ. এক মাস রোযা রাখার পর ইফতার করে ফেলেছিলেন। আল্লাহ্ তাআলার কাছে রোযাদারের মুখের গন্ধ অত্যন্ত প্রিয়। তাই মূসা আ. কে আরো দশদিন রোযা রাখতে নির্দেশ দিলেন। যেন পুনরায় সে গন্ধের উৎপত্তি হয়। এভাবে চল্লিশ দিন পূর্ণ হল। [মাআরেফুল কুরআন, সূরা বাকারার ৫২নং আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গ]
এ ধ্যানমগ্ন অবস্থানের সংপ্তি সংস্করণ এ’তেকাফ। এজন্য দেখা যায়, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুয়্যত লাভের পর হেরা গুহায় বা অন্য কোথাও পূর্বের ন্যায় ধ্যান মগ্নতার সাধনা করেননি, মাহে রমযানে এ’তেকাফের মাধ্যমে সে সাধনা অব্যাহত রেখেছিলেন। এ’তেকাফেই হযরত জিব্রাইল আ. এসে তাকে পূর্ণ কুরআন পড়ে শোনাতেন। কখনো তিনি নিজেই জিব্রাইল আ. কে পড়ে শোনাতেন। বড়ই সৌভাগ্য যে, তিনি পরম সাধনার এ দুর্লভ অথচ সহজ পথটি আমাদের জন্যও খোলা রেখেছেন, উৎসাহিতও করেছেন। রাসূলে পাকের এ’তেকাফ সম্পর্কে হাদীস শরীফে বর্ণিত, হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বরাবর রমযানের শেষ দশকে এ’তেকাফ করেছেন, যতদিন না আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং তারপর তার বিবিগণও এ’তেকাফ করেছেন। [বুখারী, মুসলিম, মিশকাত]

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, দানের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বাপো দরাজ দিল। তার এই দরাজদিলী রমযানে সর্বাপো অধিক বেড়ে যেত। রমযানে প্রত্যেক রাতেই জিব্রাইল আ. তার সাথে সাাত করতেন এবং তিনি (নবী করিম সা.) তাঁকে কুরআন পাক শুনাতেন। যখন তার সাথে জিব্রাইল আ. সাাত করতেন তখন তাঁর দান, বর্ষণকারী বাতাস অপোও বেড়ে যেত। [বুখারী, মুসলিম, মিশকাত]

মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমী রহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, এ’তেকাফ অবস্থায়ই হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিব্রাইল আ. কে কুরআন শোনাতেন। এ কারণেই হাদীসটি (মিশকাত শরীফে) এ’তেকাফ অধ্যায়ে আনা হয়েছে।
হযরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণিত আরেকটি হাদীস প্রণিধানযোগ্য।
হযরত আবু হুরাইরা রা. বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কুরআন আবৃত্তি করা হত প্রতি বছর (রমযানে) একবার, কিন্তু যে বছর তিনি ইন্তেকাল করলেন সে বছর আবৃত্তি করা হল দু’বার। তিনি প্রত্যেক বছর দশদিন এ’তেকাফ করতেন; কিন্তু যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন সে বছর বিশ দিন এ’তেকাফ করলেন। [বুখারী, মিশকাত]
প্রথমে জিব্রাইল আ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরআন আবৃত্তি করে শোনাতেন, অতঃপর হুজুর তাকে শোনাতেন। কাজেই উভয় হাদীসে কোন বিরোধ নেই। এ’তেকাফ করার প্রধান উদ্দেশ্য শবে কদর তালাশ করা। আমরা শবে কদর শিরোনামে প্রবন্ধে বিষয়টি সবিস্তারে আলোচনা করেছি।
এ’তেকাফ রাসূলে পাকের (সা.) সুন্নত। তবে গুরুত্ব অনুসারে এ’তেকাফের তিনটি ভাগ :
(১) ওয়াজিব-এ’তেকাফের মানত করা হলে তা পূর্ণ করা ওয়াজিব।
(২) সুন্নাতে মোআক্কাদা-রমযানের শেষ দশদিন এ’তেকাফ করা সুন্নতে মোয়াক্কাদা। তবে আমাদের ফকীহগণ একে কেফায়া বলেছেন। অর্থাৎ মসজিদের আওতাধীন মহল্লার কোন একজন এ’তেকাফ করলে অপর লোকেরা গোনাহ হতে বেঁচে যাবে। কেউ এ’তেকাফ না করলে সবাই গোনাহগার হবে।
(৩) মোস্তাহাবÑ ওয়াজিব ও সুন্নত এ’তেকাফ ছাড়া অন্য এ’তেকাফ মোস্তাহাব এবং তা স্বল্প সময়ের জন্যও হতে পারে।
বায়তুশ শরফের মরহুম পীর ছাহেব হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল জব্বার রহ. এ’তেকাফের আধ্যাত্মিক নেয়ামতসমূহকে সাধারণের বোধগম্য ভাষায় খুব সুন্দর-সহজরূপে বর্ণনা করেন। তার ভাষায় এ’তেকাফের উপকারিতা :
এ’তেকাফের মধ্যে দিল আল্লাহ্ ছাড়া অন্য সব কিছু হতে খালি হয়ে মানুষ শুধু আল্লাহ্র ধ্যানেই রুজু বা মগ্ন থাকে।
এ’তেকাফকারী মানুষের সংশ্রব হতে দূরে থেকে শুধু আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পায়।
এ’তেকাফ দ্বারা মানুষের নফসের কুপ্রবৃত্তি ও কু-ধারণা লোপ পায়।
এ’তেকাফ দ্বারা মানুষ দুনিয়ার সবকিছু হতে মুখ ফিরিয়ে শুধু আল্লাহ্র ধ্যানে মগ্ন হয় বলে সে সত্যিকার আল্লাহ্র সন্ধানী বলে প্রমাণিত হয়।
এ’তেকাফের মধ্যে আল্লাহ্ তাআলার খাঁটি প্রেম, তার ওপর ভরসা ও স্বল্পে সন্তুষ্টির ভাব লাভ হয়।
এ’তেকাফের মধ্যে মানুষ সর্ব প্রকার গোনাহ্ হতে বেঁচে থাকে। কেননা মানুষ মানুষের সংশ্রব দ্বারাই মিথ্যা, পরনিন্দা, গীবত ইত্যাদি গোনাহে লিপ্ত হয়।
এ’তেকাফের দ্বারাই মানুষ আল্লাহ্র খাস রহমত পাবার যোগ্যতা লাভ করে। যেমন হযরত মূসা আ. কে চল্লিশ দিন এ’তেকাফ করার পরই তাওরাত দান করা হয়েছিল। আমাদের নবী করিমও (সা.) গারে হেরার মধ্যে ছয় মাস এ’তেকাফ ফরমায়েছেন। তৎপর তিনি নবুওয়াত ও পবিত্র কুরআনে করীম প্রাপ্ত হয়েছেন। [মাসিক দ্বীন দুনিয়া, জুলাই ১৯৮২]

এ’তেকাফের অফুরন্ত নেয়ামত রূহানী। আত্মার অনুভব দিয়েই লাভ করা যায় এ নেয়ামত। এক লোক রসগোল্লা মুখে দিয়ে বলে উঠল : দারুণ! অন্যরা মর্ম বুঝতে পারল না। তারা হাসল। মিষ্টান্নের স্বাদ মুখে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়। অন্যের মুখে আরেকটি তুলে দিয়ে বুঝানো যায়। আবার কিছু স্বাদ আছে, যা রসনায় ধরে না, মনের ব্যাপার। পরীার ফলাফল সংবাদপত্রে ছাপা হলে এক ছাত্র আনন্দে আত্মহারা। তার এ স্বাদ ও আনন্দ রসগোল্লার চেয়ে ভিন্নতর। সে ছাড়া আর কেউ অনুভব করতে পারবে না কি নেয়ামত সে লাভ করেছে। এ’তেকাফের নেয়ামত আরো গভীর। আরো তাৎপর্যবহ। পরম আরাধ্য আল্লাহ্র সাথে বন্ধন গড়ার পরম আনন্দ, তার নৈকট্য ও সান্নিধ্যের এ আনন্দ ও স্বাদ কেবল অত্মার অনুভব দিয়েই আঁচ করা যায়। সেই অপার্থিব অনুভবের প্রত্যাশায় একটি হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রবন্ধের ইতি টানব।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, রাসূলাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ’তেকাফকারী সম্পর্কে বলেছেন, সে গোনাহসমূহ হতে বেঁচে থাকে এবং তার জন্য ঐ ব্যক্তির ন্যায় নেকীসমূহ লেখা হয়, যে বাইরে থেকে যাবতীয় নেক কাজ সম্পাদন করে। [ইবনু মাজা, মিশকাত]
বুজর্গানে দ্বীন এ’তেকাফের নূন্যতম উপকারিতা সম্পর্কে বলেন :
এ’তেকাফ মানুষকে দুনিয়ার ঝামেলা ত্যাগ করার অভ্যাস শিা দেয়, অল্প সময়ের জন্য হলেও আল্লাহ্র সাথে তার সম্পর্ক জুড়ে দেয়। এর দ্বারা মানুষের জন্য অন্তিমকালে দুনিয়া ত্যাগ করা সহজ হয়। দুনিয়ার মহব্বতের স্থলে আল্লাহ্র মহব্বত বৃদ্ধি পায়। এ’তেকাফকারীর উদাহরণ সেই অভাবগ্রস্ত ব্যক্তির মত, যে কোন মহান দয়ালু ব্যক্তির দরবারে গিয়ে হাত পেতে থাকে এবং বলে যে, যতণ আমার প্রয়োজন পূরণ করা না হয় ততণ আমি এ দরবার ত্যাগ করব না।
লেখক : সাবেক শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, কলামিস্ট, বহুগ্রন্থ প্রণেতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight