আদরের সন্তান: মোহাম্মদ দিলখোলাশা জাহিদ খান

আমাদের সমাজে কত রকমের হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটে চলেছে প্রতিদিন। কেউ শত কষ্টের মাঝেও জীবন সংসার অতিবাহিত করতে হয়। কেউ আবার হারিয়ে যাচ্ছে অজানার উদ্দেশ্যে কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য। প্রতিটি মানুষ চায় একটু সুখ, একটু ভালোবাসা, একটু আদর। কিন্তু এই সুখ পাখি যে সবার কাছে এসে ধরা দেয় না। এমনি একটা ঘটনা তুলে ধরছি।
করিম সাহেব ছিলেন এলাকার মান্যগণ্য ব্যক্তি সমাজের সবাই তাঁকে সম্মান করতো। করিম সাহেব ছিল এলাকার সহজ-সরল প্রকৃতির একটা মানুষ। দিনকার ভালোই চলছিল তাঁর। করিম সাহেবের ছিল দুটি ছেলে সন্তান। ছোট ছেলেটা শিশুকালে ভীষণ অসুস্থ হয়ে চিকিৎসকের অবহেলায় মারা যায়। বড় ছেলে জাহিদকে নিয়েই এখন সব স্বপ্ন তাঁর। জাহিদ একে একে এস এস সি পাশ করে গোল্ডেন মার্ক পেয়ে।
এলাকার সবাই জাহিদকে মারহাবা দিচ্ছে, জাহিদের মা-বাবাও অনেক খুশি হলেন ছেলের ভালো রেজাল্ট দেখে। একদিন রাতে জাহিদ তার বাবাকে বলছে, বাবা! আপনি তো আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন এই জীবনে! আরেকটু কষ্ট করবেন  বাবা! আমার জন্য?
করিম সাহেব বললেন, বাবা! তুমি কি বলতে চাও স্পষ্ট করে বলো। জাহিদ বললো, বাবা! আমার ছোট ভাই যখন অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার অভাবে মারা যায় তখন থেকে আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আমি অনেক বড় ডাক্তার হবো। বাবা! তুমি কি পারবে আমাকে ডাক্তার বানাতে? কিরম সাহেব চোখের পানি ছেড়ে বললেন, তুই আমার আদরের সন্তান, কিলজার টুকরা। তোর মনের কোনো চাহিদা পূরণ করতে আমি বাকি রেখেছি, বলতে পারবি? বাবা! আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও আমি তোমাকে লেখা-পড়া করিয়ে অনেক বড় ডাক্তার বানাবো। তোর মনের সব আশা আমি পূর্ণ করবো ইনশাআল্লাহ!
করিম সাহেবের আবাদী কিছু জায়গা-জমি ছিল, সব জায়গা-জমি বিক্রি করে জাহিদকে ডাক্তার বানানোর বুক ভরা আশা নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করিয়ে দিল। ডাক্তারি পড়া ভালোই চলছিলো জাহিদের। দুই বছর পর সে বাড়িতে আসলো। করিম সাহেবকে বললো, বাবা! আমার টাকা লাগবে। বাবা! আমার হাতে তো টাকা নেই; বললেন করিম সাহেব। জাহিদ বললেন, বাবা! যেভাবেই হোক টাকা আমাকে দিতেই হবে। করিম সাহেবের মৃত বাবার রেখে যাওয়া শেষ সম্বলটুকু (বাড়ি) বিক্রি করে টাকা দিলেন ছেলেকে। এলাকার সবাই বলাবলি করতে লাগলো, করিম সাহেব আসলেই একজন উদার-বড় মনের মানুষ। ছেলেকে ডাক্তার বানানোর জন্য নিজের শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে দিলেন!
করিম সাহেবের কষ্টের যেন অন্ত নেই; জীবন আর চলছে না। যখন কষ্টের কথা মনে পড়ে তখন তার দম যেন বন্ধ হয়ে আসে। কিছুদিন পর জাহিদ ফোন করলো, বাবা! আর কোন চিন্তা করো না, আমি একমাস পর ডাক্তার হয়ে বাড়িতে ফিরবো! তোমাদের সব দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিব। তবে আরো পাঁচ হাজার টাকা আমার প্রয়োজন, যেভাবেই হোক যোগাড় করে দাও।
করিম সাহেবের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো, পাঁচ হাজার টাকা এই মুহূর্তে কোথায় পাবে?  করিম সাহেব জাহিদের মা রাবেয়া বেগমকে বললো, তুমি একমাসের জন্য কোন বাড়িতে কাজ করো, আর আমি রিকশা চালাবো। জাহিদের মা বললো, আমার সন্তানের জন্য আমি সব করতে পারবো। রাবেয়া বেগম তাঁর স্বামীকে বললো, আচ্ছা, তোমাকে একটা কথা বলবো রাখবে? অবশ্যই, কি কথা বলো রাবেয়া! শুনেন আজ থেকে আমরা দু’জন পূর্ণ একমাস নফল রোজা রাখবো। সন্ধ্যার  সময় ইফতারী করবো আর রাতে সেহরী খাবো। দুপুরের খাবারের টাকাটা জমাবো। আর তুমি রাত করে রিকশা চালাবে, কারণ, ছেলে ডাক্তার হয়ে বাড়িতে আসতেছে। মানুষের কাছে যদি শুনে তুমি রিকশা চালাও, তবে আমাদের ছেলে কষ্ট পাবে। আর মান-সম্মানেরও তো একটা কথা আছে নাকি?
করিম সাহেব বলল ঠিক আছে, তুমি যখন বললে তখন আজ থেকে রোজা রাখবো। এক বেলা খাবারের টাকা বাঁচিয়ে এবং রিকশা চালানোর টাকা জাহিদকে দিবে। করিম সাহেব রাত ১০-থেকে ভোর ৪ টা পর্যন্ত রিকশা চালায়। এবং সারাদিন রোজা রাখে। জাহিদের মা বড়লোকের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে এবং সারাদিন রোজা রাখে। করিম সাহেব ২০ দিনের মধ্যে ৫ হাজার টাকা জমিয়ে জাহিদের জন্য পাঠিয়ে দেয়। জাহিদকে বলে বাবা! টাকা পেয়েছো? জী বাবা! পেয়েছি, জানায় জাহিদ।
আর চিন্তা করো না ১০ দিন পর আসতেছি। করিম সাহেব যেন একটু সুখের পূর্বাভাস পেলো। ১০ দিন পর জাহিদের বাবা তার মোবাইলে কল দেয়। কিন্তু জাহিদের মোবইলটা বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। চিন্তায় বড্ড পেরেশান হয়ে গেলো জাহিদের বাবা-মা!
না জানি ছেলের কী হল! সম্ভাব্য ডাক্তার জাহিদের আশায় প্রহর গুণতে ছিলো তার বাবা-মা। আকাশের তারা যেমন আমাবর্ষার রাতে হারিয়ে যায়, ঠিক তেমনি ডাক্তার জাহিদও হারিয়ে গেল তার বাবা-মা’র কাছ থেকে। ডাক্তার জাহিদের ডাক্তারি সার্টিফিকেট পেতে আর মাত্র ৪ দিন বাকি, এমন সময় একটা সুন্দরী মেয়ে জাহিদের চোখে ধরা দিল যেন তার কতদিনের চেনা মুখ। জাহিদ সুন্দরী মেয়েটিকে প্রেমের অফার দিলে সে রাজি হয়ে যায়। মেয়েটির নাম ছিল বুশরা, বুশরা জাহিদকে এমন ভালোবাসা দিল। জাহিদ বুশরার ভালোবাসাতে মুগ্ধ হয়ে পাগলপারা হয়ে গেল বিয়ে করার জন্য। মা-বাবাকে না জানিয়ে জাহিদ বুশরাকে বিয়ে করে ফেললো। ঢাকা শহরে বুশরাদের আলিশান বাড়ি। বাশর রাতে বুশরা জাহিদকে বললো তোমার বাড়িতে কে কে আছে? শুধু আমার মা-বাবা আছে, বললো জাহিদ। বুশরা বললো, আজ থেকে তোমার মা-বাবার সাথে কথা বলা বন্ধ এই বলে জাহিদের সিম কার্ডটি দু’টুকরো করে ফেললো। আর বললো, তুমি যদি আমার অনুমতি ছাড়া কখনো তোমার মা-বাবার কাছে যাও তাহলে আমি তোমাকে ডিভোর্স দিতে দেরি করবো না। এইভাবে চলে গেল জাহিদের আট বছরের সংসার জীবন। এদিকে করিম সাহেবের জীবন যেন আর চলছে না। তার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে মাকড়সার জালের মত। দিনে ঘুমায় রাতে রিকশা চালায়। এভাবে বুক ভরা কষ্ট নিয়ে তাদের সংসার চলছে। দশ বছর পর জাহিদের সাথে তার এক দূরসম্পর্কীয় চাচার সাক্ষাত হয়। আরে তুমি করিম ভাইয়ের ছেলে জাহিদ না? জী চাচা! আমি জাহিদ। আরে কেমন অকৃতজ্ঞ সন্তান তুমি? তাড়াতাড়ি বাড়িতে যাও, তোমার মা ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত। প্রতিনিয়ত যেন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। যদি তাকে জীবিত দেখতে চাও তাহলে আজই চলে যাও। মনে রাখবে বউ হারালে বউ পাবে, কিন্তু মা হারালে জগত জুড়ে খুঁজে পাবে না। তোমার বাবা-মা তোমাকে মানুষের মত মানুষ বানাতে দিন-রাত কত কষ্ট সহ্য করে আসছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না।
চাচার মুখে এসব কথা শুনে জাহিদ অস্থির হয়ে গেল বাবা-মা’র চাঁদ মুখটা একনজর দেখার জন্য। বিলম্ব না করে জাহিদ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। গভীর রাতে জাহিদ গাড়ি থেকে নামলো। মাঘ মাসের শীত, কুয়াশা পড়ছে বৃষ্টির গুড়ি গুড়ি ফোটার মত। কুয়াশার কারণে পথ চলতে পারছে না জাহিদ। এমন সময় জাহিদের চোখে ধরা দিল জোঁনাকি পোকার মত মিটি মিটি আলো নিয়ে তার দিকে কী যেন আসছে। পরক্ষণেই বুঝা গেল সেটা রিকশার আলো। এই রিকশা যাবে? জী বাবা! যাবো উঠেন। চাদরে ঢাকা শরীর; মাফলার দিয়ে মুখ আবৃত রিকশা যেন চলছে না। থরথর করে শীতে হাত-পা কাপছে রিকশাওয়ালার। জাহিদ রিকশাওয়ালার পিঠে ধাক্কা দিয়ে বললো, ঐ মিয়া জলদি যান। শীতে পা যেন চলছে না, আর আগের মত গায়ে শক্তিও নেই।
রিকশা থেমে থেমে যাওয়ার অবস্থা। এমন সময় জাহিদ রিকশাওয়ালার পিঠে জোরে ধাক্কা দিয়ে বলে ঐ বেটা ভাড়া তো ঠিকই নিবা, দ্রুত চালাতে পারো না? জাহিদের ধাক্কা খেয়ে রিকশাওয়ারা মাটিতে পড়ে গেল। রিকশাওয়ারা বললো, বাবা! রিকশা থেকে আমার হারিকেনটা নিয়ে একটু এদিকে আসেন। আমার কিছু হারিয়েছে। এই বলে শরীরের চাদরটা খুললেন মুখের মাফলারটা খুললেন। রিকশওয়ালা দেখলেন তার দুটি দাঁত পরে গেছে। জাহিদ তো হারিকেনের আলোতে বাবাকে চিনে ফেললেন। সে এখন কি করবে ভেবে পাচ্ছে না, শুধু এতটুকু বুঝতে পেরেছে, জীবনে অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে তার। দুঃখে-অনুতাপে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বাবার পা’ জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। বাবা আমাকে ক্ষমা করে দাও; বাবা আমাকে ক্ষমা করে দাও। করিম সাহেব ছেলেকে উঠিয়ে বুকে নিলেন। কোন বাবা-মা’ই সন্তানের প্রতি রাগ-গোস্বা করে থাকতে পারে না; বললেন করিম সাহেব। চল বাবা! তর মা’র অবস্থা ভালো না, তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে হবে।
এই রাবেয়া দেখো কে এসেছে তোমার হারিয়ে যাওয়া পুত্রধন এসেছে। জাহিদের মা’র কোন আওয়াজ শুনা যাচ্ছে না। জাহিদ অস্থির হয়ে আছে মা’র চাঁদ মুখটা দেখার জন্য। ঘরে গিয়ে দেখলেন মায়ের নিথর দেহটা পরে আছে ঠান্ডা হয়ে। চিরদিনের জন্য চলে গেছেন না ফেরার দেশে। করিম সাহেব স্ত্রীর মরা মুখটা দেখে আল্লাহু আকবার বলে চলে গেলেন অন্ধকার কবরের যাত্রী হয়ে। জাহিদ খান মা-বাবার বুকের উপর মাথা রেখে কাঁদে আর বলে আমি এমন হতভাগা সন্তান, নিজের গর্ভধারীনী মায়ের কাছ থেকে মাফটুকুও নিতে পারলাম না। দুনিয়ার লোভে পরে বাবা-মা আমি তোমাদের অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। আমাকে ক্ষমা কর। আমি চিরদিনের জন্য এতিম ও কাঙ্গাল হয়ে গেলাম। আমি জীবনে যা করেছি সব ভুল। মা-বাবার জন্য আমি কিছুই করতে পারলাম না। যাদের শরীরের রক্ত পানি করে আমাকে ডাক্তার বানিয়েছে; ১০ বছর একাধারে রোজা রেখেছে আমাকে ফিরে পাওয়ার জন্য। বাবা-মার প্রশংসা করতে করতে আল্লাহর কাছে মাফ চাইতে চাইতে নিজের ভুল সে বুঝতে পারলো। বাব-মার জন্য কান্না করতে করতে জাহিদ জ্ঞান হারিয়ে ফেললো।
লেখক: গল্পকার, কথাসাহিত্যিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight