আদম আ. এর ওফাত ও আপন পুত্র শীছ আ. এর প্রতি তার অসিয়ত : সংকলন- আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের

Sristi jogot

পূর্ব প্রকাশিতের পর..
শীছ অর্থ আল্লাহর দান। হাবীলের নিহত হওয়ার পর তিনি এ সন্তান লাভ করেছিলেন বলে আদম ও হাওয়া আ. তার  নাম রেখেছিলেন শীছ।
আবু যর রা. রাসূলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আল্লাহ তাআলা একশ চারখান সহীফা নাযিল করেন। তন্মধ্যে পঞ্চাশটি নাযিল করেন শীছ আ. এর উপর।
মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. বলেন, মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে আদম আ. তার পুত্র শীছ আ. কে ওসীয়ত করেন, তাকে রাত ও দিবসের ক্ষণসমূহ এবং সেসব ক্ষণের ইবাদত সমূহ শিখিয়ে যান ও ভবিষ্যতে ঘটিতব্য তুফান সম্পর্কে অবহিত করে যান। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. বলেন, আজকের সকল আদম সন্তানের বংশধারা শীছ পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে যায় এবং শীছ ব্যতীত আদম আ. এর অপর সবকটি বংশধারাই বিলুপ্ত হয়ে যায়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
কোন এক জুমুআর দিনে আদম আ. শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে ফেরেস্তাগণ আল্লাহর পক্ষ হতে জান্নাত থেকে কিছু সুগন্ধি ও কাফন নিয়ে তার নিকট আগমন করেন, এসে তার পুত্র এবং স্থলাভিষিক্ত শীছ আ. কে সান্ত্বনা দেন। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. বলেন, তখন সাত দিন ও সাতরাত পর্যন্ত চন্দ্র ও সূর্যের গ্রহণ লেগে থাকে।
ইমাম আহমদের পুত্র আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেন যে, ইয়াহয়া ইবনে যামরা সাদী বলেন, মাদীনায় আমি এক প্রবীণ ব্যাক্তিকে কথা বলতে দেখে তার পরিচয় জানতে চাইলে লোকেরাবলল, ইনি উবাই ইবনে কাব। তখন তিনি বলছিলেন যে, আদম আ. এর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি তার পুত্রদেরকে বললেন, আমার জান্নাতের ফল খেতে ইচ্ছে হয়। ফলে তারা ফলের সন্ধানে বের হয়ে পড়ে। পথে তাদের সঙ্গে কতিপয় ফেরেশতার  সাক্ষাৎ ঘটে। তাদের সাথে আদম আ. এর কাফন সুগন্ধি কয়েকটি কুঠার কোদাল ও থলে ছিল। ফেরেশতারা তাদেরকে বলল, হে আদম পুত্রগণ তোমরা কী চাও এবং কি খুঁজছো? কিংবা বলল, তোমরা কি উদ্দেশ্যে এবং কোথায় যাচ্ছো? উত্তরে তারা বলল, আমাদের পিতা অসুস্থ। তিনি জান্নাতের ফল খাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। এ কথা শুনে ফেরেশতাগণ বলল তোমরা ফিরে যাও। তোমাদের পিতার ইন্তিকালের সময় ঘনিয়ে এসেছে। যা হোক ফেরেশতাগণ আদম আ. এর নিকট আসলে হাওয়া আ. তাদের চিনে ফেলেন এবং আদম আ. কে জড়িয়ে ধরেন তখন আদম আ. বললেন আমাকে ছেড়ে দিয়ে তুমি সরে যাও। কারণ তোমার আগেই আমার ডাক পড়ে গেছে। অতএব আমি ও আমার মহান রব এর ফেরেশতাগণের মধ্য থেকে তুমি সরে দাড়াও। তারপর ফেরেশতাগণ তার জানকবয করে নিয়ে গোসল দেন। কাফন পরান, সুগন্ধি মাখিয়ে দেন এবং তার জন্য বগলি কবর খুঁড়ে জানাযার নামায আদায় করেন। তারপর তাকে কবরে রেখে দাফন করেন। তারপর তারা বললেন, হে আদমের সন্তানগণ। এ হলো তোমাদের দাফনের নিয়ম। এর সনদ সহীহ।
ইবনে আসাকির র. ইবনে আব্বাস রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন। ফেরেশতাগণ আদম আ. এর জানাযায় চারবার, আবু বকর রা. ফাতেমা রা. এর জানাযায় চারবার, উমর রা. আবু বকর রা. এর জানাযায় চারবার এবং সুহায়িব রা. উমর রা. এর জানাযায় চারবার তাকবীর পাঠ করেন। ইবনে আসাকির বলেন, শায়বান ব্যতীত অন্যান্য রাবী মাইমুন সূত্রে ইবনে উমর রা. থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেন।
আদম আ. কে কোথায় দাফন করা হয়েছে এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। প্রসিদ্ধ মত হলো, তাকে সে পাহাড়ের নিকটে দাফন করা হয়েছে। যে পাহাড় থেকে তাকে ভারতবর্ষে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। কেউ কেউ বলেন, মক্কার আবু কুবায়স পাহাড়ে তাকে দাফন করা হয়। কেউ কেউ বলেন, মহা প্লাবণের সময় হযরত নূহ আ. আদম ও হাওয়া আ. এর লাশ একটি সিন্দুকে ভরে বায়তুল মুকাদ্দাসে দাফন করেন। ইবনে জারীর এ তথ্য বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য যে আদম আ. এর ওফাতের এক বছর পরই হাওয়া আ. এর মৃত্যু হয়।
আদম আ. এর আয়ূ কত ছিল এ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। ইবনে আব্বাস রা. ও আবু হুরায়রা রা. থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত হাদীসে আমরা উল্লেখ করে এসেছি যে, আদম আ. এর আয়ূ লাওহে মাহফুজে এক হাজার বছর লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। আদম আ. নয়শত ত্রিশ বছর জীবন লাভ করেছিলেন বলে তাওরাতে যে তথ্য আছে, তার সঙ্গে এর কোন বিরোধ নেই। কারণ ইহাহুদিদের এ বক্তব্য আপত্তিকর এবং আমাদের হাতে যে সংরক্ষিত সঠিক তথ্য রয়েছে তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে তা প্রত্যাখ্যাত। তাছাড়া ইহাহুদিদের বক্তব্য ও হাদীসের তথ্যের মাঝে সমন্বয় সাধন করাও সম্ভব। কারণ তাওরাতের তথ্য যদি সংরক্ষিত হয়। তা হলে তা অবতরণের পর পৃথিবীতে অবস্থান করার মেয়াদের উপর প্রয়োগ হবে। আর তা হলো সৌর হিসাবে নয়শত ত্রিশ বছর আর চন্দ্র হিসাবে নয় শত সাতান্ন বছর। এর সঙ্গে হবে ইবনে জারীর এর বর্ণনানুযায়ী অবতরণের পূর্বে জান্নাতে অবস্থানের মেয়াদকাল তেতাল্লিশ বছর। সর্বসাকুল্যে এক হাজার বছর।
আতা খুরাসানী বলেন, আদম আ. ইন্তিকাল হলে গোটা সৃষ্টিজগত সাতদিন পর্যন্ত ক্রন্দন করে। ইবনে আসাকির রহ. এ তথ্য বর্ণনা করেন। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র শীছ আ. তার স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি সে হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী নবী ছিলেন যা ইবনে হিব্বান তার সহীহ এ আবু জর রা. থেকে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেন যে, শীছ আ. এর উপর পঞ্চাশটি সহীফা নাযিল হয় এরপর তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসলে তার ওসীয়ত অসুসারে তার পুত্র আনূশ মাহলাইল দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পারসিকদের ধারণামতে এ মাহলাঈল সপ্তরাজ্যের তথা গোটা পৃথিবীর রাজা ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম গাছপালা কেটে শহর নগর ও বড় বড় দুর্গ নির্মাণ করেন। বাবেল ও সূস আল আকসা নগরী তিনিই নির্মাণ করেন। তিনিই ইবলীস ও সাঙ্গপাঙ্গদেরকে পরাজিত করে তাদেরকে পৃথিবী থেকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহ এবং বিভিন্ন পাহাড়ী উপত্যকায় তাড়িয়ে দেন। আর তিনিই একদল অবাধ্য জিন ভূতকে হত্যা করেন। তার একটি বড় মুুকুট ছিল। তিনি লোকজনের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা প্রদান করতেন। তার রাজত্ব চল্লিশ বছর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র য়ারদ তার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এরপর তারও মৃত্যুও সময় ঘনিয়ে এলে তিনি আপন পুত্র খানুখকে ওসীয়ত করে যান। প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী এ খানুখই হলেন ইদরীস আ.।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight