আজকের যৌবনেও নেমে আসবে বার্ধক্যের ছায়া : জামিল আহমদ

ভালো লাগে আব্বু যখন
বাহির থেকে ফেরেন,
নতুন নতুন জিনিস দিয়ে
খুব আদর করেন।
ভালো লাগে আম্মু যখন
খোকা বলে ডাকেন,
¯েœহের পরশ দিয়ে আমায়
বুকে আগলে রাখেন।

সত্যিই শৈশব খুব মজার। অনেক আনন্দ হয় শিশুকালে। একমাত্র এখানেই নির্মল আনন্দের সমাহার, যাকে কোন দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে না বা করতে পারে না। সকল প্রকার বিপদাপদে ঢাল স্বরূপ ভূমিকা পালন করেন মহান দুইজন ব্যক্তি। এই সুমহান ব্যক্তিদ্বয় সবকিছু নিজেদের উপর চাপিয়ে নেন স্রেফ শিশুটিকে আনন্দ দেওয়ার জন্য। নিজেদের সকল আরাম-আয়েশ পরিত্যাগ করেন শুধুমাত্র ছোট্ট বাচ্চাটির জীবনে সুখের সূর্য উদিত করার লক্ষ্যে। নিজেদেরকে বিলীন করে সন্তানের মুখে একটু হাসি ফুটাতে পারাই যেন তাদের জীবনের সার্থকতা। এরই নাম মা-বাবা; একেই বলে পিতা-মাতা।

দয়াময় আল্লাহ পৃথিবীর সকল পিতা-মাতার অন্তরেই তার সন্তানের জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তাই সকল মা-বাবা তার সন্তানকে নিজের থেকেও অনেকানেক গুণ বেশি ভালোবাসেন। এ প্রসঙ্গে ছোট্ট একটি ঘটনা পেশ করা যায়। আমার বয়স তখন ছয় বা সাত হবে। আমার ছোট আপু সাবিনা একদিন রান্নাঘরে খাবার পাক করছিলেন। সহসা ঘটল এক দুর্ঘটনা। আপুর বেখেয়ালে কাপড়ে আগুন লেগে গেল। নতুন কাপড় পেয়ে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। তাই আপু ভয় পেয়ে জোরে চিৎকার শুরু করলেন। যা আমি ও মা ঘরে বসে স্পষ্টভাবে শুনতে পেলাম। আপুর কন্ঠ শুনা মাত্রই মা ঘর থেকে দৌঁড়ে বের হলেন। আপুর গায়ে আগুন দেখে তো আমি বিমূঢ়। মনে করলাম হয়ত আপু আর…। কিন্তু না। কালবিলম্ব না করেই মা আপুর নিকট দৌঁড়ে গেলেন এবং নিজ হাত দ্বারা আগুন নেভাতে শুরু করলেন। ইত্যবসরে আগুন নিভে গেল। আপুকে বুকে জড়িয়ে নিলেন মা। আর পুরো ঘটনা স্বচক্ষে দেখলাম আমি।

আচ্ছা, অন্য কেউ কি পারত এমন করতে? নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে অন্যের জীবন রক্ষা করতে? কোন প্রতিদান ছাড়াই অন্যের জন্য জীবন বিলিয়ে দেওয়ার এমন নজির কি আছে পৃথিবীর বুকে? মা সন্তানের জন্য কি না পারেন? দিতে পারেন নিজের মহামূল্যবান জীবনটাও।

এটা কেবলমাত্র মানুষের ক্ষেত্রে নয় বরং সকল প্রাণীর বেলায়ই প্রযোজ্য। মা-বাবার এই মুহাব্বত ভালোবাসা শুধুমাত্র শৈশব পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়। সন্তানের প্রতি মা-বাবার এই ভালোবাসা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এমনকি মৃত্যুর পরেও সমানভাবে বিদ্যমান থাকে। যে ভালোবাসায় কোন ঘাটতি নেই। তাইতো পদে পদে সন্তানের কল্যাণার্থে তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন। তাদের ভালোবাসার পাত্র সন্তানটির দুনিয়া ও আখিরাতের জীবন কীভাবে উজ্জ্বল করা যায় তার সকল চেষ্টা প্রয়োগ করেন। যখন লেখা-পড়ার বয়স হয় তখনই লেখা-পড়ার প্রতি বিশেষ তারগীব দিয়ে থাকেন। কবির ভাষায়-
সকাল হলে আম্মু বলেন
মাদ্রাসাতে যাও,
কুরআন-হাদীস শিখে তুমি
জীবনটা সাজাও।
সন্ধ্যা হলে আব্বু বলেন
পড়তে বস খোকা,
অবমান্যে জীবন গড়ায়
খাবে না আর ধোঁকা।

নিজেদের যত কষ্টই হোক না কেন সন্তান যেন লেখা-পড়া শিখে ইহকাল ও পরকালে সফল হতে পারে তার সর্বশেষ চেষ্টা করে থাকেন পিতা-মাতা। এর নমুনা হিসাবে একটি ঘটনা তুলে ধরা যায়। আমার অতি প্রিয় একজন মানুষ তার লেখা-পড়ার জীবনে কোন একটি কাজে একবার আমি তার নিকট গেলাম। তখন দেখলাম, তিনি মন খারাপ করে বসে আছেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি কেঁদে ফেললেন। দেখলাম তার দু’চোখ অশ্রুসিক্ত। সান্ত¦না দিয়ে জানতে চাইলাম, কী হয়েছে? তিনি বললেন আব্বুর চাকরিটা আর নেই। কয়েকদিন আগে চাকুরিটা ছুটে গেছে। আমি বললাম, এতে কান্নার কী আছে? ইনশা-আল্লাহ অতি তাড়াতাড়িই একটি ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এখন আমাদের করণীয় হল- ছবর করে দয়াময় আল্লাহর নিকট তাঁর জন্য ভাল কোন কাজের দু’আ করা। সে বলল, আব্বুর চাকরি ছুটে যাওয়ার জন্য আমি কাঁদছি না। আমি প্রশ্ন করলাম তাহলে কেন? তখন তিনি এক অসাধারণ উত্তর দিলেন- ‘এনায়েত মুন্সীকে পিতা হিসাবে পেয়ে আমি ধন্য’। এনায়েত মুন্সী তার বাবা। আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। চাকরি চলে যাওয়ার পর আমার মন খারাপ দেখে তিনি বললেন- “আব্বু! তুমি চিন্তা করো না, তুমি লেখা-পড়া চালিয়ে যাও। এদেহে যতদিন রক্ত প্রবাহিত হবে অন্তত ততদিন তোমার কোন চিন্তা নেই। আমি যদি আর কোনদিন চাকরি নাও পাই তবু তোমাকে কষ্ট করতে হবে না। প্রয়োজনে আমার শরীরের রক্ত বিক্রি করে তোমাকে লেখা-পড়া করাবো। তুমি শিক্ষিত হয়ে আদর্শ মানুষ হবে এটাই তোমার আম্মুর আর আমার একমাত্র কামনা। তুমি নিশ্চিন্তে লেখা-পড়া চালিয়ে যাও। আমাদেরকে নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবে না”।

বন্ধুর মুখে কথাগুলো শুনে, আমিও চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নি। তাই বললাম- পৃথিবীর সকল মা-বাবাই তার সন্তানের জন্য সব কষ্ট সহ্য করে নেন। তাদের চাওয়া-পাওয়া শুধু এতটুকুই, সর্বদা সন্তানের মুখে হাসি ফুটে থাকবে, সন্তানের ভবিষ্যত উজ্জ্বল হবে। এতে তাদের যত কষ্টই হোক না কেন, তারা হাসিমুখে সবকিছু মেনে নেন।

সকল পিতা-মাতাই তার সন্তানকে ভালোবাসবেন, কত রকম আদর করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিটি সন্তান কি তার মহান পিতা-মাতাকে ভালোবাসে, যেমন ভালোবাসা আকাশ প্রত্যাশা করে?! যেমন ভালোবাসা প্রত্যেক বৃদ্ধ পিতা-মাতার হৃদয় প্রত্যাশা করেন?! আচ্ছা কয়জন সন্তান তার পিতামাতাকে নিয়ে ভাবে, শেষ বয়সে তাদের সুপ্ত প্রত্যাশাকে পূর্ণ করে বা পূর্ণ করতে চেষ্টায় ত্রুটি রাখে না?! আবদার করে, দাবী করে, এমনকি জোর করে মা-বাবার ভালোবাসা দু’হাত ভরে নিতে তো সন্তানের কোন কুণ্ঠা নেই, কিন্তু সন্তান তার মা-বাবার জন্য কতটুকু করে, কতটুকু ভালোবাসা দেয় তার মা-বাবাকে? দাবী হিসাবে বিচার করলে তো সন্তান মা-বাবাকে শতকরা এক ভাগও দিতে পারে না। বড় হলেই যেন গায়ে পর গজায়। মা-বাবাকে চিনতে পারে না, অনায়াসে ভুলে যায় জন্ম থেকে বড় হওয়ার সকল কথা। জন্মের পর মা-বাবার কত রাতের ঘুম হারাম করেছে আর এখন সব ভুলে গেছে। অসুস্থতায় মা-বাবা বিশ্রামের সুযোগ গ্রহণ না করে তার সেবা করেছেন আর এখন এসব ভুলে বসে আছে। যে পিতা-মাতার প্রতিটি সেকেন্ড ব্যয় হয়েছে সন্তানের পিছনে, নিজের খাওয়া গোসল ভুলে গেছেন সন্তানের জন্য সে পিতা-মাতার সকল কষ্টকে অস্বীকার করছে। এত কষ্ট বরদাস্ত করে নিজের জীবনের ভালো-মন্দ চিন্তা না করে সন্তানকে ছোট থেকে বড় করলেন, তাদেরকে আজ অস্বীকার করছে। মুখে না করলেও তার কাজ-কর্মই বলে দিচ্ছে, সে অস্বীকার করছে।

যৌবনে পা রাখলেই যেন সন্তান তার মা-বাবাকে মানতে চায় না। মা-বাবার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়। আজকের যুবসমাজ মা-বাবাকে মানতে নারাজ। কথা-বার্তা, কাজ-কর্ম আরো বিভিন্নভাবে পিতা-মাতাকে কষ্ট দিয়ে থাকে তারা। মা-বাবাকে কষ্ট দেওয়াকে তারা গুনাহ মনে করে না। অথচ আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআন মাজীদে কয়েকবার এভাবে বলেছেন- তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর। পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করা সন্তানের উপর আবশ্যক, চাই পিতা-মাতা সন্তানের সাথে ভালো ব্যবহার করুক বা মন্দ ব্যবহার করুক। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন, পিতা-মাতার কোনো একজন কিংবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধ্যকে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না । বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বল। [সূরা বানী ইসরাঈল : আয়াত নং ২৩]

আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন, পিতা-মাতাকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না। তাহলে পিতা-মাতার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হবে তা সহজেই অনুমেয়। আল্লাহ তা’আলার বারংবার নির্দেশ, সন্তানের প্রতি মা-বাবার অকান্ত পরিশ্রম, বাস্তবরূপ প্রত্যক্ষ করা, নিজের বিবেক-বুদ্ধির উপস্থিতি প্রভৃতি থাকার পরেও কেন যে ইদানিং যুবক-যুবতীরা পিতা-মাতার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে? বিষয়টি ভাবলেই যেন সবকিছু উলট-পালট হয়ে যায়, জেহেনে কবুল করে এসব। বস্তুত ‘ক্বলবে সালীম’ ও ‘সুস্থ জ্ঞান’ এর অভাব। তা না হলে মা-বাবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা কীভাবে সম্ভব?

এটা তো গেল বিবাহর আগের অবস্থা। আর যদি বিয়ে করে ঘরে নতুন বউ আনে তাহলে তো হাওয়ায় উড়তে শুরু করে। বউ ছাড়া যেন কিছুই বুঝে না। সারাক্ষণ শুধু বউয়ের কথা আর কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। মা-বাবা যেন তখন তার আত্মীয়তার ফিরিস্তি থেকে বাদ পড়ে যায়। আত্মীয়তার নতুন তালিকায় চলে আসে বউ, শ্বশুর-শাশুড়ি ও তাদের অন্যরা। জন্মের দশ মাস আগ থেকে আজ পর্যন্ত যেই সন্তানকে ঘিরে মা-বাবার প্রতিটি মুহূর্ত মেহনত ও কষ্টে জর্জরিত সেই সন্তানের অবজ্ঞা যেন অসহনীয়। নাহ, এটা মেনে নেওয়া যায় না।

কতকের বেলায় সন্তান প্রথমে ঠিক থাকে। কিন্তু প্রতি রাতে বউয়ের কানপড়ায় পরিবর্তন হয়ে যায়। প্রথমে স্বাভাবিকভাবে চললেও পরবর্তীতে বউয়ের কথা শুনে চির আপন মা-বাবাকে ভুলতে শুরু করে। হৃদয় থেকে পিতা-মাতার শ্রদ্ধা শেষ হয়ে যায়। কখনো বা বউয়ের সাজানো রটানো কথা শুনে মা-বাবাকে বকা দেয়, সন্তানের একমাত্র শুভাকাক্সক্ষী পিতা-মাতার গায়ে হাত তোলে। নাউজু-বিল্লাহ! তখন শুধু পৃথিবী নয়, আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠে। যুদ্ধের সময় শত্রুকে মূলোৎপাটন করার জন্য যেমন বন্দুক তাক করে রাখে, বউয়ের কথায় মা-বাবার ভুল ধরার জন্য তেমন ওত পেতে বসে থাকে। কখনো আবার নিজের মান-সম্মানের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে সকলের সামনে বাড়ির চাকর বলে পরিচয় দেয় অথবা ঘরেই জায়গা দেয় না। রেখে আসে ঐ নির্জন বৃদ্ধাশ্রমে। তখন অভাগিনী মা-বাবা লুকিয়ে লুকিয়ে কান্না করেন আর নিয়তির কাছে হার মেনে যান। যে মায়ের নাড়িঁেছড়া ধন মাকে কাঁদালো, যে বাবার আদরের দুলাল বাবার চোখের জলের কারণ হলো, তার পরিণতি কী ভালো হতে পারে?!

আচ্ছা, আজকের যুবক-যুবতী কি সারা জীবন এমনই থাকবে? কখনো কি তারা বৃদ্ধ হবে না? যুবক বয়সে যে অপার শক্তির অধিকারী কখনো কী সে বলহীন হবে না, বার্ধক্যে পা বাড়াতে হবে না? হে আজকের যুবক-যুবতী! শুনে রাখ, একদিন তোমাকেও বৃদ্ধ হতে হবে। শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। দেখা, শোনা, বলা বা বুঝার ক্ষমতাও থাকবে না। থাকলেও তা অতি সামান্য, যা বিশেষ কোন কাজে আসবে না। তুমি আজ তোমার বৃদ্ধ মা-বাবাকে অবজ্ঞা করছ সেদিন তোমার সন্তানের কাছে তুমিও হবে লাঞ্ছিত, অপদস্ত। পৃথিবীর বুকে এমন কোন নজির নেই যে, মা-বাবাকে কষ্ট দিয়ে সন্তান সুখ পেয়েছে। বরং শুধু অপমানিতই হয়েছে। আর আখিরাতে তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।

একটি সন্তানের কাছে তার পিতা-মাতার যে কত সম্মান, তার কোন অন্ত নেই। আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন ও হাদীসে বারংবার তা বুঝানোর চেষ্টা করেছেন। কখনো পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে বলেছেন, কখনো তাদের কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন, কখনো তাদের জন্য রহমতের দু’আ করতে বলেছেন, কখনো পিতা-মাতাকে জান্নাত-জাহান্নামের সাথে তুলনা করেছেন প্রভৃতি। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের কথা অমান্য করে সম্মানিত পিতা-মাতাকে কষ্ট দিলে তার ধ্বংস অনিবার্য । আর আখিরাতে তো রয়েছে তার জন্য বিরাট শাস্তি। এ সবকিছু জেনে বুঝেও যুবক-যুবতীদের মাধ্যমে পিতা-মাতার কষ্টের প্রবণতা বেড়েই চলছে। মহান পিতা-মাতা সবকিছু গোপনে সহ্য করে নিচ্ছেন। মনের কষ্টে কিছুই বলতে পারছেন না। জানিনা, কবে হবে এর অবসান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight