আঁধার থেকে আলোর পথে : নাজমা আক্তার

মডার্ণ পরিবারের আধুনিকা মেয়ে মমতা। সে আমার শৈশবের বন্ধু ও বিদ্যালয়ের সহপার্ঠী। একসাথে যাই, একসাথে ফিরি। তাই আমার সাথে তার বন্ধুতা ও সখ্যতা বেশ পুরনো। আমি শৈশব থেকেই সম্পূর্ণ ধর্মীয় অনুশাসনের উপর প্রতিপালিত। সে কারণে স্বাভাবিকভাবেই পর্দা করাকে আমি নিজের জন্য আবশ্যক করে নিয়েছিলাম। কিন্তু মমতা এ সবের ধারধারতো না। তার কথা-বার্তা, চলা-ফেরা সবকিছুতেই থাকতো আধুনিকতার ছোঁয়া। তাই এ নিয়ে প্রায় সময় চলতো তার সাথে আমার ছোট খাটো বিতর্ক। আমার বোরকা দেখে সে বলতো, ‘এ কী পরেছো তুমি? এ যুগেকি এসব চলে? দেখতে একটা আস্ত ভূতের মতো লাগে?’ ইত্যাদি।
তার তিরস্কারগুলো আমি নীরবে হজম করতাম। আর খুব দরদের সাথে বুঝিয়ে বলতাম, ‘মমতা, নামায পড়া ও রোযা রাখা যেমন আল্লাহর হুকুম, পর্দা করাও তাঁরই হুকুম। তাঁর এ হুকুম মানতেই হবে। অন্যথায় আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যাবে না। এভাবে আমি অনেকবার তাকে বুঝিয়েছি। কিন্তু সে বুঝল না। বুঝতে চাইল না। সে নিজের মতোই চলতে থাকলো। সময় গড়াতে থাকলো আপন গতিতে। এক সময় ৮ম শ্রেণীর বোর্ড পরীক্ষাটাও হয়ে গেলো। এতে মমতার ঈর্ষণীয় ফলাফল দেখে সবার মনে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। পিতা তাকে নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখলেন। তাই মমতাকে এখন আর গ্রামে নয়, ভর্তি করলেন নেত্রকোনা শহরের গার্লস স্কুলে। পিতার এ সিদ্ধান্তে অনেকে খুশি হলেও আমি হলাম অত্যন্ত মর্মাহত এবং উদ্বিগ্ন। কারণ গ্রামের তুলনায় শহরের নৈতিক অবস্থা যে আরো শোচনীয়।
শুরু হলো মমতার শহুরে জীবন। এখন সে ছাত্রীমেসে থাকে। সকালে স্কুলে যায়। বিকেলে ফিরে আসে। মুক্ত বিহঙ্গের মতো সে এখন পূর্ণ স্বাধীন। আমি একজন মেয়ে হয়ে তার জন্য কীই-বা করতে পারি? শুধু দু’হাত তুলে তার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করেছি, ‘হে আল্লাহ! মমতাকে তুমি সঠিক পথে নিয়ে এসো। তুমি তাকে….।’
মমতা চলে যাওয়াতে আমি অনেকটা একাকী হয়ে পড়েছি। বেশ কয়েক মাস চলে গেছে তার সাথে আমার কোন সাক্ষাৎ নেই। এক শীতের সকালে কেন যেন আমি খুব ভোরে মাদরাসায় চলে এলাম।
কাশরুমে বসে বসে বই পড়ছি। হঠাৎ করে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি, হাতে পায়ে কালো মুজা, কালো বোরকায় আপাদমস্তক ঢাকা এক মেয়ে ধীরে ধীরে আমার দিকেই আসছে। হাটার ঢং একটু একটু চেনাচেনা লাগে। কে হতে পারে এই মেয়েটি?
আসসালামু আলাইকুম।
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। কে তুমি? মমতা নাকি?
হাঁ, নাজমা আমি সেই মমতা।
কী ব্যাপার, এমন সময় তুমি এখানে? এভাবে?
আল্লাহ তায়ালা আমার প্রতি দয়া করেছেন। তাই বিপদগামীদের পথ থেকে তিনি আমাকে ফিরিয়ে এনেছেন।
আমিতো জানি তোমার পিতা তোমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন।
হাঁ, তা ঠিক। এবং আমিও ভেবেছিলাম এখন থেকে আমি আরো স্বাধীনভাবে চলতে পারবো। কিন্তু বেপরোয়াভাবে চলাফেরা করা কয়েকটি মেয়ের ঘটনা শুনে এবং বাস্তব কিছু চিত্র দেখে আমার বুঝ এসেছে যে, মহান আল্লাহর বিধান মানার মাঝেই রয়েছে শান্তি। সে কারণেই আমি অশালীনতা পরিহার করেছি। এবং কারো কারো রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শান্তির পথে এসেছি। পর্দাকে অলংকার হিসেবে গ্রহণ করেছি। আমি এখন এ মাদরাসার ছাত্রী। তার কথা শুনে আমি আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নি।
সত্যি তুমি ভ্রষ্টতা থেকে ফিরে এসেছো? সত্য ও সুন্দরের পথ বেছে নিয়েছো? আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন। হে আল্লাহ! আপনার হাজার শোকর। বিপথগামীদের পথ থেকে আপনি তাকে রক্ষা করেছেন। হে আল্লাহ! পৃথিবীর সকল মমতাকে আপনি এভাবে রক্ষা করুন। পরিচালিতকরুন আপনার পথে।
লেখিকা : শিক্ষার্থী আসহাবে সুফ্ফা নূরানী হাফিজিয়া মহিলা মাদরাসা ও এতীমখানা, কয়রা. কলমাকান্দা, নেত্রকোনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight