অন্য আনন্দ / রেদওয়ান সামী

রুবি ঘড়ি দেখছিল আর ব্যাগ গুছাচ্ছিল। রুবির এমন ব্যস্ততা দেখে রুবির মা বলল, রুবি এত তাড়া কিসের তোর?
কোথাও বেরুচ্ছিস না কি?
হ্যাঁ, মা আজ আমাদের পাঠাগারের ৪র্থ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। বন্ধুরা মিলে একটা পার্টির আয়োজন করেছি কলেজে। সকাল দশটায় ওরা সবাই কলেজে থাকবে। ওরা আমাকে বলে দিয়েছে, আমি না গেলে না-কি পার্টিটা প্রাণ পাবে না। আজ-কাল রাস্তায় যে জ্যাম আগে-ভাগে না বেরুলে সব মাটি হয়ে যাবে। কেবল আমার জন্য এতগুলো মানুষের আনন্দ মাটি হয়ে যাবে তা কি আমি হতে দিতে পারি? না সেটা ঠিক হবে না।
আচ্ছা, ঠিক আছে তুই যা, তবে সাবধানে দেখে-শুনে যাস। আর হ্যাঁ, ফিরতে দেরি হলে ফোনে জানিয়ে দিস।
তুমি অত চিন্তা করো না তো মা, যতটা সম্ভব তাড়াতাড়িই ফেরার চেষ্টা করব। বাসা থেকে বেরিয়েই রিক্সা নিয়ে নিল রুবি, ট্রিং-ট্রিং সিগনাল বেল বাজিয়ে রিক্সা ছুটলো রুবিকে নিয়ে, গন্তব্য, গোপালগঞ্জ সরকারী কলেজ গ্রন্থাগার, রুবি ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী, বয়স ১১/১২, বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে, বড় আদরের। প্রয়োজনীয় জিনিষের কোন কিছুরই অভাব নেই রুবির। পথ চলার জন্য গাড়ি থেকে শুরু করে বিলাসী জীবনের জন্যে যা কিছু দরকার সব কিছুই ব্যবস্থা করেদিয়েছে রুবির বাবা। কিন্তু এসবের প্রতি তেমন একটা আকর্ষণ নেই রুবির। রুবি চায় সাধারণভাবে চলতে। আর দশজন মেয়ের মত সবার সাথে মিশতে। দূরের পথ না হলে রুবি গাড়ি বের করে না। রিক্সা কিংবা সি এন জিতে চড়েই প্রয়োজন মেটায়। এবারও তাই করলো।
বন্ধুরা সবাই রুবির অপেক্ষায়। ও আসলেই পার্টির কাজ শুরু করবে তারা। কিন্তু রুবির কোন হদিস নেই। সবার চেহারায় হতাশার ছাপ। কারো মুখে কোন কথা নেই। পিনপতন নিরবতা পুরো পাঠাগার জুরে। সবাই এসে দাঁড়ায় গেটের কাছে। পথপানে চেয়ে থাকে রুবির অপেক্ষায়। নিরবতা ভেঙ্গে দিয়ে রায়হান বলে ওঠে, রুবি এখনো এলো না!
বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ফোনে জানালো আমি আসছি, তা প্রায় ঘন্টা খানিক আগে। কিন্তু এখনো এলো না, এতো সময় তো লাগার কথা না। তোরা কেউ ওর নাম্বারে একটা কল করে দেখ না ও কোথায় আছে।
এ পর্যন্ত প্রায় দশবার কল করা হয়েছে, কিন্তু রুবি কল রিসিভ করছে না। ব্যর্থ গলায় উত্তরটা দিলো আফসানা। হঠাৎ রিক্সার বেলের ট্রিং-ট্রিং শব্দে সবাই সামনে তাকালো। বন্ধুরা ওকে ঘিরে ধরলো। সবাই কিছুটা বিরক্ত। শাহিন বলল, তুই কি জানিস, আমরা কতটুকু চিন্তায় ছিলাম তোকে নিয়ে। তুই ফোন রিসিভ না করায় আমরা আরো বেশি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। রুবি কিছুই বলছে না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের কথা গুলো গিলছে গো গ্রাসে। রুবি জানতো না ওর বন্ধুরা ওকে এতোটা ভালোবাসে। রুবি ভাবলো দেরি হওয়ার মূল ঘটনাটা ওদের জানানো দরকার। অন্যথায় ওরা আমাকে ভুল বুঝবে। রুবি একটু অভিমানের সুরে বলল, আচ্ছা তোরা এতক্ষণ অনেক কিছুই বললি, আমি তোদের বন্ধু মনে করি না। তোদের আমি ভুলতে বসেছি, অন্য বন্ধু খুঁজে নিয়েছি, আরো কত কী, শিপন বলল।
হয়েছে হয়েছে, এখন আর ভনিতা করতে হবে না। চোর ধরা পড়লে কত কথাই তো, কথায় আছে না, চোরের মার বড় গলা। আয়শা বলল, থামতো কীসব আজে-বাজে বকে যাচ্ছিস। আয়শার কথায় শিপন টিপ্পনি কেটে বলল বুঝেছি, তোরা মেয়ে জাত তো তাই পক্ষ নিচ্ছিস। এবার সায়মা একটু শাসনের সুরে বলল, চুপ করবি তোরা সেই কখন থেকে শুরু করেছিস, বিরতিহীনভাবে চলছে তো চলছেই, থামার নাম নেই। রুবির আসতে দেরি হয়েছে বুঝলাম, কিন্তু কেন দেরি হয়েছে সে কথাও তো শোনার প্রয়োজন আছে, না-কি? শোন রুবি, তুই কিছু মনে করিস না, বন্ধুরা বন্ধুদের উপর রাগ-অভিমান করে কত কিছুই তো বলে। আসলে এগুলো রাগ না, ভালোবাসা। এতক্ষণ যা কিছু হলো তা এখানেই শেষ। এবার চল আমরা লাইব্রেরী রুমে গিয়ে বসি। তারপর রুবির কাছ থেকে শুনি কী সমস্যা হয়েছিল। আসতে দেরি হয়েছিল কেনো। লাইব্রেরী রুমে গিয়ে সবাইকে নিয়ে বসে রুবি বলল, আমার দেরি হওয়ার কারণ তেমন খারাপ কিছু না। সায়মা বলল, আচ্ছা মেনে নিলাম যে, তেমন খারাপ কিছু না, তবুও আমরা সেই তেমন কিছু না বিষয়টি শুনতে চাই। রুবি বলল, আচ্ছা শোন তাহলে। আমি রিক্সায় করে আসছিলাম, মনটা বেশ ফুরফুরে। তোদের সাথে অনেক দিন পরে আড্ডা হবে, হালকা হাওয়া শারীটাও বেশ সতেজ হয়ে উঠলো, মনের অজান্তেই আমি গুনগুন করে একটা সুর গাইছিলাম। হ্যাঁ, গুনগুন করতে করতেই রাস্তার দু’পাশের সবুজ গাছ গুলো দেখতে দেখতে পথ চলছিলাম। হঠাৎ, চোখ পড়লো সারি বাধা সবুজের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা শেওড়া গাছটার দিকে। একটা বৃদ্ধ লোক শুয়ে আছে গাছটার নিচে, হাত-পা গুটিয়ে। গায়ে জামা নেই। সারা গায়ে ধুলোবালি মাখা। পেট-পিট মিশে একসাথ হয়ে আছে। বোঝার উপায় নেই কোনটা পেট আর কোনটা পিট। কথা বলার শক্তি পর্যন্ত নেই। ক্ষুধার জালায় এতটাই কাতর যে, মুখের কাছে হাত নিয়ে ইশারায় বলছে, আমাকে কিছু খেতে দাও, কয়েকদিন পেটে কিছুই নেই। দু’মুঠো খাবার দাও আমি বাঁচতে চাই। কত লোক তার পাশ দিয়ে যাওয়া আসা করছে সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। কেউ ফিরেও তাকায় না লোকটার দিকে। এ দৃশ্য দেখে আমি আর সামনে বাড়তে পারলাম না, রিক্সা থামিয়ে লোকটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। লোকটা আমাকে দেখে কিছু একটা বলতে চাইল। কিন্তু পারল না, মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না, অশ্রুতে ভরে গেল তার দু’চোখ। কত লোকই তো যাচ্ছে তার পাশ দিয়ে, কেউ তো তার দিকে তাকাচ্ছে না। কিন্তু আমি তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছি এতেই সে মহাখুশি। এটাই সে বুঝাতে চাইল তার চোখের জলের ভাষায়। এমন পরিস্থিতিতে আমার দু’চোখও ভরে গেলো অশ্রুতে। তারপর সামনে গিয়ে পাশের দোকান থেকে কিছু খাবার আর একটা মাম পানি খেতে দিলাম লোকটাকে। কিন্তু বেচারা খাওয়া তো দূরের কথা হাত বাড়িয়ে যে খাবারগুলো ধরবে সেটাও পারছিল না। শেষ পর্যন্ত আমিই তাকে পাউরুটি ভিজিয়ে ভিজিয়ে খাইয়ে দিলাম। এতটুকু করার পর আমি আসতে যাবো, অমনি লোকটা আমাকে ডেকে বলল, একটু দাঁড়াও মা!
আমার মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। তখন আমার মনে হলো, আমার চেয়ে সুখী পৃথিবীতে আজ আর কেউ নেই। অনাহারীর মুখে আমি খাবার তুলে দিতে পেরেছি।  তার ভাষাহীন মুখে কথা ফুটিয়েছি। আজ আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবী।
আমি লোকটার পাশে বসলাম। আমার মাথায় হাত রেখে লোকটা বলল, জানি না মা! তুমি কোন বাপের মাইয়্যা। সত্যই হ্যারা তোমার মতন মাইয়্যা পাইয়্যা ধইন্য হইছে। বাইচা থাকো মা বাইচা থাকো, আল্লায় তোমারে অনেক বড় বানাক। লোকটা কথাগুলো বলছিল তখন তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল গন্ডদেশে। অসহায় লোকটির দোয়া পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে হলো। বিদায় নেওয়ার আগে কিছু টাকা হাতে গুজে দিলাম, তারপর আবার রিক্সায় চেপে বসলাম, পার্টিতে আসার জন্য।
এতক্ষণ ওরা মনযোগ দিয়ে শুনছিল রুবির কথা। হঠাৎ, চোখের জল মুছতে মুছতে মাইশা বলল, শোন রুবি, আজ থেকে আমরা একটা নতুন মিশন শুরু করব, আর তা হলো, আজ থেকে আমরা প্রতিদিন সবাই কিছু-কিছু টাকা জমাবো, যা দিয়ে আমরা অসহায় মানুষের সহায়তা করব। দু’মোঠো হলেও খাবারের ব্যবস্থা করব। পথশিশুদের পাশে দাঁড়াবো। ওদের মৌলিক অধিকারে সাহায্য করব। তোরা কি আমার সাথে একমত? সবাই বলল, হ্যাঁ, আমরা একমত। রুবি বলল, এই নে আমার আজকের হাত খরচের টাকা, ব্যাগ থেকে পাঁচশত টাকার একটা নোট বের করে রুবি মাইশার দিকে এগিয়ে দিলো। একে একে অন্যরাও এগিয়ে আসল। হিসাব করে দেখা গেল ৪০০০ টাকার মত জমা হয়েছে ওদের কাছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight