অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা ইসলাম কি বলে? সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

Bichar

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক সমস্ত অন্যায় অবিচার দূরিভূত করে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত উম্মতের কান্ডারী হযরত মুহাম্মদ সা. এর উপর এবং শান্তি বর্ষিত হোক কাজে কর্মে রাসূলের আনুগত্যে সর্বাগ্রামী ভূমিকাপালনকারী সাহাবায়ে কেরাম রা. এর উপর।

ইসলাম শান্তির ধর্ম, সব ধরনের অশান্তি, বিশৃঙ্খলা, মারামারি, হানাহানি, জুলুম নির্যাতন বন্ধ করে মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা প্রকাশের জন্য এবং নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার জন্য ইসলামের আগমন ঘটেছে। জাহেলি যুগে তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুনাখুনি, হানাহানি এবং রক্তের বদলে রক্ত নিতে গিয়ে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের জীবনহানি ঘটত এবং বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধবিগ্রহ চলত। ইসলামের মহান প্রবর্তক বিশ্বশান্তির মূর্তপ্রতীক হযরত মুহাম্মদ সা. এসে এ সবকিছু সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। বিদায় হজ্জের ভাষণে তিনি অত্যন্ত কঠোরভাবে ঘোষণা করলেন : হে মানবমণ্ডলী! আজকের এই দিন, এই মাস, এই শহরটি যেমন সম্মানিত, তেমনি তোমাদের রক্ত, তোমাদের ইজ্জত, তোমাদের সম্পদ পরষ্পরের প্রতি কিয়ামত পর্যন্ত সম্মানিত।

বর্তমান সময়ে, দেশে সাধারণ জনগণ রয়েছে মারাত্মক দুর্ভোগে। হরতাল-অবরোধের মাঝে চলছে চরম সহিংসতা। চলন্ত গাড়িতে ইট-পাথর ও পেট্রোল বোমার আগুনে পুড়ে মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রতিদিনই রাস্তায় গাড়ি পুড়ছে, মানুষ মরছে, অগ্নিদগ্ধ হচ্ছে। জীবন হাতে নিয়ে প্রতিদিন কাজে নেমে স্বল্প আয়ের মানুষ লাশ হয়ে বাড়ি ফিরছে। রাস্তা কিংবা গাড়িতে কখন কার ওপর বোমার বিস্ফোরণ ঘটে এ ভয়ে সবাই আতঙ্ক। অন্যায়ভাবে একজন মানুষ হত্যা করাকে কোরআনে কারিমে ‘সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা’ করার নামান্তর আখ্যায়িত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনুল কারিমে অন্যায়ভাবে হত্যা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপরাধ সম্পর্কে ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করল সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকেই হত্যা করল, আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করল সে যেন সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। [সূরা মায়েদা:৩২] অন্যায়ভাবে হত্যার শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন- কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে চিরস্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লা’নত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। [সূরা নিসা:৯৩]

ইসলাম ধর্মে হত্যার প্রতি প্ররোচনা দানকারী হিসেবে হিংসা-বিদ্বেষ-ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে বলেছে। এ বিষয়ে হযরত রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘তোমরা একে অপরের সঙ্গে বিদ্বেষ পোষণ করো না, হিংসা করো না এবং একে অপরের পেছনে লেগে থেকনা। আল্লাহর বান্দা সবাই ভাই ভাই হয়ে যাও। [সহিহ বোখারি]

এমনকি হত্যার প্রাথমিক বিষয় তথা অস্ত্র দিয়েও কাউকে ভয় দেখাতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন তার ভাইয়ের দিকে অস্ত্র তাক না করে। কারণ সে জানে না, হয়ত শয়তান তার হাত থেকে তা বের করে দিতে পারে, ফলে সে জাহান্নামের গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হবে।’ [সহিহ বোখারি]

মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টজীবকে পুড়িয়ে মারার অধিকার কারো দেন নি। আগুনে পুড়িয়ে মারার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলারই। আগুনে পুড়িয়ে মারার ফলে একসাথে কয়েকটি অপরাধ সংগঠিত হয়, এর কোনো কোনোটি তো শিরকের পর্যায়ভুক্ত। কাউকে আগুনে পুড়িয়ে মারা বা মারার চেষ্টা জঘন্যতম অপরাধ। যারা এ ধরনের কাজ করবে, আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনের কারণে তারা আল্লাহর রহমত থেকে অবশ্যই বঞ্চিত হবে এবং রাসূল সা. এর কথা না মানার কারণে তারা কিয়ামতের দিন রাসূল সা. এর শাফায়াত পাবে না,। হাদীস শরীফে আছে, হযরত রাসূলুল্লাহ সা. কোনো মানুষ, জীব-জন্তু বা কোনো ফসল-গাছ-পালাকে আগুনে পোড়াতে নিষেধ করেছেন। রাসূলে কারিম সা. বলেন, ‘আগুন দ্বারা কেবল আল্লাহই শাস্তি দেবেন, আল্লাহ ছাড়া আর কারো আগুন দ্বারা শাস্তি দেওয়ার অধিকার নাই।’ [বোখারি ও আবু দাউদ]

তেমনি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা মহা পাপ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলমানকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্যে ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন”। [সূরা আন নিসা: আয়াত নং ৯৩]

কিন্তু আজ এ কি দেখছি! লক্ষ শহীদের রক্ত ও মা-বোনদের ইজ্জতের বিনিময়ে এনেছি বাংলাদেশ। তা সন্ত্রাসী আর খুন খারাবিতে ভরে গেছে জ্যান্ত শ্মশানে। এভাবে আর কতদিন চলবে? যত দিন পর্যন্ত জনগনের নীতি আদর্শে ধর্মীও অনুভূতি না জাগবে, ততদিন পর্যন্ত জনগনের নিরাপত্তা সুখ শান্তি আসবে না। মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা অনুভুতি থাকতে হবে। লোভ লালসা মাটির নিচে পুতে ফেলতে হবে। ধর্মকে আকড়ে ধরতে হবে। তাহলে আসবে সমাজে শান্তি সুখের উল্লাস, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা।

পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত ও হাদীসের আলোকে খুব সহজেই বুঝা যায় যে, কাউকে আগুনে পুড়িয়ে বা অন্যায়ভাবে হত্যা করা বা হত্যার চেষ্টা জঘন্যতম অপরাধ। যারা এ অপরাধ করবে, তারা আল্লাহর রহমত থেকে অবশ্যই বঞ্চিত হবে। রাসূলুল্লাহ সা. কাফের-মুশরেকদের বিরুদ্ধেও কোনো যুদ্ধে কাউকে আগুনে পোড়ানোর অনুমতি দেননি। কারণ জাহান্নামে আল্লাহ তাআলা অপরাধীদের জন্য আগুনের শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। তাই কাউকে আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়া ইসলাম ধর্মে হারাম। তবে মানুষের অধিকার আছে, যদি ক্ষতিকারক কোন বিষাক্ত জীব পিটিয়ে না মারা যায় তখন আগুনে পুড়েয়ে মারা যায়।

কিন্তু আজ খুবই দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে লক্ষ করছি যে, আমাদের মুসলিম ভাই-বোনদের অহরহ আগুনে পোড়ানো হচ্ছে এবং অন্যায়ভাবে ধরে নিয়ে আহত ও নিহত করা হচ্ছে। জীবন্ত মানুষকে পেট্রোল বোমা, গান পাউডার ইত্যাদি দিয়ে জ্বালানো হচ্ছে। ইসলামের বিধানের তোয়াক্কা না করে, মানবতাকে পায়ে পিষে, পশুত্বের কোন স্তরে পৌঁছলে এমন কাজ করা সম্ভব তা বোধগম্য নয়। এই সব জগণ্যতম কর্ম-কাণ্ড দেখলে শয়তানও ঘৃণা ও লজ্জা পায়। আমরা আজ কোথায় বাস করছি? আমরা কি সভ্য জগতের বাসিন্দা, আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব? নাকি অন্য কিছু, কিছুই বুঝতেছিনা!

সবসময় আল্লাহর বাণী মনে রাখতে হবে- ‘যে সৎকাজ করছে সে নিজের কল্যাণার্থেই তা করছে, আর যে অসৎকাজ করছে তা তার উপরই বর্তাবে। [জাসিয়া : ১৫] অন্যত্র ইরশাদ করেছেন- ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী।’ [মুদ্দাস্সির : ৩৮] ইসলাম কোনোভাবেই অন্যের জানমালের ক্ষতি সাধন সমর্থন করে না। যারা মানুষের জানমালের ক্ষতি করে ইসলাম তাদের প্রকৃত মুমিন বলে স্বীকৃতি দেয় না। রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন- প্রকৃত মুমিন সে ব্যক্তি যার মুখ ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ [মুসলিম]

তাই আমরা সাধারণ ও নিরীহ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য নির্বেশেষে আপামর সকলের কাছে উদ্বাত্ব আহ্বান জানাচ্ছি, ফিরে আসুন আল্লাহর পথে শান্তির ঠিকানায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। আমিন।

 

লেখিকা : ইসলামি গবেষক, কবি ও সম্পাদক: মাসিক আল জান্নাত

3 মন্তব্য রয়েছেঃ অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা ইসলাম কি বলে? সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

  1. মাসউদুল কাদির says:

    সুন্দর উপস্থাপনা। সময়োপযোগী লেখা। প্রতিহিংসার রাজনীতিবিদদের যদি বোধদয় হতো! অনে্যর প্ররোচনায় পরে যারা এহেন গর্তিত কাজ করছে, তাদের হেদায়াত কামনা করি।

  2. Lky akhtar says:

    এটা প্রতিহিংসার রাজনীতির ভয়াবহ পরিণাম। কবে যে আমরা একটি সুন্দর, শান্ত পরিবেশের ইসলামী শাসনতান্ত্রিক একটি সাধীন রাষ্ট্র পাব! আমরা আসলে কপালপোড়া জাতি, যাদের গর্দান থেকে গোলামীর শৃংখৃল সরে না। প্রথমে ছিলাম বৃটিশদের গোলাম, পরে ভারতের তারপর পাকিস্তানের এখন আবার ভারতের বনাম জালেমদের। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। এই সময়ে এমন একটি লেখা পেয়ে লেখকের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করা অকৃতজ্ঞ হবে মনের করে উম্মুক্ত আলোচনার জন্য লেখকের জন্য প্রাণভরে দুয়া করি। আল্লাহ যেন উনাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করেন।

  3. Latifur Rahman says:

    লেখাটি অনেক কার্যকরী। লেখিকা অনেক সুন্দর করে কুরআন হাদীস থেকে দলীল উপাস্থাপনের মাধ্যমে প্রমাণ করছেন যে, ইসলামে সন্ত্রাসের কোন স্থান নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight