অন্ধকার থেকে গভীর অন্ধকারে : নুশরাত জাহান রেশমী

স্কুলে যাওয়ার জন্য দু’তিন পা বাড়াল মাত্র, বাবা পেছন থেকে ডাক দেয় রবিন এদিকে আয়।
কি হয়েছে বাবা? দেরি হয়ে যাচ্ছে তো।
বাবা! এই নে তোর নাস্তার টাকা।
প্রতিদিন ব্যাগে রাখো আজ হাতে দিলে যে? বাবা, আমার ইচ্ছে হল আজ নিজের হাতে ছেলেকে নাস্তার টাকা দেব, তাই। ছেলেকে কাছে টেনে আদর করে বাবা হাকিম মিয়া। রবিন উদ্দেশ্য নিয়ে হাঁটতে শুরু করে স্কুলের দিকে। কিন্তু তার বাবা উদ্দেশ্যহীন তাকিয়ে থাকে রবিনের দিকে। যেভাবে মৃত্যুর আগে মানুষ তার প্রিয় জিনিস মন ভরে দেখে নেয়।
বিকাল চারটায় স্কুল ছুটি হয়। রবিন বন্ধুদের সাথে গল্প করে করে বাড়ি কাছে পৌঁছাতেই শুনতে পায় কান্নার আওয়াজ, উঠানে প্রচুর মানুষের ভিড়! বাড়ির ভেতর পা দিতেই দেখতে পায় কাফন জড়ানো বাবার নিষ্প্রাণ দেহটা পড়ে আছে খাটিয়ার উপর। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলো না রবিন। একমাত্র আদরের ছেলেকে এভাবে ছেড়ে যাবেন এক মুহূর্তের জন্যও ভাবেনি সে। কিন্তু বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে কাফন দাফন করে বাসায় ফিরে রবিন।
আগে বাবা যখন পড়তে বলতো, রোদের মধ্যে খেলতে দিতো না তখন খুব রাগ হতো, কিন্তু এখন কেউ বলে না এসব কথা। বাবার সেই উপদেশ গুলি এখনো রবিনকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার।
থেমে যায়নি রবিনের মা, সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় তার পথ চলা। ছেলেকে লেখা-পড়া করিয়ে মানুষের মত মানুষ করার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করতে লাগল অন্যের বাড়িতে বাড়িতে। এদিকে রবিনও সময় নষ্ট না করে মন দিয়ে পড়া-লেখা করছে মায়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য।
রবিনের মায়ের একটা রোগ আছে, তিনি পাঁচ-ছয় মাস পর পর অজ্ঞান হয়ে যেতেন! কিন্তু এখন তিনি পনেরো বা এক মাস পর পর অজ্ঞান হয়ে যান। রবিন এগুলো দেখার পরও চুপ করে থাকে। কারণ, তার কাছে এত টাকা নেই যে মাকে ভালো কোন ডাক্তার দেখাবে। তাছাড়া তার পড়া শেষ হওয়ার আরও কিছু দিন বাকি।
পড়া-লেখা শেষ করে রবিনের চাকরি হয়। রবিন তার চাকরির প্রথম মাসের টাকা দিয়ে মায়ের চিকিৎসা করার চিন্তা করে। অবশেষে রবিন তার মাকে বলে, মা! তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না। নিজের জীবন বাজি রেখে দিন রাত অকান্ত পরিশ্রম করেছো আমার জন্য। কিন্তু আমি কিছু করতে পারিনি তোমার জন্য। আজ থেকে তুমি আর কাজে যাবে না।
ছেলের কথা শুনে মা’র হৃদয় শীতল হয়। এতদিনের কষ্ট, অকান্ত পরিশ্রমের ফল ফিরে পায় ছেলের কথা শুনে।
রবিনের চিন্তা মত প্রথম মাসের বেতন পেয়ে মা’কে নিয়ে রওয়ানা দিলেন শহরের উদ্দেশ্যে। বাস থেকে নেমে রিকশা নিল রবিন। মা-ছেলের হাসি যেন শেষই হচ্ছিলো না। তাদের রিকশার বিপরিত দিক থেকে একটি মোটর সাইকেল আরোহন করে দুজন ছেলে আসছে, যাদের একজনের গায়ে রয়েছে নীল টি শার্ট, অপর জনের গায়ে লাল রঙের টি শার্ট। দু’জনই হেলমেট পরা।
তারা রিকশার কাছাকাছি এসে রবিনের মায়ের কাধে ঝুলানো ভ্যানিটি ব্যাগটি ধরে টান দেয়, তিনি সাথে সাথে রিকশা থেকে নিচে পড়ে যান, মাথা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। রক্ত মাখা শরীর নিয়ে ছেলের কোলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের উচু স্থানে জায়গা করে দিন।
প্রিয় পাঠক! অন্তরে দরদ দিয়ে একটু চিন্তা করে দেখুন, কত বড় অমানুষ হলে অল্প কিছু টাকার জন্য একজন মা’কে এভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে? একবারও পেছন ফিরে তাকানোর প্রয়োজন মনে করেনি, একবারও জানতে ইচ্ছে করেনি কেমন আছে বৃদ্ধা মা। হয়তো তাদের বিরুদ্ধে কিছু করার ক্ষমতা নেই রবিনের। কিন্তু সে কি ক্ষমা করবে তাদের?
কালো আঁধার দূর হয়ে যখন একটু আলো ফোটার সময় হলো ঠিক তখনই গভীর অন্ধকারে ডুবে যায় রবিন।
তার প্রতিটি কষ্টের নিঃশ্বাস তাদের জীবনের এক পর্যায়ে কাল হয়ে দাঁড়াবে তখন তারা বুঝতেও পারবে না এটা কোন কর্মের শাস্তি। আল্লাহ আমাদেরকে এসব থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight