অনুতপ্ত / আহমদ আবদুল্লাহ

নাহিন বাবা-মার খুব আদুরের মেয়ে। পড়ালেখা, কাজকর্ম সব বিষয়ে তার কোনো জুড়ি নেই। বাবা-মা এমন মেয়ে পেয়ে খুব খুশি। কিন্তু ঠিক তার বিপরীতমুখী ছিলো রাফি। পড়ালেখায় ছিলো না মনোযোগ। খেলাধুলা আর অনর্থক কাজে সময় ব্যয় করা রাফির অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তার কাজকর্মে বাসার সবাই অতিষ্ঠ। বিশেষ করে বাবা-মা। রাফিকে সবাই বুঝাতো, কিন্তু ফলাফল হতো শূন্য। কারো কথা রাফির মনে প্রভাব ফেলতে পড়তো না। ছোটবোন পড়ালেখা করতো খুব মনোযোগ দিয়ে। সঙ্গে রাফিও, তবে রাফির মন থাকতো অন্য কোথাও। খেলাধুলা, বন্ধুদের হাসিঠাট্টায়। ছোটবোন রাফিকে বারবার বোঝাতো, কিন্তু কোনো লাভ হত না। একদিন রাফি ধমক দিয়ে বললো, ‘তুই চুপ থাক। আমার চিন্তা তোর করতে হবে না।’ তারপরও নাহিন ভয়েভয়ে অনেকবার সতর্ক করেছে ভাইকে। বলেছে, ‘একদিন তুমি অসফল হবে। পস্তাবে খুব। এখনো সময় আছে, ফিরে এসো। মনোযোগ দাও পড়ালেখায়।’ নাহিনের কথাগুলো না শুনার ভান করে অন্যত্র চলে গেলো রাফি। বাবা মা নাহিনের উপর খুব খুশি। তবে রাফির ব্যাপারে অসন্তুষ্ট নন বটে, কিন্তু চিন্তিত ছিলেন। ছেলেটার সঠিক বুঝ কবে আসবে? চেষ্টা করে অনেক বড় হবে, দেশ ও জাতিকে উজ্জ্বল করবে।
পরীক্ষার সময় একদম নিকটবর্তী। নাহিন খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখায় করছে। কোনোদিক তার কোনো খবর নেই। সর্বক্ষণ পড়ার টেবিলে। চিন্তা শুধু একটা। আমাকে প্রথম হতে হবে। নিজেকে অনেক বড় বানাতে হবে। বাবা মার মুখে হাসি ফুটাতে হবে। পাশে রাফি আনন্দ উল্লাসে দিন পার করছে। সময়গুলো ধীরেধীরে নষ্ট করে দিচ্ছে। ভাবছে, এখনো পরীক্ষার অনেক বাকি। হাসি উল্লাসে কিছু সময় অতিবাহিত করি। পরিশেষ পরীক্ষার দিন এসে গেলো। আগামীকাল পরীক্ষা। রাফি অস্থির হয়ে গেলো। খুব পেরেশান মনে হচ্ছে তাকে। সারারাত ঘুমায়নি রাফি। কিন্তু এক রাতেই কি সব পড়া সম্ভব? কখনোই নয়। নাহিন নিশ্চিন্তে সময়মত ঘুমিয়ে পড়েছে। তার মনে কোনো ধরণের দুঃশ্চিন্তা নেই। সব পড়া তার মুখস্থ। নাহিনের মনে আনন্দঘন মুহূর্ত ছিলো। কারণ তার বিশ্বাস ছিলো নিজের উপর। ‘আমি পারবো, অবশ্যই পারবো।’
সকালে ভাই বোন পরীক্ষা দেওয়ার জন্য স্কুলে গেলো। স্যার প্রশ্ন দিলেন সবাইকে। নাহিন প্রশ্ন দেখে মৃদুহাসি দিলো। প্রতিটি প্রশ্ন তার কাছে খুব সহজ লাগছে। অনায়াসেই লেখে যাচ্ছে নাহিন। এদিকে রাফির চিন্তা আর পেরেশানি ধীরগতিতে বাড়ছে। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। কলম কামড়াচ্ছে। এদিকওদিক তাকালো কয়েকবার। ছোট্টবোনটা কি সুন্দর করে লিখে যাচ্ছে। দৃষ্টি আবার নীচু করলো। ভাবতে লাগলো, নকল করবে। কিন্তু নকল করার জন্যও তো পড়া লাগবে। সেটাও নেই তার। অসহায় লাগছে। কি করবে? বুঝতে পারছে না রাফি। চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে এলো। রাফি ধিক্কার দিচ্ছে বারবার নিজেকে। কি করলাম আমি। সময়গুলো এভাবে পার করে দিলাম? হঠাৎ মনে এলো, আগামী থেকে খুব ভালো করে পড়বো। তখন আর এমন পেরেশানিতে পড়তে হবে না। মনেমনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিলো, আগামী পরীক্ষায় আমিই প্রথম হবো। অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকবো। খেলেধুলা ও বান্ধুদের সময় খুব কম দিবো।
রাফি কোনোরকম পরীক্ষা দিয়ে বাসায় চলে এলো। ভালো ফলাফলের আশা নেই রাফির। ফলাফল প্রকাশ পাবার আরো কিছু দিন বাকি। রাফি এখন একাকী রুমে বসে থাকে। কি যেনো চিন্তা করে সবসময়। খেলাধুলায় মনোযোগ নেই। বাবা মা রাফির পরিবর্তন লক্ষ্য করছে। নাহিন ভাইয়ের এ পরিবর্তন দেখে অনেকটা খুশি। ফলাফল প্রকাশ পেলো। নাহিন প্রথম হলো। রাফি ফেল। সকলের জানা ছিলো রাফি ফেল হবে। কারণ তার কাজকর্ম বলে দিয়েছে। নাহিন আজ খুব খুশি। ক্লাশে প্রথম হয়েছে সে। কিন্তু মন খারাপ ছিলো কিছুটা। তার ভাই ফেল করছে। ভালো নাম্বার পেলে খুশির মাত্রাটা আরো দ্বিগুণ হতো। সেটা নাহিন ভালোভাবে জানে।
রাফি মাথা নিচু করে রুমে বাবা মার পা ধরে মাফ চাইলো। বললো, ‘আর কখনোই সময় অপচয় করবো না। পড়ালেখা মনোযোগ দিয়ে করবো।’ এতে নাহিন খুব আনন্দিত। তার একমাত্র ভাইটা ভুল বুঝতে পেরেছে। বাবা মা রাফিকে বুকে তুলে নিলো। দু’গালে চুমু দিলো।  মা বললো, সামনেবার নাহিনকে তুমি পেছনে ফেলে প্রথব হবা। রাফি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁসূচক উত্তর দিলো। পাশেই নাহিনকে বললো, তুমিও কিন্তু রাফিকে প্রথম হতে দিবা না। রাফি পূর্বের সব ভুলে গিয়ে ভালোভাবে পড়ালেখায় মনোযোগী হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight